২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকস সহযোগিতা প্রক্রিয়া যাত্রা শুরুর পর উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। দুই দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে একাধিক দফা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জোটটির পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বিস্তৃত হয়েছে সহযোগিতার ক্ষেত্রও। এতে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
এবারের সম্মেলন সামনে রেখে বাড়ছে ব্রিকসের গুরুত্ব
ভারতের নয়াদিল্লিতে চলতি বছরের ব্রিকস সম্মেলন সামনে রেখে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর তুলে ধরার ক্ষেত্রে জোটটির ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। একই সঙ্গে সুরক্ষাবাদ, অর্থনৈতিক বিভাজন ও পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবহারিক সহযোগিতা সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিচ্ছে ব্রিকস।
অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত পরিসরেও ব্রিকসের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে ব্রিকস সদস্য দেশগুলো ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের প্রতিনিধিত্ব করে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার মার্চে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালের তুলনায় ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ পণ্য বাণিজ্য ১৩ গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৪ সালে এ বাণিজ্য থেকে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
অর্থনীতির বাইরে সহযোগিতার বিস্তার
ব্রিকসের গুরুত্ব কেবল অর্থনৈতিক শক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভিন্ন ভিন্ন উন্নয়নপথ অনুসরণ করা দেশগুলো নিজেদের সম্পদ, শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে অভিন্ন উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র অর্থায়ন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ। সাংহাইভিত্তিক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) এ ক্ষেত্রে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের শেষ নাগাদ এনডিবি ১৪০টি প্রকল্পের জন্য মোট ৪২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে।
অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও ডিজিটাল রূপান্তরের মতো খাতে এসব প্রকল্প গ্লোবাল সাউথের উন্নয়ন চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে এগুলো আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের ‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসইতা’কেন্দ্রিক অগ্রাধিকারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।![]()
প্রযুক্তি ও শিল্পে বাড়ছে সহযোগিতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতো ক্ষেত্রেও ব্রিকস সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে। ২০২০ সালে চীনের শিয়ামেনে প্রতিষ্ঠিত ব্রিকস পার্টনারশিপ অন নিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন ইনোভেশন সেন্টার ডিজিটালাইজেশন, উন্নত উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
ফলে ব্রিকস শুধু গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর আন্তর্জাতিক পরিসরে কণ্ঠস্বর জোরালো করছে না; অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতার বাস্তব সুযোগও তৈরি করছে।
ব্রিকসকে ঘিরে ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
পশ্চিমা বিশ্বের কিছু মহল ব্রিকসকে বিকল্প বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী জোট হিসেবে উপস্থাপন করলেও উৎসপাঠে বলা হয়েছে, ব্রিকসের ঘোষিত অবস্থান উন্মুক্ততা, অন্তর্ভুক্তি ও পারস্পরিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে। চীন, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে, ব্যবহারিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পাশাপাশি বৃহত্তর অংশগ্রহণ ও উন্মুক্ততার পক্ষে ভূমিকা রাখছে।
দুই দশকের বিকাশ ও রূপান্তরের পর ব্রিকস এখন তার তৃতীয় ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশের পথে। সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা আরও জোরদার হলে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হতে পারে।
ব্রিকস সম্প্রসারণ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়াচ্ছে; দুই দশকে জোটটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
Sarakhon Report 



















