মন্টি ডনের বিদায়ের সঙ্গে ‘গার্ডেনার্স ওয়ার্ল্ড’-এর একটি যুগ শেষ হচ্ছে। ২৩ বছর ধরে এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে থাকা ডন শুধু গাছপালা নিয়ে কথা বলেননি; তিনি এমন এক টেলিভিশন জগৎ তৈরি করেছেন, যেখানে কিছু সময়ের জন্য বাইরের পৃথিবীর অস্থিরতা থেকে দূরে থাকা যায়। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তাঁর জায়গায় কে আসবেন? আমার ভয়, বিবিসি এমন কাউকে বেছে নিতে পারে, যিনি বাগান সম্পর্কে কম জানেন, কিন্তু টেলিভিশনে নিজেকে ‘চরিত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করতে বেশ দক্ষ।
আমার নিজের বাগান করার দক্ষতা নিয়ে বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। সত্যি বলতে, একটি সাধারণ স্পাইডার প্ল্যান্টও আমি বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। অন্য কেউ হয়তো একই গাছকে বছরের পর বছর প্রায় অবহেলায় রেখেও বাঁচিয়ে রাখতে পারবে, কিন্তু আমার হাতে সেটি কয়েক মাসের বেশি টিকল না।
একবার বিদেশ থেকে একটি বাওবাবের চারা কিনেছিলাম। দেখতে তখন গাছের চেয়ে অন্য কিছুর মতোই বেশি লাগছিল। বিক্রেতার দেওয়া পরিচয়পত্রে অবশ্য লেখা ছিল, সেটি একদিন বাওবাব হবে। বাড়িতে এনে যত্ন নেওয়ার পরও কোনো পরিবর্তন হলো না। শেষ পর্যন্ত আমার বাগানের দায়িত্বে থাকা মানুষটির হাতে সেটি তুলে দিলাম। তিনি জানতেন কী করতে হবে। কিছুদিন পর সেই একই চারা কয়েক ফুটের গাছে পরিণত হলো।
এই অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত একটি বিষয় বুঝেছি—বাগান এমন একটি জায়গা, যেখানে অজ্ঞতার সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি যদি না জানেন কী করছেন, তাহলে গাছ আপনাকে ক্ষমা করবে না।
আমার ক্রিসমাস গাছ লাগানোর ঘটনাটিও কম শিক্ষণীয় নয়। বহু বছর আগে ভেবেছিলাম, একসঙ্গে ৫০টি গাছ লাগিয়ে দিলে প্রতি বছর একটি করে ব্যবহার করতে পারব। কয়েক বছর পরিকল্পনা ভালোই চলল। তারপর বাকি গাছগুলো এমন উচ্চতায় পৌঁছাল যে সেগুলো ঘরে ঢোকানো তো দূরের কথা, এখন সম্ভবত ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতেও জায়গা হবে না।

বাগানে দূরদৃষ্টি লাগে। আমার সেটা নেই।
তবু আমি ‘গার্ডেনার্স ওয়ার্ল্ড’ দেখি। কারণ অনুষ্ঠানটি শুধু বাগান করা শেখায় না। মন্টি ডন পর্দায় এলেই মনে হয় পৃথিবীটা কয়েক মিনিটের জন্য একটু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তাঁর পরিচিত পোশাক, হাতে বাগানের সরঞ্জাম, গাছের সঙ্গে তাঁর স্বাভাবিক আচরণ—সবকিছু মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে কেউ আপনাকে তাড়া দিচ্ছে না।
মন্টি ডনের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই।
তরুণ মুখ দিয়ে দর্শক ফেরানো যাবে?
