০৫:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের

ভয় নয়, সতর্কতার সময়: হান্টাভাইরাস আতঙ্ক আমাদের কী শেখাচ্ছে

বিশ্ব মাত্র কয়েক বছর আগে এক মহামারির ধাক্কা সামলে উঠেছে। ফলে এখন যে কোনো নতুন সংক্রমণের খবর মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি করে। আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলকারী একটি প্রমোদতরীতে কয়েকজন যাত্রীর রহস্যজনক অসুস্থতা ও মৃত্যুর পর হান্টাভাইরাস নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিও সেই মানসিক প্রতিক্রিয়ারই অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব সংক্রমণই মহামারিতে রূপ নেয় না। বরং কিছু ভাইরাস আছে, যেগুলো ভয়াবহ হলেও ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা সীমিত। বর্তমান পরিস্থিতি সম্ভবত সেই ধরনেরই একটি উদাহরণ।

এই ঘটনার গুরুত্ব অবশ্যই আছে। কয়েকজন মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই ছোট করে দেখার বিষয় নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বোঝা জরুরি যে, আতঙ্ক আর সতর্কতা এক জিনিস নয়। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কখন মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হবে, আর কখন আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত রাখা হবে। হান্টাভাইরাসের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের একটি পরীক্ষা।

হান্টাভাইরাস নতুন কোনো রোগ নয়। বহু বছর ধরেই এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়। সাধারণত ইঁদুর, ইঁদুরজাতীয় প্রাণী বা তাদের বর্জ্যের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও, আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে আমেরিকা মহাদেশে পাওয়া কিছু ধরনের হান্টাভাইরাস ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে আক্রমণ করে এবং মৃত্যুহারও অনেক বেশি।

তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি রয়েছে। এই ভাইরাস সাধারণত মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়ায় না। কোভিড-১৯-এর মতো বাতাসে ভেসে সহজে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে সংক্রমিত হওয়ার প্রবণতা এতে নেই। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা এখনো এটিকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না।

বর্তমান ঘটনার ক্ষেত্রেও তদন্তকারীদের প্রধান প্রশ্ন হলো—সংক্রমণের উৎস কোথায়? ভাইরাসটি কি জাহাজেই ছড়িয়েছে, নাকি যাত্রীরা আগে থেকেই আক্রান্ত ছিলেন? আর যদি মানুষে মানুষে সংক্রমণ ঘটে থাকে, সেটি কতটা সীমিত ছিল?

Hantavirus: Symptoms, spread, prevention — All you need to know - The Times  of India

এখানে বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোগের প্রকৃতি বোঝার আগে জনমনে ভয় ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় গুজব ও আতঙ্ক রোগের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই ঘটনার পেছনে ‘অ্যান্ডিজ ভাইরাস’ থাকতে পারে। এটি হান্টাভাইরাসের এমন একটি ধরন, যার ক্ষেত্রে সীমিত মানব-থেকে-মানব সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু সেই সংক্রমণও সাধারণত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘ সময়ের সংস্পর্শে ঘটে। একই কক্ষে থাকা, একসঙ্গে খাওয়া বা নিবিড় পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর নজির রয়েছে। অর্থাৎ এটি এমন ভাইরাস নয়, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহর বা দেশজুড়ে বিস্তার লাভ করবে।

এই বাস্তবতা আমাদের আরেকটি বড় শিক্ষা দেয়। জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় আতঙ্ক নয়, তথ্যই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যখন মানুষ অজানা কোনো ভাইরাসের কথা শোনে, তখন অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সামনে চলে আসে। কিন্তু প্রতিটি ভাইরাসের আচরণ আলাদা। তাই একটিকে আরেকটির সঙ্গে সরলভাবে তুলনা করা বিপজ্জনক হতে পারে।

অবশ্যই সতর্কতা প্রয়োজন। সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানা, ধুলাবালিময় বা ইঁদুরের উপস্থিতি আছে এমন জায়গায় সাবধান থাকা, প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার করা—এসব সাধারণ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত, সংক্রমিত ব্যক্তিদের আলাদা রাখা এবং সম্ভাব্য সংস্পর্শ শনাক্ত করাও জরুরি।

কিন্তু এর বাইরে গিয়ে ভয়কে সামাজিক আতঙ্কে রূপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ বিজ্ঞান এখনো বলছে, এই ভাইরাসের বিস্তার সীমিত এবং বর্তমান পরিস্থিতিও সম্ভবত একটি বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি হিসেবেই থেকে যাবে।

মহামারির পরবর্তী পৃথিবীতে মানুষের স্নায়ু অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। ফলে ছোট আকারের সংক্রমণও বড় আতঙ্কের জন্ম দেয়। কিন্তু প্রতিটি সংকটকে একই চোখে দেখলে আমরা বাস্তব ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলব। হান্টাভাইরাসের সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সতর্ক থাকা জরুরি, কিন্তু আতঙ্কিত হওয়া নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়?

