১১:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিউইয়র্কে বসছে ভোগ বিজনেসের বৈশ্বিক সম্মেলন, টিকিট বিক্রি শুরু ‘ক্লিন গার্ল’ যুগের বিদায়, বসন্ত-গ্রীষ্ম ২০২৭-এ আসছে নতুন ফ্যাশন ধারা দামি গয়না খোঁজার নতুন ঠিকানা কি টিকটক? বদলে যাওয়া শরীরের জন্য বিলাসবহুল ফ্যাশন, নতুন বাজার তৈরি করছে ওয়েলডান আমেরিকা কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত? কারখানার মেঝেতেই জাপানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল লড়াই ২৫ বছরেই শেষ ৫ লাখ ডলারের ক্যারিয়ার, ই-স্পোর্টসে বাড়ছে চোটের ভয়াবহতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এশিয়ার দিকে কানাডার নতুন বাণিজ্যযাত্রা তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের হিসাব জটিল করতে প্রতিরক্ষা জোট বাড়াচ্ছে জাপান দুর্নীতির অভিযোগে ইউক্রেনের প্রধান কৌঁসুলির পদত্যাগ

২০২৬ সালে পানি নিয়ে সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে যেসব অঞ্চল

পানি এখন শুধু জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এটি হয়ে উঠছে যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানি-সম্পর্কিত সংঘাত দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে এমন ৪২০টি সংঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি। ২০২০ সালের তুলনায় এ ধরনের সংঘাত প্রায় চার গুণ বেড়েছে।

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে শুরু হওয়া বিশ্ব পানি সপ্তাহে তাই বৈশ্বিক পানি নিরাপত্তার সংকট বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, পানির অবকাঠামোয় হামলা এবং সম্পদের অসম বণ্টন—সব মিলিয়ে বিশ্বের বেশ কয়েকটি অঞ্চল ভয়াবহ পানি সংকটের মুখে পড়েছে।

পানি কীভাবে সংঘাতের অংশ হয়ে উঠছে

যুদ্ধ ও সংঘাতের ক্ষেত্রে পানি সাধারণত তিনভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংঘাতের সময় বাঁধ, পাইপলাইন, কূপ, পানি পরিশোধনাগার ও বিদ্যুৎব্যবস্থা ধ্বংস হলে পানি নিজেই সংঘাতের ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে পানির সংকট, অসম বণ্টন কিংবা কৃষক ও পশুপালকদের মধ্যে পানির উৎস নিয়ে বিরোধ সহিংসতার কারণ হতে পারে। আবার কোনো পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পানি সরবরাহ বন্ধ করা, পানির উৎস দূষিত করা, এলাকা প্লাবিত করা কিংবা পানির প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে।

Where water conflicts pose the biggest threat in 2026 | Water News | Al  Jazeera

২০২৪ সালের নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর প্রায় ৫৫ শতাংশে পানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি ছিল প্রধান কারণ। প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে পানির সংকট বা প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ সংঘাতের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। আর প্রায় ২ শতাংশ ঘটনায় পানি সরাসরি অস্ত্র বা চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

ফিলিস্তিনে পানির ভয়াবহ সংকট

গাজায় যুদ্ধের কারণে পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায় ২১ লাখ মানুষের মধ্যে ১৯ লাখই বাস্তুচ্যুত। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়েছে।

অনেক মানুষ প্রতিদিন পান করা ও রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ছয় লিটার পানিও সংগ্রহ করতে পারছেন না। প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার পানি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।

যুদ্ধের কারণে শিশুদেরও পানি সংগ্রহের মতো কঠিন দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, পানি সংগ্রহ এবং জ্বালানি কাঠ জোগাড়ের মতো কাজ তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

পানির সরবরাহ সীমিত হওয়া এবং অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি পানির দামও ব্যাপক বেড়েছে। ফলে পানিবাহিত রোগ, ডায়রিয়া ও চর্মরোগের ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের কারণে ফিলিস্তিনিদের পানির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রামাল্লাহর পূর্বাঞ্চলের আইন সামিয়া কূপে বারবার হামলার ফলে প্রায় এক লাখ মানুষের পানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

সুদানে যুদ্ধের সঙ্গে বাড়ছে পানির সংকট

Gaza's Water Infrastructure Desperately Needs to be Rebuilt | Human Rights  Watch

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী ও দ্রুত সহায়তা বাহিনীর মধ্যে চলমান যুদ্ধে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মানবিক সংকটে পড়েছে তিন কোটিরও বেশি মানুষ।

বিশেষ করে দারফুরে জলাধার, পানি পরিশোধনাগার ও পানি সরবরাহব্যবস্থায় হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কলেরার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাও বাড়ছে।

দারফুর, কর্দোফান ও ব্লু নাইল অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে নিরাপদ পানির উৎস থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