এখন টেলিভিশনের একটি অদ্ভুত প্রবণতা হলো, উপস্থাপককে শুধু দক্ষ হলেই চলে না; তাঁকে ‘চরিত্র’ও হতে হবে। অদ্ভুত পোশাক, আঞ্চলিক উচ্চারণ, অতিরঞ্জিত উচ্ছ্বাস এবং নিজেকে খানিকটা বোকা হিসেবে উপস্থাপন করা—সবকিছুকেই যেন বিনোদনের অংশ বানানো হয়েছে।
আর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, অনেক অনুষ্ঠানে বিষয়টি সম্পর্কে না জানাকে যেন কোনো সমস্যা হিসেবেই দেখা হয় না।
কিন্তু ‘গার্ডেনার্স ওয়ার্ল্ড’ সেই ধরনের অনুষ্ঠান নয়। এটি এমন একটি অনুষ্ঠান, যেখানে দর্শক জানেন, যিনি কথা বলছেন তিনি সত্যিই জানেন কী বলছেন।
বিবিসির কর্তারা নিশ্চয়ই নতুন উপস্থাপক বাছাইয়ের সময় তরুণ দর্শকের কথা ভাববেন। হয়তো এমন একজনকে খোঁজা হবে, যিনি দেখতে তরুণ, পোশাকে আলাদা এবং ক্যামেরার সামনে যথেষ্ট চঞ্চল। যুক্তিটা হবে—তরুণ মুখ দেখলে তরুণ দর্শকও অনুষ্ঠানটি দেখতে শুরু করবে।
আমি এতে খুব একটা বিশ্বাস করি না।
কেউ যদি বাগান নিয়ে একটি অনুষ্ঠান দেখতে চায়, তাহলে সে বাগান সম্পর্কেই কিছু জানতে চায়। শুধু উপস্থাপকের বয়স কম বলেই সে অনুষ্ঠানটি দেখতে বসবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সবকিছুকে নতুন করে সাজানোর দরকার নেই
আরেকটি প্রলোভন থাকবে অনুষ্ঠানটিকে আরও ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও আধুনিক করে তোলার। ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী বাগানের জায়গায় শহরের কোনো ছোট ফ্ল্যাটের জানালার বাক্সে গাছ লাগানোর গল্প আসতে পারে। শহুরে বাগান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটিই যদি পুরোনো অনুষ্ঠানের চরিত্র বদলে দেওয়ার অজুহাত হয়ে ওঠে, তাহলে সমস্যা আছে।
কারণ ‘গার্ডেনার্স ওয়ার্ল্ড’ কেবল গাছ লাগানোর অনুষ্ঠান নয়। এটি একটি মানসিক আশ্রয়।
এখানে কিছু জিনিস পুরোনো ধাঁচেরই থাকতে পারে। উদ্ভিদের ল্যাটিন নাম বলা যেতে পারে। দর্শকের সবাই তার অর্থ বুঝবেন না, তাতে কোনো সমস্যা নেই। যিনি জানেন তিনি জানবেন, আর যিনি জানেন না তিনিও অনুষ্ঠানটি উপভোগ করতে পারবেন।
এটাই তো স্বস্তির বিষয়।
জীবনে এমন কিছু জায়গা থাকা দরকার, যেখানে প্রতিটি বিষয়কে নতুন মতাদর্শ, নতুন বিতর্ক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সর্বশেষ উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত করতে হয় না। বাগান তার একটি চমৎকার উদাহরণ।
মাটি, গাছ, ঋতু, ফুল আর পোকামাকড় নিয়ে কথা বলাই যথেষ্ট।
নতুন উপস্থাপককে কোথায় খুঁজব
মন্টি ডনের উত্তরসূরি হিসেবে আমার পরামর্শ খুব সরল। বিবিসির স্টুডিও থেকে শুরু না করে দেশের বাগানকেন্দ্রগুলোতে খোঁজ করুন।
যে মানুষ প্রতিদিন গাছের সঙ্গে কাজ করেন, মাটির গন্ধ বোঝেন, কোন গাছ কোথায় টিকবে জানেন এবং কোনো বই না খুলেও একটি উদ্ভিদের সমস্যা ধরতে পারেন—তাঁর মধ্যে হয়তো সেই জিনিসটি আছে, যা একজন তারকা উপস্থাপকের মধ্যে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তাঁর টেলিভিশন অভিজ্ঞতা কম হতে পারে। ক্যামেরার সামনে প্রথম দিকে অস্বস্তিও হতে পারে। কিন্তু সেটি শেখানো সম্ভব। বাগানের প্রতি সত্যিকারের জ্ঞান ও ভালোবাসা শেখানো অনেক কঠিন।
সবচেয়ে বড় কথা, নতুন মানুষটিকে মন্টি ডনের মতো হতে হবে না। একজন নতুন উপস্থাপক নিজের স্বতন্ত্রতা নিয়েই আসবেন। কিন্তু তাঁকে বুঝতে হবে, তিনি এমন একটি অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিচ্ছেন, যার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার পরিচিতি এবং নির্ভরযোগ্যতা।
‘গার্ডেনার্স ওয়ার্ল্ড’-কে নতুন করে আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। বরং তাকে নষ্ট না করাই বড় কাজ।
আমি চাই না অনুষ্ঠানটি এমন কিছু হয়ে উঠুক, যা প্রতিনিয়ত নিজেকে তরুণ, আধুনিক এবং প্রাসঙ্গিক প্রমাণ করতে ব্যস্ত। আমি চাই এটি সেই জায়গাতেই থাকুক, যেখানে মানুষ গাছপালা দেখতে আসে, কিছু শিখতে আসে এবং কয়েক মিনিটের জন্য পৃথিবীর অন্য সব ঝামেলা ভুলে থাকতে পারে।
মন্টি ডনের উত্তরসূরির সবচেয়ে বড় যোগ্যতা তাই তার বয়স নয়, তার খ্যাতি নয়, তার পোশাকও নয়।
সে যেন বাগান ভালোবাসে। সে যেন জানে বাগান কীভাবে করতে হয়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সে যেন বোঝে, কিছু অনুষ্ঠানের সাফল্য তাদের বদলে দেওয়ার মধ্যে নয়, তাদের স্বভাবটুকু বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে।
জেরেমি ক্লার্কসন 


















