নেপালে ভয়াবহ বন্যা, পাহাড়ধস ও হিমবাহ ধসের নয় দিন পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেল থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিক হলেন কবির মহার্জন ও সঞ্জয় সাহ। দীর্ঘ সময় ধরে টানেলে আটকে থাকার পর তাঁদের জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় নিখোঁজ অন্যদেরও বেঁচে থাকার আশা নতুন করে জেগে উঠেছে।
গত ২৬ আগস্ট ত্রিশূলী নদীর উজানে হিমবাহ ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত নদীর উপত্যকায় নেমে আসে। এতে নেপালের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়। ঘরবাড়ি, সড়ক, বিদ্যালয় ও বিভিন্ন স্থাপনা পানির স্রোতে ভেসে যায়।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৮০ জনের বেশি মানুষ।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকা শত শত মানুষ
উদ্ধারকারী দল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ত্রিশূলী নদীর আশপাশের ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন টানেলে অন্তত ৯০০ মানুষ আটকা পড়েছিলেন।
শুক্রবার আপার ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেল থেকে প্রথমবারের মতো দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ভয়াবহ বিপর্যয়ের নয় দিন পর তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব হওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলোর মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে।
কবির মহার্জনকে মাটির একটি গর্ত দিয়ে ওপরে তুলে আনা হয়। তাঁকে উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে থাকা মানুষজন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। পরে তাঁকে স্ট্রেচারে করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে সঞ্জয় সাহকে একজন উদ্ধারকর্মীর পিঠে করে টানেল থেকে বের করে আনা হয়। তখন তাঁর মুখ ও শরীর কাদায় ঢাকা ছিল। উদ্ধার তাঁবুতে নেওয়ার পর সেনাবাহিনীর চিকিৎসকেরা তাঁকে অক্সিজেন দেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন।
অন্যদের বাঁচাতে টানেলেই থেকে যান সঞ্জয়
উদ্ধারের পর সঞ্জয় সাহ জানান, বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর তিনি তাঁর সহকর্মীদের দ্রুত টানেল থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন। তবে তিনি নিজে নিয়ন্ত্রণকক্ষে থেকে যান, যাতে অন্য শ্রমিকদের বের হতে সাহায্য করতে পারেন।
সঞ্জয় জানান, তিনি নিয়ন্ত্রণকক্ষে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাই সবার জীবন রক্ষা করাকে তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করেছিলেন। এত বড় দুর্ঘটনার সময় অন্যদের রেখে নিজের জীবন বাঁচিয়ে চলে যাওয়া তাঁর কাছে ঠিক মনে হয়নি।
টানেলের ভেতরে আটকা থাকার সময় তিনি প্রার্থনার মন্ত্র পাঠ করে সময় কাটিয়েছেন বলেও জানান সঞ্জয়। উদ্ধারকারীদের তিনি জানিয়েছেন, টানেলের ভেতরে থাকা আরও তিন বা চারজন মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল। টানেলের আরও গভীরে অন্য কেউ জীবিত থাকতে পারেন বলেও তিনি ধারণা দিয়েছেন।
দুই শ্রমিকের অবস্থা স্থিতিশীল
উদ্ধারের পর দুই শ্রমিককেই কাঠমান্ডুর একটি সেনা হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে তাঁদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে।
কবির মহার্জন বর্তমানে হাত-পা নড়াতে পারছেন না। তবে সঞ্জয় সাহের আঘাত গুরুতর নয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কবিরের ভাই আমির মহার্জন বলেন, তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো খবর পাননি। তবে সংবাদমাধ্যমে ভাইকে জীবিত উদ্ধারের খবর শুনে তাঁকে হাসপাতালে যেতে বলা হয়েছে। ভাইকে জীবিত পাওয়ার খবরে পুরো পরিবার অত্যন্ত আনন্দিত বলেও জানান তিনি।
চলছে আরও শ্রমিকের সন্ধান
আপার ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আশপাশে এখনো উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চলছে। নেপালের সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করছে।
উদ্ধারকাজে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের বিশেষজ্ঞরাও সহায়তা করছেন। বিভিন্ন প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞের একটি দল দূর থেকে উদ্ধারকারী দলকে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছে। হেলিকপ্টার ও ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি এই সমন্বিত প্রচেষ্টা টানেলের ভেতরে জীবিতদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এর আগে বিপর্যয়ের কয়েক ঘণ্টা পর আরেকটি টানেল থেকেও অল্পসংখ্যক মানুষ বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁদের অভিজ্ঞতাও বর্তমান উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে।
বিপর্যয়ে ক্ষতি ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত সপ্তাহের ভয়াবহ বিপর্যয়ে দেশটির সম্পদ, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর অন্তত ৩৮৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন নেপালি রুপির ক্ষতি হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় ২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে অন্তত ৭ হাজার ৫০০টি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
বিপর্যয়ের কারণে বাণিজ্যিক বিমা খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতেই ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকও শত শত
নেপাল জানিয়েছে, ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তীর্থযাত্রী ও পর্যটক।
নিখোঁজ ৩৬ জন নাগরিকের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অস্ট্রেলিয়াও বিশেষ দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞদের নেপালে পাঠিয়েছে। তাঁরা স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করবেন।
এদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও এই বিপর্যয়ে ২১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সেখানে আরও ৫৪১ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নয় দিন পরও জেগে আছে আশার আলো
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের পর একের পর এক ধ্বংসস্তূপ ও টানেল থেকে নিখোঁজদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। নয় দিন পর কবির মহার্জন ও সঞ্জয় সাহকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা সেই কঠিন অভিযানে নতুন আশার আলো দেখিয়েছে।
উদ্ধারকারীরা এখন টানেলের আরও গভীরে পৌঁছে অন্য শ্রমিকদের সন্ধান চালাচ্ছেন। টানেলের ভেতরে আরও কেউ জীবিত আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল। দুই শ্রমিকের জীবিত ফিরে আসা তাই নিখোঁজ অন্যদের পরিবারগুলোর জন্যও নতুন করে আশার বার্তা হয়ে উঠেছে।
নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও বন্যার নয় দিন পর জলবিদ্যুৎ টানেল থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ অন্যদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















