বিখ্যাত অস্ট্রেলীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী স্টিভ আরউইনের মৃত্যুর ২০ বছর পূর্তিতে তাঁকে আবেগঘন শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন তাঁর মেয়ে বিন্দি আরউইন। বাবাকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘সুপারহিরো’ হিসেবে। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, দুই দশক পরও বাবাকে হারানোর শোক তাঁদের পরিবারের জীবনের প্রতিটি দিনের সঙ্গী হয়ে আছে।
স্টিভ আরউইন ‘কুমির শিকারি’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। বন্যপ্রাণী নিয়ে তাঁর কাজ, সাহসী উপস্থাপনা এবং প্রাণীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
পানির নিচে প্রাণ হারান স্টিভ
২০০৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে একটি তথ্যচিত্রের দৃশ্য ধারণের সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান স্টিভ আরউইন। পানির নিচে কাজ করার সময় একটি স্টিংরে মাছের হুল তাঁর বুকে প্রাণঘাতীভাবে বিদ্ধ হয়।
তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪৪ বছর।
স্টিভের মৃত্যুর সময় তাঁর মেয়ে বিন্দির বয়স ছিল আট বছর। শুক্রবার বাবার মৃত্যুর দুই দশক পূর্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় বিন্দি লিখেছেন, গত ২০ বছর ধরে তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে বাবার জন্য পুরো বিশ্বের শোক দেখেছেন।
২৮ বছর বয়সী বিন্দি বলেন, তিনি সব সময় মনে করতেন তাঁর বাবার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝেছেন, তাঁর বাবার প্রকৃত উত্তরাধিকার ভালোবাসা—পৃথিবীর প্রতি এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা।
‘শোক কখনো পুরোপুরি চলে যায় না’
বাবাকে হারানোর পর তাঁর মা টেরি এবং ছোট ভাই রবার্টের ওপর যে গভীর প্রভাব পড়েছে, সেটিও তুলে ধরেছেন বিন্দি।
তিনি জানান, তাঁর মা জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন। আর তিনি ও তাঁর ভাই হারিয়েছেন তাঁদের জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ বাবাকে।
বিন্দির ভাষায়, শোক কখনো পুরোপুরি আমাদের ছেড়ে যায় না। বরং মানুষ প্রতিদিন সেই শোককে সঙ্গে নিয়েই জীবন এগিয়ে নেয়।
তবে স্টিভের স্মৃতি তাঁদের পরিবারে এখনো গভীরভাবে জীবন্ত। বিন্দি জানান, তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে প্রতিদিন সকালে স্টিভের তথ্যচিত্র দেখে। দাদুকে কখনো সামনাসামনি না দেখলেও শিশুটি তাঁর ‘কুমির দাদা’র কাছ থেকে ভালোবাসা অনুভব করে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরাধিকার
স্টিভ আরউইনের মৃত্যুর পরও তাঁর পরিবার অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া চিড়িয়াখানার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্টিভের কাজ এবং মানুষের মধ্যে প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা তৈরির প্রচেষ্টা তাঁর পরিবারের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে।
বিন্দি মনে করেন, তাঁর বাবার জীবনের প্রভাব এতটাই গভীর যে তা আগামী প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে। তাই বাবার জীবন ও রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারকে তিনি শুধু শোকের বিষয় হিসেবে দেখেন না, বরং উদ্যাপনের বিষয় হিসেবেও দেখেন।
বাবাকে পরিবারের ‘অভিভাবক দেবদূত’ হিসেবে স্মরণ করে বিন্দি জানান, তিনি তাঁকে তাঁর সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন।
মেয়ের জন্মের গল্পও স্মরণ করলেন টেরি
স্টিভের স্ত্রী টেরিও তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বামীকে স্মরণ করেছেন। তিনি এমন একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছেন, যেখানে স্টিভ তাঁদের মেয়ে বিন্দির জন্মের কথা বলেছিলেন।
সাক্ষাৎকারে স্টিভ বলেছিলেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ বন্যপ্রাণী অভিজ্ঞতা ছিল নিজের মেয়ের জন্ম।
বিন্দির জন্মের পর প্রথমবার তাঁকে কোলে নেওয়ার মুহূর্তেই মেয়ের নাম নিয়ে তাঁর মনে আসে একটি বিশেষ ভাবনা। নিজের প্রিয় কুমিরের নাম অনুসারে তিনি মেয়ের নাম রাখেন বিন্দি।
বাবার স্মৃতিতে রবার্টের আবেগঘন বার্তা
স্টিভের ছেলে রবার্ট আরউইনও বাবাকে স্মরণ করেছেন। তিনি শৈশবে বাবার কোলে থাকা একটি ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, তাঁর বাবার উত্তরাধিকার চিরস্থায়ী।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি স্টিভ আরউইনের পরিবারও তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে মানুষের মধ্যে প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাঁর মৃত্যুর ২০ বছর পরও তাঁর নাম ও কাজ অস্ট্রেলিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে গভীরভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
গত বছরের নভেম্বরে রবার্ট একটি জনপ্রিয় নৃত্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। এর এক দশক আগে একই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন তাঁর বোন বিন্দি। বাবার মৃত্যুর পরও ভাই-বোন দুজনেই বিভিন্নভাবে তাঁর স্মৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















