০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের

প্রতিবেশে শান্তি প্রতিষ্ঠাই পাকিস্তানের কূটনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

পশ্চিম এশিয়ায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকা দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি শুধু একটি সংঘাত এড়ানোর সাফল্য নয়; বরং প্রমাণ করেছে যে ধৈর্য, সংলাপ ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এখনো সামরিক শক্তির বিকল্প হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্জিত এই সাফল্যের পর পাকিস্তানের সামনে আরও কঠিন একটি দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে—নিজের প্রতিবেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা।

কূটনৈতিক সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তির ভিত্তি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। পাকিস্তান যদি সত্যিই একটি দায়িত্বশীল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের নতুন কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ এখনই নেওয়া উচিত।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সবচেয়ে জটিল সংকটও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সমাধানের পথে এগোতে পারে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাল্টাপাল্টি ঘটনায় দুই দেশ কার্যত সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু দ্রুত কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমে সেই সংকটকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।

এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সামরিক প্রতিক্রিয়ায় নয়, রাজনৈতিক সংলাপে নিহিত। পাকিস্তানের উচিত এই নীতিকেই তার অন্যান্য প্রতিবেশী সম্পর্কেও অনুসরণ করা।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিঃসন্দেহে সবচেয়ে কঠিন। দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস দীর্ঘদিনের, আর রাজনৈতিক বাস্তবতাও সংলাপকে সহজ করে না। তবুও ইসলামাবাদের উচিত নয় দিল্লির অনাগ্রহকে নিজের নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত বানানো। আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াবে এবং সংলাপ এড়িয়ে যাওয়ার দায় ভারতের ওপরই বর্তাবে।

তবে পাকিস্তানের জন্য আরও জরুরি প্রশ্ন রয়েছে পশ্চিম সীমান্তে। ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং বাণিজ্য—সবকিছুই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। কিন্তু বাস্তবে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্যে আটকে আছে। এই অচলাবস্থা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সংযোগকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তানের দৃষ্টিতে আফগান ভূখণ্ডে টিটিপির উপস্থিতি দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। অন্যদিকে আফগান তালেবানের জন্য বিষয়টি ঐতিহাসিক ও আদর্শিক সম্পর্কের কারণে আরও জটিল। ফলে সমস্যাটি অস্বীকার করে নয়, বরং বাস্তবতা মেনে এমন সমাধান খুঁজতে হবে, যাতে নিরাপত্তা ইস্যু পুরো সম্পর্ককে জিম্মি করে না ফেলে।

এখানেই পাকিস্তানের নীতিতে ভারসাম্য প্রয়োজন। একদিকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক যোগাযোগ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

Pakistan's Quiet Diplomacy: A Push for Peace Beyond the Frontlines - CISS  Pakistan - Center For International Strategic Studies

সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা উদ্যোগের অংশীদার করা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী সাফল্য অর্জন কঠিন হবে।

বাণিজ্যকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার না বানিয়ে আস্থার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। সীমান্তে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হলে উভয় দেশের মানুষের স্বার্থ শান্তির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হবে।

একইভাবে শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও বৈধ ভ্রমণকারীদের জন্য ভিসা সহজ করা দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। অনেক সময় রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতি যেখানে অগ্রগতি আনতে ব্যর্থ হয়, মানুষের সরাসরি যোগাযোগ সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চাইলে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগের প্রধান সেতুতে পরিণত হতে পারে। ট্রানজিট বাণিজ্য, জ্বালানি করিডোর এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই ত্বরান্বিত করবে না, বরং ভৌগোলিক অবস্থানকে সংঘাতের উৎস থেকে সমৃদ্ধির সম্পদে রূপান্তর করতে পারে।

