ব্রিকস কেন ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে, আর কেন এই জোটের সহযোগিতা এত প্রাণবন্ত ও গতিশীল? এর মূল কারণ হলো—উন্মুক্ততা ও অন্তর্ভুক্তির প্রতি অঙ্গীকার, পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে সহযোগিতার লক্ষ্য এবং ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি গুরুত্ব। বিশ্ব যত বেশি অস্থিরতা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ব্রিকস সহযোগিতার অনন্য গুরুত্বও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ব্রিকসের বিস্তৃত সহযোগিতা এখন গুণগত মান ও কার্যকারিতা বাড়ানোর পর্যায়ে প্রবেশ করায় এই আস্থাও বাড়ছে যে, ব্রিকস সহযোগিতার সামনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর সদস্য দেশগুলোর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন। সম্মেলনে তিনি বক্তব্য দেবেন এবং অন্যান্য নেতার সঙ্গে বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ব্রিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাস্তব সহযোগিতা আরও গভীর করাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করবেন। একই সঙ্গে তিনি ব্রিকসের বৃহত্তর সহযোগিতাকে উচ্চমানের পর্যায়ে এগিয়ে নিতে চীনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও প্রস্তাব তুলে ধরবেন। ব্রিকস সহযোগিতা ব্যবস্থার ২০ বছর পূর্তির এই সময়ে বিশ্বও চীনের ভবিষ্যৎ ভাবনা শোনার অপেক্ষায় রয়েছে।
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত। তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের পথও এক নয়। তবে উন্নয়ন ও জাতীয় পুনরুজ্জীবনের আকাঙ্ক্ষা, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার উন্নয়নের মতো অভিন্ন লক্ষ্য তাদের একত্র করেছে। গত দুই দশকে প্রাথমিক ‘ব্রিকস ফোর’ থেকে আজকের ‘বৃহত্তর ব্রিকস’ হয়ে ওঠার পথে এই সহযোগিতা কাঠামোকে বিভক্ত ও দুর্বল করার নানা বাইরের প্রচেষ্টা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এরপরও এটি বিকশিত হয়ে বৈশ্বিক দক্ষিণের অগ্রভাগে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বড় শিল্পভিত্তি এবং বিশাল বাজার। উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সংহতি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ব্রিকস এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আরও বেশি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এই অর্জন সহজে আসেনি।
ব্রিকসকে আরও শক্তিশালী, তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রভাবশালী করে তোলার ক্ষেত্রে চীন সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সে অর্থে নাম ও বাস্তবতা—দুই দিক থেকেই চীনকে ‘ব্রিকস সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি’ বলা যায়।
২০১৩ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট শি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ও উদ্যোগ সামনে এনেছেন। এর মধ্যে ‘ব্রিকস প্লাস’ সহযোগিতা মডেল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব উদ্যোগ ব্রিকস সহযোগিতার দ্রুত বিকাশে ভূমিকা রেখেছে এবং এর মাধ্যমে আরও ফলাফল অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। জোটের বিকাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
‘উন্মুক্ততা, অন্তর্ভুক্তি ও পারস্পরিক কল্যাণমূলক সহযোগিতা’—ব্রিকসের এই চেতনা সামনে তুলে ধরা থেকে শুরু করে ‘ব্রিকস প্লাস’ সহযোগিতা মডেলের ধারণা প্রস্তাব, সাংহাইয়ে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নেওয়া থেকে ব্রিকসের ঐতিহাসিক সম্প্রসারণে সমর্থন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই চীন সহযোগিতা কাঠামোকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে শান্তি, উদ্ভাবন, সবুজ উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগকে গুরুত্ব দিয়ে একটি নতুন ধরনের ব্রিকস গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রিকস ব্যবস্থাকে ক্রমাগত উন্নত করা এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে চীনের এই সক্রিয় ভূমিকা বিভিন্ন মহলে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে।