ইরানে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের খরা

ইরানের পানি ব্যবস্থা যুদ্ধ শুরুর আগেই দীর্ঘদিনের খরা, স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির মজুত কমে যাওয়া এবং কৃষিতে অতিরিক্ত পানির ব্যবহারের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। কেশম দ্বীপ ও হরমোজগান প্রদেশের কয়েকটি লবণাক্ত পানি পরিশোধনাগার ও জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ ও সড়কব্যবস্থার ক্ষতিও মেরামতের কাজকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

কিছু জলাধারে পানির মজুত ৯২ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের শহর মাশহাদে জলাধারগুলোর পানির স্তর তিন শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে পানির বড় ভরসা সমুদ্রের পানি

উপসাগরীয় দেশগুলোর বেশির ভাগই বিশ্বের সবচেয়ে পানিস্বল্প অঞ্চলগুলোর মধ্যে পড়ে। নদী ও মিঠা পানির উৎস সীমিত হওয়ায় এসব দেশের পানির নিরাপত্তা অনেকাংশে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার বিশাল স্থাপনাগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

কুয়েতের পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশ, ওমানের ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবের ৭০ শতাংশ পানির জোগান আসে লবণমুক্তকরণ ব্যবস্থা থেকে। বাহরাইনে এই হার ৯০ শতাংশের বেশি এবং কাতারে প্রায় ৯৯ শতাংশ।

যুদ্ধের সময় বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের কয়েকটি পানি পরিশোধন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরবরাহে বড় ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ের খবর সীমিত থাকলেও ঘটনাগুলো অঞ্চলটির পানির অবকাঠামোর ভঙ্গুরতা সামনে এনেছে।

For Ukraine, Keeping the Lights On Is One of the Biggest Battles - The New  York Times

ইউক্রেনে যুদ্ধের আরেকটি বড় ক্ষত পানি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশটির পানি ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত বছর ৪৩ লাখ মানুষ নিরাপদ পানির সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু আরও প্রায় এক কোটি ২৭ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

হামলার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ায় পানি সরবরাহ ও শীতকালীন তাপ সরবরাহ উভয়ই ব্যাহত হয়েছে। খেরসনে সাম্প্রতিক হামলায় পুরো কয়েকটি এলাকার পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

২০২৩ সালের জুনে কাখোভকা বাঁধ বিপর্যয়ে এক লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক কোটি মানুষ নির্ভরযোগ্য নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পানি নিরাপত্তাই ভবিষ্যতের বড় যুদ্ধঝুঁকি

বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের চিত্র বলছে, পানি সংকট আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়। যুদ্ধের সময় পানি অবকাঠামো ধ্বংস হলে স্বাস্থ্য, খাদ্য, বিদ্যুৎ, কৃষি ও মানুষের বাস্তুচ্যুতি—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে।

এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা পানির চাহিদা যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে পানি নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে বোমা ও অস্ত্রের পাশাপাশি নিরাপদ পানির উৎস রক্ষা করাও মানবিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

নিউইয়র্কে বসছে ভোগ বিজনেসের বৈশ্বিক সম্মেলন, টিকিট বিক্রি শুরু

২০২৬ সালে পানি নিয়ে সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে যেসব অঞ্চল

০২:৫৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পানি এখন শুধু জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এটি হয়ে উঠছে যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানি-সম্পর্কিত সংঘাত দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে এমন ৪২০টি সংঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি। ২০২০ সালের তুলনায় এ ধরনের সংঘাত প্রায় চার গুণ বেড়েছে।

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে শুরু হওয়া বিশ্ব পানি সপ্তাহে তাই বৈশ্বিক পানি নিরাপত্তার সংকট বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, পানির অবকাঠামোয় হামলা এবং সম্পদের অসম বণ্টন—সব মিলিয়ে বিশ্বের বেশ কয়েকটি অঞ্চল ভয়াবহ পানি সংকটের মুখে পড়েছে।

পানি কীভাবে সংঘাতের অংশ হয়ে উঠছে

যুদ্ধ ও সংঘাতের ক্ষেত্রে পানি সাধারণত তিনভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংঘাতের সময় বাঁধ, পাইপলাইন, কূপ, পানি পরিশোধনাগার ও বিদ্যুৎব্যবস্থা ধ্বংস হলে পানি নিজেই সংঘাতের ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে পানির সংকট, অসম বণ্টন কিংবা কৃষক ও পশুপালকদের মধ্যে পানির উৎস নিয়ে বিরোধ সহিংসতার কারণ হতে পারে। আবার কোনো পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পানি সরবরাহ বন্ধ করা, পানির উৎস দূষিত করা, এলাকা প্লাবিত করা কিংবা পানির প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে।

Where water conflicts pose the biggest threat in 2026 | Water News | Al  Jazeera

২০২৪ সালের নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর প্রায় ৫৫ শতাংশে পানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি ছিল প্রধান কারণ। প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে পানির সংকট বা প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ সংঘাতের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। আর প্রায় ২ শতাংশ ঘটনায় পানি সরাসরি অস্ত্র বা চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