তবে এই প্রচেষ্টা একতরফা হতে পারে না। পাকিস্তানের ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি আফগান তালেবানকেও দৃশ্যমান ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। টিটিপির কার্যক্রম সীমিত করা, অস্ত্রধারীদের নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ ও অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করা এবং আফগান ভূখণ্ডকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে না দেওয়া—এসব পদক্ষেপ কেবল পাকিস্তানের উদ্বেগই কমাবে না, আফগানিস্তানের আঞ্চলিক বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়াবে। একই সঙ্গে সীমান্ত চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড দমনে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে।

একটি স্থিতিশীল পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের সুফল শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার, সীমান্ত নিরাপত্তা উন্নত করা এবং আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম সীমিত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইউরেশিয়াজুড়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যখন আরও তীব্র হচ্ছে, তখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মূল্যও বহুগুণ বেড়েছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের ভূমিকা দেখিয়েছে যে সংলাপ এখনো কার্যকর রাষ্ট্রনীতি হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্যের পরীক্ষা হবে সেই একই কূটনৈতিক প্রজ্ঞা নিজস্ব প্রতিবেশে প্রয়োগ করার মধ্য দিয়ে।

ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি দেশের সামনে নতুন পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পাকিস্তানের জন্য হয়তো সেটিই বর্তমান মুহূর্ত। দূরবর্তী একটি সংকটে সেতুবন্ধনের সক্ষমতা দেখানোর পর এখন আরও কঠিন কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজের চারপাশে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া। এই পথ সহজ হবে না। বাধা, হতাশা ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ থাকবে। তবুও অবিশ্বাস, সংঘাত ও পুনরাবৃত্ত সংকটে আবদ্ধ একটি অঞ্চলের চেয়ে সংলাপ ও সহযোগিতার পথে এগোনোর মূল্য অনেক বেশি।

শান্তির যাত্রা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি যাত্রার শুরু হয় একটি প্রথম পদক্ষেপ দিয়ে। পাকিস্তানের জন্য সেই পদক্ষেপ হওয়া উচিত এমন একটি প্রতিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে নিরাপত্তা, আস্থা ও সহযোগিতা সংঘাতের পরিবর্তে ভবিষ্যতের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়?

প্রতিবেশে শান্তি প্রতিষ্ঠাই পাকিস্তানের কূটনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

০৭:২৬:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

পশ্চিম এশিয়ায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকা দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি শুধু একটি সংঘাত এড়ানোর সাফল্য নয়; বরং প্রমাণ করেছে যে ধৈর্য, সংলাপ ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এখনো সামরিক শক্তির বিকল্প হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্জিত এই সাফল্যের পর পাকিস্তানের সামনে আরও কঠিন একটি দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে—নিজের প্রতিবেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা।

কূটনৈতিক সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তির ভিত্তি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। পাকিস্তান যদি সত্যিই একটি দায়িত্বশীল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের নতুন কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ এখনই নেওয়া উচিত।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সবচেয়ে জটিল সংকটও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সমাধানের পথে এগোতে পারে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাল্টাপাল্টি ঘটনায় দুই দেশ কার্যত সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু দ্রুত কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমে সেই সংকটকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।

এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সামরিক প্রতিক্রিয়ায় নয়, রাজনৈতিক সংলাপে নিহিত। পাকিস্তানের উচিত এই নীতিকেই তার অন্যান্য প্রতিবেশী সম্পর্কেও অনুসরণ করা।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিঃসন্দেহে সবচেয়ে কঠিন। দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস দীর্ঘদিনের, আর রাজনৈতিক বাস্তবতাও সংলাপকে সহজ করে না। তবুও ইসলামাবাদের উচিত নয় দিল্লির অনাগ্রহকে নিজের নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত বানানো। আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াবে এবং সংলাপ এড়িয়ে যাওয়ার দায় ভারতের ওপরই বর্তাবে।

