তিন বছর আগে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া সিতি মারিয়াম আবদুল রহমান এখন অন্যদের শরীরচর্চায় উৎসাহ দেওয়ার কাজে ব্যস্ত। মাত্র ১ দশমিক ৫৫ মিটার উচ্চতার এই ৩৩ বছর বয়সী নারী সম্প্রতি ১১০ কেজি ওজন তুলে নিজের নতুন ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়েছেন। অথচ একসময় দুর্ঘটনার পর মাসের পর মাস তাঁকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছিল।
২০২৩ সালে মোটরসাইকেলে করে দ্বিতীয় কর্মস্থলে যাওয়ার পথে একটি দোতলা বাস তাঁর মোটরসাইকেলের পাশে সজোরে ধাক্কা দেয়। আঘাতে তিনি বাসের সামনের কাচের ওপর ছিটকে পড়েন। পরে মোটরসাইকেলটি বাসের সামনের অংশের নিচে আটকে যাওয়ায় তিনি পুরোপুরি পিষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পান।
চার দিন কোমায় থাকা, ১০টি অস্ত্রোপচার এবং কয়েক মাস হুইলচেয়ারে কাটানোর পরও হার মানেননি মারিয়াম। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, আবার হাঁটতে ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগতে পারে। কিন্তু নিয়মিত পুনর্বাসন ব্যায়ামের কারণে মাত্র তিন মাসেই তিনি হাঁটতে শুরু করেন।
শরীরের শক্তিই হয়তো বাঁচিয়েছিল জীবন
দুর্ঘটনার পর চিকিৎসক তাঁকে জানান, তাঁর শরীরে থাকা উল্লেখযোগ্য পেশিশক্তি দুর্ঘটনার ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করেছে। ফলে আরও গুরুতর আঘাত থেকে তিনি বেঁচে যেতে পারেন।
কথাটি শুনে তাঁর বিস্ময় ছিল প্রবল। কিন্তু সেই উপলব্ধিই তাঁকে আবার শরীরচর্চায় ফিরতে তাড়িত করে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই ছোট ওজন দিয়ে হাতের ব্যায়াম শুরু করেন তিনি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর দ্রুত সুস্থ হয়ে সন্তানদের কাছে ফিরতে এবং আবার কাজ শুরু করতে তিনি পুনর্বাসনে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন।
একের পর এক কঠিন সময়
দুর্ঘটনাটি ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র বড় ধাক্কা নয়। তখন তিনি চার সন্তানের একক মা এবং বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়ার মধ্যেও ছিলেন। সবচেয়ে ছোট সন্তানের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তিনি একটি শরীরচর্চা কেন্দ্রে কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত একটি বিক্রয়কর্মীর চাকরিও করছিলেন।
দুর্ঘটনার পাঁচ দিন আগে তিনি জাপান থেকে একা ভ্রমণ করে ফিরেছিলেন। দীর্ঘ ১০ বছরের দাম্পত্যজীবনে স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতার খবর জানার পর কিছুটা মানসিক অবকাশ পেতেই সেই ভ্রমণে গিয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় তিনি একাকিত্ব ও হতাশার সঙ্গে লড়েছেন। নিজের শরীরের গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি চলাফেরার কিছু সীমাবদ্ধতাও এখনো রয়ে গেছে।
তবে এই কঠিন সময়েও তাঁর মা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সন্তানরাও দীর্ঘদিন বিছানায় পড়ে থাকা মায়ের পাশে সময় কাটিয়েছে। সেই ভালোবাসাই তাঁকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে।
নিজের জীবন থেকেই নতুন পথ
বর্তমানে মারিয়াম পূর্ণকালীন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা নারীর পরিচয়ে নিজেকে তুলে ধরেন।
ছোটবেলায় অবশ্য তিনি এমন ছিলেন না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁকে নানা নামে বিদ্রূপ করা হতো। পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করে।
দৌড়, তীরন্দাজিসহ বিভিন্ন খেলায় অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন। ১৭ বছর বয়সে একটি শরীরচর্চা কেন্দ্রে কাজ শুরু করেন। কয়েক বছর কাজ করার পর বুঝতে পারেন, তাঁর আসল আগ্রহ মানুষকে শরীরচর্চায় প্রশিক্ষণ দেওয়া।
প্রথম সন্তানের জন্মের পর তাঁর ওজন প্রায় ৩০ কেজি বেড়ে যায়। এরপর নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষকের কাছ থেকে শেখার পাশাপাশি নিজেও অনেক কিছু শিখে নেন। পরে ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হিসেবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ২০২২ সালে পেশা হিসেবে এটি বেছে নেন।
৭৩ বছরের মায়ের নতুন জীবন
মারিয়ামের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী কাজগুলোর একটি হলো তাঁর ৭৩ বছর বয়সী মা রোজমিনা হামজাহকে শরীরচর্চায় নিয়ে আসা।
