চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান মুনশট হংকংয়ের শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে গোপনে আবেদন করেছে বলে জানা গেছে। চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে মুনশটের এই উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত তিনজনের তথ্য অনুযায়ী, বেইজিংভিত্তিক মুনশট হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ ও সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য
মুনশটের তৈরি কিমি নামের বৃহৎ ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা প্রযুক্তি খাতে দ্রুত পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ সংস্করণ কিমি কে৩ চালু করেছে চলতি বছরের জুলাইয়ে।
সংশ্লিষ্ট একজনের তথ্য অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে আসার মাধ্যমে মুনশট প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে চায়। এই উদ্যোগ সফল হলে এটি চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় শেয়ারবাজারে প্রবেশের ঘটনা হতে পারে।
এদিকে চলমান নতুন অর্থায়ন পর্বে মুনশটের মূল্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।
কিমি কে৩ ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ
মুনশটের সর্বশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা কিমি কে৩ নিয়ে ব্যবহারকারী ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন পরামিতি রয়েছে। এ কারণে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত ওজনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল হিসেবে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এই মডেল ঘিরে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হওয়ায় মুনশটের কম্পিউটিং সক্ষমতার ওপরও চাপ বেড়েছে। ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং মডেল পরিচালনার প্রয়োজনীয় হিসাবক্ষমতা বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আয় ভাগাভাগির আলোচনা
কিমি কে৩ ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দিতে মুনশট যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছে। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান তাদের মেঘভিত্তিক কম্পিউটিং অবকাঠামোর মাধ্যমে মুনশটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল পরিচালনা করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে আয় ভাগাভাগির চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। চুক্তি হলে চীনের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বড় কোনো মার্কিন মেঘভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এমন ধরনের বড় আকারের আয় ভাগাভাগির চুক্তি প্রথমবারের মতো হতে পারে।
মূল্যায়নে এগিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীরা
৫০ বিলিয়ন ডলারের মূল্যায়ন মুনশটকে চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। তবে দেশটির আরও কয়েকটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এর চেয়ে বেশি।
তথ্য অনুযায়ী, ডিপসিকের মূল্য প্রায় ৭৪ বিলিয়ন ডলার এবং জেডএআইয়ের বাজারমূল্য প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে মুনশটের মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে এর দ্রুত অগ্রগতি বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠানটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতেও মুনশট
প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি মুনশট যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের নজরেও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রিত এনভিডিয়া চিপ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানের তৈরি মডেল থেকে সক্ষমতা অনুকরণের অভিযোগও রয়েছে।
মুনশট অবশ্য কিমি কে৩-এর সক্ষমতা অন্য মডেল থেকে এ ধরনের অনুকরণের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে—এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছেন, মুনশটকে বাণিজ্যসংক্রান্ত কালো তালিকায় যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
শেয়ারবাজারে আসার আগে কাঠামো পরিবর্তন
হংকংয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার অনুমোদন পেতে মুনশটকে নিজেদের কোম্পানি কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি আগে বিদেশভিত্তিক কোম্পানি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হতো। শেয়ারবাজারে প্রবেশের প্রস্তুতির আগে সেই কাঠামো পরিবর্তন করে চীনের অভ্যন্তরীণ নিবন্ধিত কোম্পানি কাঠামোয় যেতে হয়েছে।
বড় বিনিয়োগকারীদের সমর্থন
মুনশটের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে চীনের বড় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আলিবাবা, টেনসেন্ট, আইডিজি ক্যাপিটাল এবং এইচএসজি।
চলতি বছরের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন অর্থ সংগ্রহ করেছে। এই অর্থায়নে মেইতুয়ান, চায়না মোবাইল এবং চীনের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সিপিইসহ বেশ কয়েকটি বিনিয়োগকারী অংশ নেয়।
এই নতুন অর্থায়নসহ মুনশট এখন পর্যন্ত মোট ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে।
শেয়ারবাজারে প্রবেশের প্রস্তুতিতে বড় ব্যাংক
হংকংয়ে শেয়ারবাজারে প্রবেশের প্রস্তুতিতে মুনশটকে সহায়তা করছে কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক ও চীনা ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকস, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ক্যাপিটাল করপোরেশন এবং ডয়চে ব্যাংক।
তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত মুনশটের শেয়ারবাজারে প্রবেশের চূড়ান্ত সময়সূচি নিশ্চিত নয়। বাজার পরিস্থিতি ও নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও পরিবর্তিত হতে পারে।
হংকংয়ের শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জোয়ার
চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজারে প্রবেশের প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে আরও জোরালো হয়েছে। চলতি বছরের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত হংকংয়ের শেয়ারবাজারে বিভিন্ন তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মোট ৪১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ হয়েছে।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই অর্থের পরিমাণ ১৪২ শতাংশ বেশি। এর বড় অংশই এসেছে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে।
মুনশটের সম্ভাব্য তালিকাভুক্তি সেই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন মুনশটের মতো একটি বড় চীনা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে প্রবেশ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















