০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোট দিয়েছি, তবু ‘সন্দেহভাজন’ ভোটার কেন?

আমি একজন চিকিৎসক। আমার পেশার মতোই ব্যস্ত জীবনযাত্রায় ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয়ে সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিদিন রোগীদের সেবা করাই আমার প্রধান দায়িত্ব। তাই যখন জানতে পারলাম ভোটার তালিকায় আমার নাম ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তখন আমি গভীরভাবে বিস্মিত ও হতবাক হয়ে যাই।

প্রথমে ভেবেছিলাম, প্রয়োজনীয় সব নথি জমা দিলে ভুলটি ঠিক হয়ে যাবে। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ, স্বাধীনতার আগের জমির দলিল, এমনকি ১৯৫২ সালের ভোটার তালিকায় থাকা আমার পূর্বপুরুষদের নামসহ সমস্ত বৈধ কাগজপত্র জমা দিই। কিন্তু সবকিছু দেওয়ার পরও আমাকে অবৈধ ভোটার হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

পরিবারে বিভাজন, তালিকায় অদ্ভুত অসামঞ্জস্য

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আমার বাবা-মা এবং এক ভাইয়ের নাম এখনো ভোটার তালিকায় রয়েছে, অথচ আমাদের পরিবারের বাকি সদস্যদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যে একজন চিকিৎসক, একজন ফার্মাসিস্ট এবং একজন প্রতিবন্ধী বোনও রয়েছেন—তাঁদের নামও বাদ পড়েছে।

সব বৈধ নথি জমা দেওয়ার পরও একই পরিবারের মধ্যে এমন বিভাজন কীভাবে সম্ভব, তা বোঝা অত্যন্ত কঠিন।

পূর্বপুরুষের ইতিহাস ও বর্তমানের অপমান

আমার প্রপিতামহ হাজি রিয়াজউদ্দিনের বাবা হাজি কালিমুদ্দিন ১৮৪৫ সালে দেবীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আমাদের পরিবার দেশের স্বাধীনতার জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করেছে। অথচ আজ আমাদেরই ‘বাংলাদেশি’ বা ‘পাকিস্তানি’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার যন্ত্রণা যতটা কষ্টদায়ক, তার থেকেও বেশি অপমানজনক এই পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া। ‘অবৈধ ভোটার’ তকমা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি এক গভীর সামাজিক আঘাত।

সোমেই ৬০ লক্ষ বিচারাধীনের প্রথম তালিকা প্রকাশ, কত নামের নিষ্পত্তি? তালিকায়  নাম না থাকলে কী করবেন?

রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিতরাও বাদ

এই সমস্যায় শুধু আমি বা আমার পরিবারই নই, আরও অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের গ্রামের এক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর, যিনি ৩৭ বছর পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে চাকরি করেছেন, তাঁর নামও তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। একইভাবে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন সদস্য, যার পূর্বপুরুষদের নাম ১৯৫২ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে, তাঁর নামও মুছে দেওয়া হয়েছে।

যারা দেশের সুরক্ষায় কাজ করছেন, তারাও এই প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

প্রশ্নের মুখে সংশোধন প্রক্রিয়া

ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু তা যদি অপরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়া পরিচালিত হয়, তাহলে তা মানুষের জন্য দুর্ভোগে পরিণত হয়।

পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। নির্দোষ মানুষদের ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে।

গণতন্ত্রে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

প্রশ্ন উঠছে—একজন নির্দোষ নাগরিক কেন বারবার নিজের অধিকার প্রমাণ করতে বাধ্য হবেন? তিনি কোনো অপরাধ না করেও কেন শাস্তির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন?

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কি এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো সহজ ও ন্যায্য প্রতিকার নেই?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অমীমাংসিত, কিন্তু এর প্রভাব পড়ে চলেছে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জীবনে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়?

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোট দিয়েছি, তবু ‘সন্দেহভাজন’ ভোটার কেন?

০৭:৫০:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

আমি একজন চিকিৎসক। আমার পেশার মতোই ব্যস্ত জীবনযাত্রায় ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয়ে সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিদিন রোগীদের সেবা করাই আমার প্রধান দায়িত্ব। তাই যখন জানতে পারলাম ভোটার তালিকায় আমার নাম ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তখন আমি গভীরভাবে বিস্মিত ও হতবাক হয়ে যাই।

প্রথমে ভেবেছিলাম, প্রয়োজনীয় সব নথি জমা দিলে ভুলটি ঠিক হয়ে যাবে। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ, স্বাধীনতার আগের জমির দলিল, এমনকি ১৯৫২ সালের ভোটার তালিকায় থাকা আমার পূর্বপুরুষদের নামসহ সমস্ত বৈধ কাগজপত্র জমা দিই। কিন্তু সবকিছু দেওয়ার পরও আমাকে অবৈধ ভোটার হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

পরিবারে বিভাজন, তালিকায় অদ্ভুত অসামঞ্জস্য

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আমার বাবা-মা এবং এক ভাইয়ের নাম এখনো ভোটার তালিকায় রয়েছে, অথচ আমাদের পরিবারের বাকি সদস্যদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যে একজন চিকিৎসক, একজন ফার্মাসিস্ট এবং একজন প্রতিবন্ধী বোনও রয়েছেন—তাঁদের নামও বাদ পড়েছে।

সব বৈধ নথি জমা দেওয়ার পরও একই পরিবারের মধ্যে এমন বিভাজন কীভাবে সম্ভব, তা বোঝা অত্যন্ত কঠিন।

পূর্বপুরুষের ইতিহাস ও বর্তমানের অপমান

আমার প্রপিতামহ হাজি রিয়াজউদ্দিনের বাবা হাজি কালিমুদ্দিন ১৮৪৫ সালে দেবীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আমাদের পরিবার দেশের স্বাধীনতার জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করেছে। অথচ আজ আমাদেরই ‘বাংলাদেশি’ বা ‘পাকিস্তানি’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার যন্ত্রণা যতটা কষ্টদায়ক, তার থেকেও বেশি অপমানজনক এই পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া। ‘অবৈধ ভোটার’ তকমা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি এক গভীর সামাজিক আঘাত।

সোমেই ৬০ লক্ষ বিচারাধীনের প্রথম তালিকা প্রকাশ, কত নামের নিষ্পত্তি? তালিকায়  নাম না থাকলে কী করবেন?

রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিতরাও বাদ

এই সমস্যায় শুধু আমি বা আমার পরিবারই নই, আরও অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের গ্রামের এক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর, যিনি ৩৭ বছর পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে চাকরি করেছেন, তাঁর নামও তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। একইভাবে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন সদস্য, যার পূর্বপুরুষদের নাম ১৯৫২ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে, তাঁর নামও মুছে দেওয়া হয়েছে।

যারা দেশের সুরক্ষায় কাজ করছেন, তারাও এই প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

প্রশ্নের মুখে সংশোধন প্রক্রিয়া

ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু তা যদি অপরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়া পরিচালিত হয়, তাহলে তা মানুষের জন্য দুর্ভোগে পরিণত হয়।

পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। নির্দোষ মানুষদের ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে।

গণতন্ত্রে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

প্রশ্ন উঠছে—একজন নির্দোষ নাগরিক কেন বারবার নিজের অধিকার প্রমাণ করতে বাধ্য হবেন? তিনি কোনো অপরাধ না করেও কেন শাস্তির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন?

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কি এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো সহজ ও ন্যায্য প্রতিকার নেই?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অমীমাংসিত, কিন্তু এর প্রভাব পড়ে চলেছে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জীবনে।