ফিলিস্তিনে পানির ভয়াবহ সংকট

গাজায় যুদ্ধের কারণে পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায় ২১ লাখ মানুষের মধ্যে ১৯ লাখই বাস্তুচ্যুত। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়েছে।

অনেক মানুষ প্রতিদিন পান করা ও রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ছয় লিটার পানিও সংগ্রহ করতে পারছেন না। প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার পানি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।

যুদ্ধের কারণে শিশুদেরও পানি সংগ্রহের মতো কঠিন দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, পানি সংগ্রহ এবং জ্বালানি কাঠ জোগাড়ের মতো কাজ তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

পানির সরবরাহ সীমিত হওয়া এবং অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি পানির দামও ব্যাপক বেড়েছে। ফলে পানিবাহিত রোগ, ডায়রিয়া ও চর্মরোগের ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের কারণে ফিলিস্তিনিদের পানির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রামাল্লাহর পূর্বাঞ্চলের আইন সামিয়া কূপে বারবার হামলার ফলে প্রায় এক লাখ মানুষের পানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

সুদানে যুদ্ধের সঙ্গে বাড়ছে পানির সংকট

Gaza's Water Infrastructure Desperately Needs to be Rebuilt | Human Rights  Watch

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী ও দ্রুত সহায়তা বাহিনীর মধ্যে চলমান যুদ্ধে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মানবিক সংকটে পড়েছে তিন কোটিরও বেশি মানুষ।

বিশেষ করে দারফুরে জলাধার, পানি পরিশোধনাগার ও পানি সরবরাহব্যবস্থায় হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কলেরার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাও বাড়ছে।

দারফুর, কর্দোফান ও ব্লু নাইল অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে নিরাপদ পানির উৎস থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

ইরানে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের খরা

ইরানের পানি ব্যবস্থা যুদ্ধ শুরুর আগেই দীর্ঘদিনের খরা, স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির মজুত কমে যাওয়া এবং কৃষিতে অতিরিক্ত পানির ব্যবহারের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। কেশম দ্বীপ ও হরমোজগান প্রদেশের কয়েকটি লবণাক্ত পানি পরিশোধনাগার ও জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ ও সড়কব্যবস্থার ক্ষতিও মেরামতের কাজকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

কিছু জলাধারে পানির মজুত ৯২ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের শহর মাশহাদে জলাধারগুলোর পানির স্তর তিন শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে পানির বড় ভরসা সমুদ্রের পানি

উপসাগরীয় দেশগুলোর বেশির ভাগই বিশ্বের সবচেয়ে পানিস্বল্প অঞ্চলগুলোর মধ্যে পড়ে। নদী ও মিঠা পানির উৎস সীমিত হওয়ায় এসব দেশের পানির নিরাপত্তা অনেকাংশে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার বিশাল স্থাপনাগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

কুয়েতের পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশ, ওমানের ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবের ৭০ শতাংশ পানির জোগান আসে লবণমুক্তকরণ ব্যবস্থা থেকে। বাহরাইনে এই হার ৯০ শতাংশের বেশি এবং কাতারে প্রায় ৯৯ শতাংশ।

যুদ্ধের সময় বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের কয়েকটি পানি পরিশোধন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরবরাহে বড় ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ের খবর সীমিত থাকলেও ঘটনাগুলো অঞ্চলটির পানির অবকাঠামোর ভঙ্গুরতা সামনে এনেছে।

For Ukraine, Keeping the Lights On Is One of the Biggest Battles - The New  York Times

ইউক্রেনে যুদ্ধের আরেকটি বড় ক্ষত পানি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশটির পানি ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত বছর ৪৩ লাখ মানুষ নিরাপদ পানির সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু আরও প্রায় এক কোটি ২৭ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

হামলার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ায় পানি সরবরাহ ও শীতকালীন তাপ সরবরাহ উভয়ই ব্যাহত হয়েছে। খেরসনে সাম্প্রতিক হামলায় পুরো কয়েকটি এলাকার পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

২০২৩ সালের জুনে কাখোভকা বাঁধ বিপর্যয়ে এক লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক কোটি মানুষ নির্ভরযোগ্য নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পানি নিরাপত্তাই ভবিষ্যতের বড় যুদ্ধঝুঁকি

বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের চিত্র বলছে, পানি সংকট আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়। যুদ্ধের সময় পানি অবকাঠামো ধ্বংস হলে স্বাস্থ্য, খাদ্য, বিদ্যুৎ, কৃষি ও মানুষের বাস্তুচ্যুতি—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে।

এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা পানির চাহিদা যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে পানি নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে বোমা ও অস্ত্রের পাশাপাশি নিরাপদ পানির উৎস রক্ষা করাও মানবিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।