ভয় নয়, সতর্কতার সময়: হান্টাভাইরাস আতঙ্ক আমাদের কী শেখাচ্ছে

০৮:১৯:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬

বিশ্ব মাত্র কয়েক বছর আগে এক মহামারির ধাক্কা সামলে উঠেছে। ফলে এখন যে কোনো নতুন সংক্রমণের খবর মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি করে। আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলকারী একটি প্রমোদতরীতে কয়েকজন যাত্রীর রহস্যজনক অসুস্থতা ও মৃত্যুর পর হান্টাভাইরাস নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিও সেই মানসিক প্রতিক্রিয়ারই অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব সংক্রমণই মহামারিতে রূপ নেয় না। বরং কিছু ভাইরাস আছে, যেগুলো ভয়াবহ হলেও ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা সীমিত। বর্তমান পরিস্থিতি সম্ভবত সেই ধরনেরই একটি উদাহরণ।

এই ঘটনার গুরুত্ব অবশ্যই আছে। কয়েকজন মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই ছোট করে দেখার বিষয় নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বোঝা জরুরি যে, আতঙ্ক আর সতর্কতা এক জিনিস নয়। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কখন মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হবে, আর কখন আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত রাখা হবে। হান্টাভাইরাসের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের একটি পরীক্ষা।

হান্টাভাইরাস নতুন কোনো রোগ নয়। বহু বছর ধরেই এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়। সাধারণত ইঁদুর, ইঁদুরজাতীয় প্রাণী বা তাদের বর্জ্যের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও, আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে আমেরিকা মহাদেশে পাওয়া কিছু ধরনের হান্টাভাইরাস ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে আক্রমণ করে এবং মৃত্যুহারও অনেক বেশি।

তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি রয়েছে। এই ভাইরাস সাধারণত মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়ায় না। কোভিড-১৯-এর মতো বাতাসে ভেসে সহজে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে সংক্রমিত হওয়ার প্রবণতা এতে নেই। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা এখনো এটিকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না।

বর্তমান ঘটনার ক্ষেত্রেও তদন্তকারীদের প্রধান প্রশ্ন হলো—সংক্রমণের উৎস কোথায়? ভাইরাসটি কি জাহাজেই ছড়িয়েছে, নাকি যাত্রীরা আগে থেকেই আক্রান্ত ছিলেন? আর যদি মানুষে মানুষে সংক্রমণ ঘটে থাকে, সেটি কতটা সীমিত ছিল?

Hantavirus: Symptoms, spread, prevention — All you need to know - The Times  of India

এখানে বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোগের প্রকৃতি বোঝার আগে জনমনে ভয় ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় গুজব ও আতঙ্ক রোগের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই ঘটনার পেছনে ‘অ্যান্ডিজ ভাইরাস’ থাকতে পারে। এটি হান্টাভাইরাসের এমন একটি ধরন, যার ক্ষেত্রে সীমিত মানব-থেকে-মানব সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু সেই সংক্রমণও সাধারণত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘ সময়ের সংস্পর্শে ঘটে। একই কক্ষে থাকা, একসঙ্গে খাওয়া বা নিবিড় পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর নজির রয়েছে। অর্থাৎ এটি এমন ভাইরাস নয়, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহর বা দেশজুড়ে বিস্তার লাভ করবে।

এই বাস্তবতা আমাদের আরেকটি বড় শিক্ষা দেয়। জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় আতঙ্ক নয়, তথ্যই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যখন মানুষ অজানা কোনো ভাইরাসের কথা শোনে, তখন অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সামনে চলে আসে। কিন্তু প্রতিটি ভাইরাসের আচরণ আলাদা। তাই একটিকে আরেকটির সঙ্গে সরলভাবে তুলনা করা বিপজ্জনক হতে পারে।

অবশ্যই সতর্কতা প্রয়োজন। সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানা, ধুলাবালিময় বা ইঁদুরের উপস্থিতি আছে এমন জায়গায় সাবধান থাকা, প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার করা—এসব সাধারণ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত, সংক্রমিত ব্যক্তিদের আলাদা রাখা এবং সম্ভাব্য সংস্পর্শ শনাক্ত করাও জরুরি।

কিন্তু এর বাইরে গিয়ে ভয়কে সামাজিক আতঙ্কে রূপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ বিজ্ঞান এখনো বলছে, এই ভাইরাসের বিস্তার সীমিত এবং বর্তমান পরিস্থিতিও সম্ভবত একটি বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি হিসেবেই থেকে যাবে।

মহামারির পরবর্তী পৃথিবীতে মানুষের স্নায়ু অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। ফলে ছোট আকারের সংক্রমণও বড় আতঙ্কের জন্ম দেয়। কিন্তু প্রতিটি সংকটকে একই চোখে দেখলে আমরা বাস্তব ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলব। হান্টাভাইরাসের সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সতর্ক থাকা জরুরি, কিন্তু আতঙ্কিত হওয়া নয়।