০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের

শান্তির বিশ্বাস ধ্বংসস্তূপের নিচে 

যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম দিকটি কেবল ধ্বংসস্তূপের ছবি নয়; বরং সেই মানুষগুলোর জীবন, যাদের ঘর হারিয়ে যায়, শরীর ভেঙে যায়, কিন্তু তারপরও তারা ঘৃণার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। সংঘাতের পরিসংখ্যান প্রায়ই মানুষের মুখ, কণ্ঠ আর যন্ত্রণাকে আড়াল করে দেয়। অথচ প্রতিটি ধসে পড়া বাড়ি, প্রতিটি আহত শরীর এবং প্রতিটি বাস্তুচ্যুত পরিবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য চুকায় সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি নিজের বাড়ি হারানোর অভিজ্ঞতা এবং প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় হাত ভেঙে যাওয়ার ঘটনা আমাকে আরও গভীরভাবে বুঝিয়েছে, সহিংসতার অভিঘাত কতটা নির্মম। বয়সের ভারে দ্রুত দৌড়ানো সম্ভব হয়নি। চারপাশে আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছি। কিন্তু শারীরিক ক্ষত যতই গভীর হোক, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই যন্ত্রণার শেষ কোথায়?

আমার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই সংঘাতের দুই প্রান্তেই অসংখ্য নিরীহ মানুষ একই ধরনের বেদনা বহন করছে। যুদ্ধ কোনো জাতি, ধর্ম বা পরিচয় দেখে ক্ষতি করে না; এটি শিশুদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয়, পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে এবং মানুষের মনে এমন ক্ষত তৈরি করে, যা বহু বছরেও শুকায় না।

তবু আমি বিশ্বাস করি, প্রতিশোধের রাজনীতি কখনো স্থায়ী নিরাপত্তা আনতে পারে না। ঘৃণার ওপর দাঁড়িয়ে শান্তির ভবিষ্যৎ নির্মাণ অসম্ভব। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি—উভয় জনগণের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মানবিক অধিকারকে সমান গুরুত্ব দিয়েই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ খুঁজতে হবে। সাহসের প্রকৃত অর্থ অস্ত্র ধারণ নয়; বরং এমন বাস্তবতাকে স্বীকার করা, যেখানে দুই পক্ষের মানবিক অস্তিত্ব সমানভাবে মূল্যবান।

Get me out of here': how two Syrian siblings survived trapped under rubble  | Turkey-Syria earthquake 2023 | The Guardian

এই অঞ্চলের শিশুদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় মূল্য তারা দিচ্ছে। কোনো শিশুরই প্রতিদিন বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘুমাতে যাওয়ার কথা নয়। কোনো শিশুর শৈশব ভয়ের মধ্যে কাটার কথা নয়। তাদের প্রাপ্য এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে স্বপ্ন থাকবে, আতঙ্ক নয়; আশা থাকবে, ট্রমা নয়।

এ কারণেই আমি এখনো সংলাপের শক্তিতে আস্থা রাখি। বহু দরজা যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়েছে, কিন্তু আন্তরিক কথোপকথন সেই বন্ধ দরজার সামনে নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে দিতে পারে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সত্যভিত্তিক আলোচনা প্রায়ই এমন পরিবর্তনের সূচনা করে, যা রাজনৈতিক অবস্থান একা কখনো করতে পারে না।

এই বিশ্বাস থেকেই আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি একটি আবেদন জানাতে চাই। ইতিহাসে যেসব নেতা স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, তারা কেবল ক্ষমতার কারণে স্মরণীয় হননি; তারা মানুষের কণ্ঠ শুনতে পেরেছিলেন বলেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে যারা মানবিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেন, তারাই কঠিন সময়ে নতুন পথের সূচনা করতে সক্ষম হন।

চার দশকেরও বেশি সময় শিক্ষা, সমাজ ও মানবিক সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের মর্যাদা কখনো রাজনৈতিক বিরোধের কাছে পরাজিত হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘ এই পথচলায় অসংখ্য সংকট দেখেছি, অসংখ্য মানুষের কষ্টের সাক্ষী হয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সম্মান দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং স্থিতিশীল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি।

In pictures: In the rubble of Gaza - April 26, 2024 | Reuters

আমার এই আহ্বানের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত লাভের আকাঙ্ক্ষা নেই। আমি কোনো রাজনৈতিক সুবিধাও চাই না। আমি চাই, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি মানবিক কণ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাক। কারণ কখনো কখনো একটি আন্তরিক সংলাপ এমন সম্ভাবনার জন্ম দেয়, যা দীর্ঘদিনের সংঘাতও সৃষ্টি করতে পারেনি।

আমি একা পৃথিবী বদলে দিতে পারব না—এ কথা জানি। কিন্তু এটুকু বিশ্বাস করি, যদি শান্তিতে বিশ্বাসী মানুষ একে অপরের সঙ্গে সত্য ও সাহস নিয়ে কথা বলতে পারেন, তবে সেই আলোচনাই হয়তো বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। আজ যখন ধ্বংসস্তূপের ছবি প্রতিদিনের বাস্তবতা, তখন আরও বেশি প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা যুদ্ধের ধারাবাহিকতার পরিবর্তে সংলাপকে বেছে নেবে।

আমার ঘর ভেঙে পড়েছে। আমার হাত ভেঙেছে। কিন্তু শান্তির প্রতি আমার বিশ্বাস ভাঙেনি। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে অস্ত্রের শক্তি নয়, বরং মানবিকতার শক্তি।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়?