তবে পাকিস্তানের জন্য আরও জরুরি প্রশ্ন রয়েছে পশ্চিম সীমান্তে। ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং বাণিজ্য—সবকিছুই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। কিন্তু বাস্তবে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্যে আটকে আছে। এই অচলাবস্থা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সংযোগকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তানের দৃষ্টিতে আফগান ভূখণ্ডে টিটিপির উপস্থিতি দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। অন্যদিকে আফগান তালেবানের জন্য বিষয়টি ঐতিহাসিক ও আদর্শিক সম্পর্কের কারণে আরও জটিল। ফলে সমস্যাটি অস্বীকার করে নয়, বরং বাস্তবতা মেনে এমন সমাধান খুঁজতে হবে, যাতে নিরাপত্তা ইস্যু পুরো সম্পর্ককে জিম্মি করে না ফেলে।

এখানেই পাকিস্তানের নীতিতে ভারসাম্য প্রয়োজন। একদিকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক যোগাযোগ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

Pakistan's Quiet Diplomacy: A Push for Peace Beyond the Frontlines - CISS  Pakistan - Center For International Strategic Studies

সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা উদ্যোগের অংশীদার করা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী সাফল্য অর্জন কঠিন হবে।

বাণিজ্যকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার না বানিয়ে আস্থার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। সীমান্তে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হলে উভয় দেশের মানুষের স্বার্থ শান্তির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হবে।

একইভাবে শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও বৈধ ভ্রমণকারীদের জন্য ভিসা সহজ করা দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। অনেক সময় রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতি যেখানে অগ্রগতি আনতে ব্যর্থ হয়, মানুষের সরাসরি যোগাযোগ সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চাইলে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগের প্রধান সেতুতে পরিণত হতে পারে। ট্রানজিট বাণিজ্য, জ্বালানি করিডোর এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই ত্বরান্বিত করবে না, বরং ভৌগোলিক অবস্থানকে সংঘাতের উৎস থেকে সমৃদ্ধির সম্পদে রূপান্তর করতে পারে।

তবে এই প্রচেষ্টা একতরফা হতে পারে না। পাকিস্তানের ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি আফগান তালেবানকেও দৃশ্যমান ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। টিটিপির কার্যক্রম সীমিত করা, অস্ত্রধারীদের নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ ও অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করা এবং আফগান ভূখণ্ডকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে না দেওয়া—এসব পদক্ষেপ কেবল পাকিস্তানের উদ্বেগই কমাবে না, আফগানিস্তানের আঞ্চলিক বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়াবে। একই সঙ্গে সীমান্ত চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড দমনে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে।

একটি স্থিতিশীল পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের সুফল শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার, সীমান্ত নিরাপত্তা উন্নত করা এবং আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম সীমিত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইউরেশিয়াজুড়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যখন আরও তীব্র হচ্ছে, তখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মূল্যও বহুগুণ বেড়েছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের ভূমিকা দেখিয়েছে যে সংলাপ এখনো কার্যকর রাষ্ট্রনীতি হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্যের পরীক্ষা হবে সেই একই কূটনৈতিক প্রজ্ঞা নিজস্ব প্রতিবেশে প্রয়োগ করার মধ্য দিয়ে।

ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি দেশের সামনে নতুন পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পাকিস্তানের জন্য হয়তো সেটিই বর্তমান মুহূর্ত। দূরবর্তী একটি সংকটে সেতুবন্ধনের সক্ষমতা দেখানোর পর এখন আরও কঠিন কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজের চারপাশে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া। এই পথ সহজ হবে না। বাধা, হতাশা ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ থাকবে। তবুও অবিশ্বাস, সংঘাত ও পুনরাবৃত্ত সংকটে আবদ্ধ একটি অঞ্চলের চেয়ে সংলাপ ও সহযোগিতার পথে এগোনোর মূল্য অনেক বেশি।

শান্তির যাত্রা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি যাত্রার শুরু হয় একটি প্রথম পদক্ষেপ দিয়ে। পাকিস্তানের জন্য সেই পদক্ষেপ হওয়া উচিত এমন একটি প্রতিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে নিরাপত্তা, আস্থা ও সহযোগিতা সংঘাতের পরিবর্তে ভবিষ্যতের ভিত্তি হয়ে ওঠে।