দশ বছর পর নয়, দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ হকির মঞ্চে আবার মুখোমুখি হচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। বুধবার নেদারল্যান্ডসের আমস্টেলভিনে ওয়াগেনার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে পুল ডি-এর বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি। প্রায় ১০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটি এরই মধ্যে পুরোপুরি পূর্ণ। দুই দলের জন্যই ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সমীকরণে বড় পার্থক্য রয়েছে—পরের পর্ব নিশ্চিত করতে ভারতের প্রয়োজন অন্তত এক পয়েন্ট, আর বিশ্বকাপে টিকে থাকতে পাকিস্তানকে জিততেই হবে।
একসময় পাকিস্তানের দাপট, এখন ভারতের আধিপত্য
ভারত ও পাকিস্তানের হকি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৫৬ সালের অলিম্পিকে প্রথম উল্লেখযোগ্য লড়াইয়ে ভারত ১-০ গোলে পাকিস্তানকে হারায়। তবে ষাটের দশক থেকে পাল্লা ভারী হতে থাকে পাকিস্তানের দিকে।
১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে প্রথমবার সোনা জেতে পাকিস্তান। চার বছর পর টোকিও অলিম্পিকে ভারত ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে প্রতিশোধ নেয়। এরপর এশিয়ান গেমস ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দুই দলের লড়াই আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
সত্তরের দশকে পাকিস্তানের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ওই দশকে দুই দলের ১৩টি লড়াইয়ের মধ্যে পাকিস্তান জিতেছিল নয়টিতে। আশির দশকে ২২টি, নব্বইয়ের দশকে ১৩টি এবং দুই হাজারের দশকে ২৭টি জয় পায় পাকিস্তান।
তবে ১৯৭৫ বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারত পাকিস্তানকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের একমাত্র পুরুষ বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছিল। পাকিস্তান অবশ্য বিশ্বকাপে চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে এখনও এই প্রতিযোগিতায় এশিয়ার সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটি।
একুশ শতকে বদলে যায় সমীকরণ
দুই হাজার দশকের পর থেকে ছবিটা পাল্টাতে শুরু করে। ওই দশকে ভারত ও পাকিস্তান ৩৫ বার মুখোমুখি হয়েছিল। ভারত জিতেছিল ১৯টি ম্যাচে, পাকিস্তানের জয় ছিল মাত্র আটটি।
চলতি দশকে ভারতের আধিপত্য আরও পরিষ্কার। ২০২০ সালের পর দুই দল আটবার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ভারত জিতেছে সাতটি ম্যাচে, আর একটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। এই সময়ে পাকিস্তান এখনও ভারতের বিপক্ষে কোনো জয় পায়নি।
সব মিলিয়ে অবশ্য ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে পাকিস্তান এগিয়ে। দুই দল এখন পর্যন্ত ১৮৩ বার মুখোমুখি হয়েছে। পাকিস্তানের জয় ৮২টি, ভারতের ৬৯টি এবং ৩২টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
বিশ্বকাপে ভারতের সামান্য এগিয়ে থাকা
বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারত ও পাকিস্তান পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে। ভারত জিতেছে তিনবার, পাকিস্তান দুবার।
বিশ্বকাপে তাদের শেষ দেখা হয়েছিল ২০১০ সালে নয়াদিল্লিতে। সেবার ভারত ৪-১ গোলে পাকিস্তানকে হারিয়েছিল। এরপর ২০১৪ ও ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তান মূল পর্বে উঠতে পারেনি। ২০১৮ সালের আসরেও ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হয়নি।
ফলে বুধবারের ম্যাচটি ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই প্রতিবেশীর পুনর্মিলন।
ফাইনালে পাঁচবারের মহারণ
বিশ্বকাপের ফাইনালেও ভারত ও পাকিস্তান পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৭১ সালের ফাইনালে পাকিস্তান ২-১ গোলে ভারতকে হারায়। ১৯৭৩ সালে ভারত ১-০ গোলে জয় পায়। ১৯৭৫ সালের ফাইনালে ভারতের জয় ২-১ গোলে।
১৯৮৬ সালে পাকিস্তান ৩-২ গোলে ভারতকে হারালেও ২০১০ সালের শেষ বিশ্বকাপ লড়াইয়ে ভারত ৪-১ গোলে বড় জয় পায়।
অর্থাৎ বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের জয় তিনটি, পাকিস্তানের দুটি।
আজকের ম্যাচে কার কী সমীকরণ?
ভারত প্রথম ম্যাচে ওয়েলসকে ৩-১ গোলে হারালেও পরের ম্যাচে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের কাছে ১-৪ গোলে হেরে যায়। দুই ম্যাচে ভারতের সংগ্রহ তিন পয়েন্ট।
অন্যদিকে পাকিস্তান ইংল্যান্ডের কাছে ১-৪ গোলে হারের পর ওয়েলসের সঙ্গে ৩-৩ গোলে ড্র করেছে। তাদের সংগ্রহ মাত্র এক পয়েন্ট।
ইংল্যান্ড ইতিমধ্যেই দুই ম্যাচ জিতে পরের পর্ব নিশ্চিত করেছে। ফলে ভারতের সামনে সমীকরণ বেশ সহজ—ড্র করলেই পরের পর্বে ওঠা নিশ্চিত হবে। কিন্তু পাকিস্তানের জন্য কোনো বিকল্প নেই; তাদের জয় পেতেই হবে।
সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ভারত অনেক এগিয়ে
চলতি বছরের ইউরোপ পর্বে দুই দলের সর্বশেষ দুই ম্যাচেও ভারতের দাপট দেখা গেছে। ভারত পাকিস্তানকে প্রথম ম্যাচে ৭-১ এবং পরের ম্যাচে ৪-৩ গোলে হারিয়েছে।
পাকিস্তান সর্বশেষ ২০১৬ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতকে হারিয়েছিল। এরপর থেকে টানা আট ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে জয়হীন তারা।
তবে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান কখনোই পুরো গল্প বলে না। পাকিস্তানের জন্য এটি বিশ্বকাপে টিকে থাকার শেষ সুযোগ, আর ভারতের জন্য পরের পর্বে যাওয়ার দরজা খুলে দেওয়ার ম্যাচ। তাই সাম্প্রতিক ফলাফল ভারতের পক্ষে থাকলেও আমস্টেলভিনের মাঠে আজকের মহারণে উত্তেজনার কোনো ঘাটতি থাকার কথা নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