শান্তির বিশ্বাস ধ্বংসস্তূপের নিচে 

০৬:৪৬:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম দিকটি কেবল ধ্বংসস্তূপের ছবি নয়; বরং সেই মানুষগুলোর জীবন, যাদের ঘর হারিয়ে যায়, শরীর ভেঙে যায়, কিন্তু তারপরও তারা ঘৃণার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। সংঘাতের পরিসংখ্যান প্রায়ই মানুষের মুখ, কণ্ঠ আর যন্ত্রণাকে আড়াল করে দেয়। অথচ প্রতিটি ধসে পড়া বাড়ি, প্রতিটি আহত শরীর এবং প্রতিটি বাস্তুচ্যুত পরিবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য চুকায় সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি নিজের বাড়ি হারানোর অভিজ্ঞতা এবং প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় হাত ভেঙে যাওয়ার ঘটনা আমাকে আরও গভীরভাবে বুঝিয়েছে, সহিংসতার অভিঘাত কতটা নির্মম। বয়সের ভারে দ্রুত দৌড়ানো সম্ভব হয়নি। চারপাশে আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছি। কিন্তু শারীরিক ক্ষত যতই গভীর হোক, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই যন্ত্রণার শেষ কোথায়?

আমার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই সংঘাতের দুই প্রান্তেই অসংখ্য নিরীহ মানুষ একই ধরনের বেদনা বহন করছে। যুদ্ধ কোনো জাতি, ধর্ম বা পরিচয় দেখে ক্ষতি করে না; এটি শিশুদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয়, পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে এবং মানুষের মনে এমন ক্ষত তৈরি করে, যা বহু বছরেও শুকায় না।

তবু আমি বিশ্বাস করি, প্রতিশোধের রাজনীতি কখনো স্থায়ী নিরাপত্তা আনতে পারে না। ঘৃণার ওপর দাঁড়িয়ে শান্তির ভবিষ্যৎ নির্মাণ অসম্ভব। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি—উভয় জনগণের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মানবিক অধিকারকে সমান গুরুত্ব দিয়েই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ খুঁজতে হবে। সাহসের প্রকৃত অর্থ অস্ত্র ধারণ নয়; বরং এমন বাস্তবতাকে স্বীকার করা, যেখানে দুই পক্ষের মানবিক অস্তিত্ব সমানভাবে মূল্যবান।

Get me out of here': how two Syrian siblings survived trapped under rubble  | Turkey-Syria earthquake 2023 | The Guardian

এই অঞ্চলের শিশুদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় মূল্য তারা দিচ্ছে। কোনো শিশুরই প্রতিদিন বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘুমাতে যাওয়ার কথা নয়। কোনো শিশুর শৈশব ভয়ের মধ্যে কাটার কথা নয়। তাদের প্রাপ্য এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে স্বপ্ন থাকবে, আতঙ্ক নয়; আশা থাকবে, ট্রমা নয়।

এ কারণেই আমি এখনো সংলাপের শক্তিতে আস্থা রাখি। বহু দরজা যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়েছে, কিন্তু আন্তরিক কথোপকথন সেই বন্ধ দরজার সামনে নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে দিতে পারে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সত্যভিত্তিক আলোচনা প্রায়ই এমন পরিবর্তনের সূচনা করে, যা রাজনৈতিক অবস্থান একা কখনো করতে পারে না।

এই বিশ্বাস থেকেই আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি একটি আবেদন জানাতে চাই। ইতিহাসে যেসব নেতা স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, তারা কেবল ক্ষমতার কারণে স্মরণীয় হননি; তারা মানুষের কণ্ঠ শুনতে পেরেছিলেন বলেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে যারা মানবিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেন, তারাই কঠিন সময়ে নতুন পথের সূচনা করতে সক্ষম হন।

চার দশকেরও বেশি সময় শিক্ষা, সমাজ ও মানবিক সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের মর্যাদা কখনো রাজনৈতিক বিরোধের কাছে পরাজিত হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘ এই পথচলায় অসংখ্য সংকট দেখেছি, অসংখ্য মানুষের কষ্টের সাক্ষী হয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সম্মান দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং স্থিতিশীল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি।

In pictures: In the rubble of Gaza - April 26, 2024 | Reuters

আমার এই আহ্বানের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত লাভের আকাঙ্ক্ষা নেই। আমি কোনো রাজনৈতিক সুবিধাও চাই না। আমি চাই, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি মানবিক কণ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাক। কারণ কখনো কখনো একটি আন্তরিক সংলাপ এমন সম্ভাবনার জন্ম দেয়, যা দীর্ঘদিনের সংঘাতও সৃষ্টি করতে পারেনি।

আমি একা পৃথিবী বদলে দিতে পারব না—এ কথা জানি। কিন্তু এটুকু বিশ্বাস করি, যদি শান্তিতে বিশ্বাসী মানুষ একে অপরের সঙ্গে সত্য ও সাহস নিয়ে কথা বলতে পারেন, তবে সেই আলোচনাই হয়তো বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। আজ যখন ধ্বংসস্তূপের ছবি প্রতিদিনের বাস্তবতা, তখন আরও বেশি প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা যুদ্ধের ধারাবাহিকতার পরিবর্তে সংলাপকে বেছে নেবে।

আমার ঘর ভেঙে পড়েছে। আমার হাত ভেঙেছে। কিন্তু শান্তির প্রতি আমার বিশ্বাস ভাঙেনি। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে অস্ত্রের শক্তি নয়, বরং মানবিকতার শক্তি।