২০১৫ সালে অবসর নেওয়ার পর নাতি-নাতনিদের দেখাশোনায় ব্যস্ত ছিলেন রোজমিনা। ২০২৩ সালে পড়ে গিয়ে হাঁটুতে ব্যথা ও চলাফেরায় সমস্যা শুরু হয়। তিনি আরও অলস ও দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা মায়ের জন্য চলাফেরায় সহায়ক একটি যন্ত্র কেনার কথা ভাবলেও মারিয়াম তাতে আপত্তি জানান। তিনি তিন মাস সময় চেয়ে মাকে নিজেই প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৫ সালের আগস্টে মাকে শরীরচর্চা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া শুরু করেন। প্রথম দিকে বসা থেকে দাঁড়ানো এবং ধাপের ওপর ওঠানামার মতো সহজ ব্যায়াম দিয়েই শুরু হয় প্রশিক্ষণ।
মাত্র ১১ মাসের মধ্যে রোজমিনা ৪ কিলোমিটার দৌড়েছেন, ৭০ কেজি ওজনের কোমর-উত্থান ব্যায়াম করেছেন এবং সহায়তা নিয়ে ৬৭ দশমিক ৫ কেজি ওজন তুলেছেন।
একসময় নামাজের সময় নত হওয়া কিংবা বাজার থেকে কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরাও তাঁর জন্য কঠিন ছিল। এখন নিয়মিত শরীরচর্চা তাঁর চলাফেরায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
ব্যায়ামের পাশাপাশি মা-মেয়ের বন্ধুত্ব
মারিয়ামের কাছে মাকে শরীরচর্চা করানোর সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়। এর মাধ্যমে মা-মেয়ের একসঙ্গে কাটানো সময়ও বেড়েছে।
রোজমিনা এখন সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন মেয়ের সঙ্গে শরীরচর্চা কেন্দ্রে যান। সেখানে ব্যায়ামের পাশাপাশি গল্প করেন, হাসেন, নিজেদের নানা কথা ভাগ করে নেন।
মারিয়ামও মজা করে বলেন, শরীরচর্চা কেন্দ্রটি তাঁদের জন্য এক ধরনের গল্প করার জায়গা হয়ে উঠেছে।
রোজমিনার প্রাণবন্ত উপস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জনপ্রিয় হয়েছে। তাঁর বিভিন্ন ব্যায়ামের দৃশ্য দেখে অনেক প্রবীণ মানুষ মারিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং কীভাবে তাঁরা শরীরচর্চা শুরু করতে পারেন, তা জানতে চাইছেন।
মারিয়ামের বিশ্বাস, অনেক মানুষ শরীরচর্চা করতে চান, কিন্তু তাঁরা মনে করেন তাঁদের পক্ষে এটি সম্ভব নয়। তাঁর মাকে দেখে তাঁরা বুঝতে পারছেন, বয়স বেশি হলেও শুরু করা যায়।
প্রবীণ নারীদের জন্য নতুন উদ্যোগ
এই ভাবনা থেকেই মারিয়াম আরও কয়েকজন নারী প্রশিক্ষকের সঙ্গে মিলে একটি নতুন উদ্যোগ শুরু করেন। এর লক্ষ্য বিশেষ করে বয়স্ক নারীদের শরীরচর্চার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং তাঁদের একসঙ্গে চলার সুযোগ তৈরি করা।
জুন মাসে এই উদ্যোগের প্রথম অনুষ্ঠানে একটি হাঁটা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ এতে অংশ নেন। মাত্র তিন দিনের মধ্যে নির্ধারিত ৫০টি আসন পূর্ণ হয়ে যায়।
অংশগ্রহণকারীদের হাঁটার গতি অনুযায়ী তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। কেউ দ্রুত হাঁটেছেন, কেউ ধীরে, আবার কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করেছেন।
অনেক প্রবীণ শুরুতে সন্দেহ করেছিলেন, তাঁরা তিন কিলোমিটারও হাঁটতে পারবেন কি না। শেষ পর্যন্ত তাঁরা সেই দূরত্ব অনায়াসে পেরিয়ে যান।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে নতুন স্বপ্ন
দুর্ঘটনার পর জীবন সম্পর্কে মারিয়ামের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। তাঁর বিশ্বাস, জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি যখন ঘটে গেছে, তখন আর ভয় পাওয়ার কী আছে?
এখন তাঁর স্বপ্ন এমন একটি শরীরচর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলা, যেখানে সব বয়সের মানুষ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ব্যায়াম করতে পারবেন। পাশাপাশি তিনি আরও শরীরচর্চা ও হাঁটা কর্মসূচি আয়োজন করতে চান।
তাঁর বার্তা খুব সহজ—শুরু করার জন্য নিখুঁত শরীরের প্রয়োজন নেই। ছোট করে শুরু করাই যথেষ্ট। প্রয়োজন নিষ্ঠা, ধৈর্য ও নিয়মিত চেষ্টা।
মারিয়ামের কাছে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার অর্থও তাই বদলে গেছে। তাঁর মতে, কেউ যখন নিজের সুস্থতার জন্য কিছু শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর মধ্যেই সেই সাহসী সত্তাটি জেগে ওঠে।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই নারী এখন শুধু নিজের শরীরকে শক্তিশালী করছেন না, অন্যদেরও শেখাচ্ছেন—বয়স, ভয় কিংবা অতীতের কষ্ট কোনো কিছুই নতুন করে শুরু করার পথে শেষ বাধা হতে পারে না।
মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে ফেরা জীবন তাঁকে যে শিক্ষা দিয়েছে, সেটিই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রেরণা—যা করতে চান, সাহস করে শুরু করে দিতে হবে।
জীবন থেমে যায় না; কখনো কখনো সবচেয়ে কঠিন পতনের পরই শুরু হয় সবচেয়ে শক্তিশালী ফিরে আসা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