গত ২০ বছরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে গভীর পরিবর্তন এসেছে। ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা কিংবা এই জোটকে বিভক্ত করার চেষ্টা—এমন মতও কম ছিল না। তাহলে ব্রিকস কেন টিকে আছে এবং কেন এর সহযোগিতা এখনো এত প্রাণবন্ত? এর উত্তর নিহিত রয়েছে উন্মুক্ততা ও অন্তর্ভুক্তির নীতি, পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে সহযোগিতার লক্ষ্য এবং ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের অনুসরণে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট শি তিনটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রথমত, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতা রক্ষায় বহুপাক্ষিকতাকে সমুন্নত রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যব্যবস্থা সুরক্ষায় উন্মুক্ততা ও পারস্পরিক লাভের সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে। তৃতীয়ত, অভিন্ন উন্নয়নের জন্য সমন্বিত শক্তি গড়ে তুলতে সংহতি ও সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে।
এই প্রস্তাবগুলো ব্রিকসের বৃহত্তর সহযোগিতাকে উচ্চমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার নতুন পথ তৈরি করেছে এবং এতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। সম্প্রসারণের পর ব্রিকস এখন সহযোগিতার মান ও কার্যকারিতা বাড়ানোর একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ফলে এই সহযোগিতা ব্যবস্থার সম্ভাবনা এবং ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা আরও জোরালো হচ্ছে।
বর্তমানে এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি এমন গভীর পরিবর্তন দ্রুততর হচ্ছে। একই সঙ্গে আধিপত্যবাদ, একতরফাবাদ ও সুরক্ষাবাদও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস, বিভাজন ও নতুন জোটবিন্যাসের প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব যত বেশি অস্থির ও পরিবর্তনশীল হয়ে উঠছে, ব্রিকস সহযোগিতার বিশেষ মূল্যও তত বেশি সামনে আসছে। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো সক্রিয়ভাবে ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এবং এই প্রবণতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ব্রিকসের অংশীদার দেশ মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণ সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। ইরাক, মাদাগাস্কারসহ আরও কয়েকটি দেশ ব্রিকসের সদস্য বা অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জানিয়েছে। জুন মাসে উজবেকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য হয়েছে। ইরানও শিগগিরই এই ব্যাংকে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ব্রিকসকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ মূলত বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন—সমান সুযোগে উন্নয়নের অধিকার এবং আরও ন্যায্য ও সুবিচারভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
২০২৭ সালে ব্রিকসের ঘূর্ণায়মান সভাপতির দায়িত্ব নেবে চীন। সামনে তাকিয়ে চীন প্রকৃত বহুপাক্ষিকতার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর ঐক্যের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করবে। উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতার মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উন্নয়ন কৌশলগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ, বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ, বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক শাসন উদ্যোগের মাধ্যমে অভিন্ন উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও কৃষি উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল অর্জনের লক্ষ্য থাকবে চীনের। উচ্চমানের উন্মুক্ততা আরও সম্প্রসারণ এবং চীনা আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে চীন ব্রিকসের অংশীদারদের জন্য আরও বড় বাজার ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
বিশ্ব যত বেশি অস্থির হয়ে উঠছে, শান্তি, উন্নয়ন, সহযোগিতা ও পারস্পরিক লাভের নীতি আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করা ততই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ব্রিকসের মূল চেতনাকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং এর শক্তি ও সক্ষমতা তুলে ধরাও জরুরি। ব্রিকস সহযোগিতা ব্যবস্থা ক্রমাগত বিকশিত ও সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সামনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে এবং নতুন দায়িত্বও যুক্ত হচ্ছে।
আরও ঐক্যবদ্ধ, কার্যকর, বাস্তবমুখী এবং দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ একটি ‘বৃহত্তর ব্রিকস’ বৈশ্বিক দক্ষিণের অভিন্ন উন্নয়নের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। একই সঙ্গে অস্থিরতা ও পরিবর্তনে জর্জরিত বিশ্বে এটি আরও বেশি স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক শক্তি যোগ করতে পারে।
বিশ বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এটি একই সঙ্গে নতুন যাত্রার সূচনাও।
গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয় 



















