০১:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
মিলান বিমানবন্দরে কে-পপ তারকা সুনঘুনকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা একই দিনে ট্রাম্প ও পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বললেন শি জিনপিং হাজারও মানুষ নির্বিচারে আটক, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা, ছয় দিনের অচলাবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভে পুড়ল উপদেষ্টা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের কুশপুত্তলিকা, চট্টগ্রাম বন্দর ইস্যুতে উত্তাপ ময়মনসিংহে যৌথ অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্রসহ ছাত্রদলের দুই কর্মী গ্রেপ্তার মির্জা আব্বাসের মিথ্যা নয় কাজের কথা ভেনেজুয়েলার তেলে শত বিলিয়ন ডলারের বাজি, ভরসা সংকট ঘেরা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ওপর জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক মামলায় বঙ্গভবনের কর্মকর্তার জামিন সিলিকন ভ্যালি কেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না

হাজারও মানুষ নির্বিচারে আটক, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হাজারও মানুষকে নির্বিচার আটকের কথা উঠে এসেছে এইচআরডব্লিউ'র বার্ষিক প্রতিবেদনে

ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সেখানকার আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শংকর মুখার্জীকে গত ২৭শে ডিসেম্বর নিজ বাড়ি থেকে সাদা পোশাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। এর একদিন পর ২০২২ সালে দায়ের করা এক মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

অভিযোগ করা হয়, তিনি বিএনপি অফিস হামলা-ভাঙচুরের সাথে যুক্ত ছিলেন।

তবে পরিবারের দাবি, বাজারে থাকা তাদের জমি-জমা দখল ও খামারের দখল নিতেই তার বিরুদ্ধে ওই মামলা দেওয়া হয়েছে। কারণ, ২০২২ সালে যখন মামলাটি করা হয় সেখানে মি. মুখার্জীর নাম ছিল না।

কেবল শংকর মুখার্জীই নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্বিচার আটক যেমন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তা জারি থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ – এইচআরডব্লিউ’র বার্ষিক প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থককে সন্দেহভাজন হত্যা মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, যাদের মধ্যে আছেন অভিনয়শিল্পী, আইনজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মীরাও।

অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে এবিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা যাবে না। তারপরও পরিস্থিতি না বদলের কারণ হিসেবে ‘মব সহিংসতা করে বিচার ব্যবস্থাকে জিম্মি’ এবং সরকারের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার দিকেই আঙ্গুল তুলছেন আইনজ্ঞরা।

দুটি হাত একটি লোহার গ্রিল খামচে ধরে আছে, একটি হাতে হাতকড়া

বাংলাদেশের সংবিধানে আইন বহির্ভূতভাবে কাউকে আটকে রাখাকে স্পষ্টভাবে মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে

বিনা বিচারে একজন ব্যক্তিকে কতক্ষণ আটক রাখা যেতে পারে?

শংকর মুখার্জীর মামলাটি পরিচালনা করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। ‘মিথ্যা মামলা’ উল্লেখ করে আদালতের কাছে দুইবার জামিন চাওয়া হলেও তা মঞ্জুর করা হয়নি বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশের মানবাধিকারের নানা দিক নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন – ২০২৬’এ বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিংবা প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

জোরপূর্বক গুমসহ ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি কমে এলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হাজার হাজার ব্যক্তিকে নির্বিচারে আটক করেছে এই সরকার।

অথচ বাংলাদেশের আইনে বিচার ছাড়া কাউকে ‘এক মুহূর্তও’ আটকে রাখা যায় না বলে বিবিসি বাংলাকে জানান আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

প্রয়োজন মনে হলে কাউকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রেও ২৪ ঘণ্টার বেশি হলে তাকে আদালতে পাঠাতে হবে।

“এমনিতে কাউকে আটক করার কোনো ক্ষমতা নাই তার বিরুদ্ধে মামলা না থাকলে বা আদালতের কোনো নির্দেশনা না থাকলে,” বলেন মি. মোরসেদ।

হাইকোর্টের সামনে সেনাসদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন

মব সন্ত্রাসে ভীত বিচারকরা, বলছেন আইনজ্ঞরা। ছবি প্রতীকী

বাংলাদেশের সংবিধানে আইন বহির্ভূতভাবে কাউকে আটকে রাখাকে স্পষ্টভাবে মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সংবিধানের ৩৩ ধারায় বলা আছে, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতারের কারণ না জানিয়ে আটক রাখা এবং তাকে তার আইনজীবীর সাথে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

গ্রেফতার কিংবা আটক ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে এবং ম্য্যাজস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া তাকে আটক রাখা যাবে না।

কিন্তু বিদেশি শত্রু এবং নিবর্তনমূলক আইনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না। তবে সেক্ষেত্রেও আবার এমন ব্যক্তিকে ছয় মাসের বেশি আটকে রাখতে হলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদমর্যাদার দুইজন এবং প্রবীণ সরকারি কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত পর্ষদের অনুমতি প্রয়োজন হবে।

এছাড়াও সংবিধানের ১০২ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী, আইনের বাইরে কিছু হলে সুপ্রিম কোর্ট নিজে অথবা কেউ যদি নিজে কোনো আবেদন নিয়ে আসে – উভয় ক্ষেত্রেই যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে কোনো ব্যক্তির মুক্তি নিশ্চিতের ক্ষমতা আদালতকে দেয়া হয়েছে।

গ্রেফতার হবার পর আইন অনুযায়ী ব্যক্তির জামিন পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু “সেটা অহরহ ভঙ্গ হচ্ছে, আগেও ভঙ্গ হয়েছে, এখন ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে”, বলছিলেন মি. মোরসেদ।

ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনে নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবিকভাবে তার বিপরীত দৃশ্যই সামনে আসছে। বরং পতিত আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ

দেদারসে চলছে মামলা বাণিজ্য

সংবিধান সমুন্নত রাখার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। ফলে সংবিধানে উল্লিখিত মানবাধিকার লঙ্ঘন হলেও ‘সুপ্রিম কোর্ট এবিষয়ে যথেষ্ট সক্রিয় নয়’ বলেই মনে করছেন আইনজীবীরা।

মামলা নিয়ে গেলে বিচারকদের তা শুনতে অনীহা প্রকাশ এবং “হাজার হাজার মামলা হলেও লিস্টে আসছে অল্প কিছু সংখ্যক, এ ব্যবস্থাটা করা হয়েছে – যার ফলে এই দায় বা দায়িত্ব যে বিচার বিভাগের ওপর দেওয়া হয়েছে, সেই বিচার বিভাগও এখানে ব্যর্থ হয়েছে এই মানুষগুলোর অধিকার রক্ষা করার জন্য”, বলছিলেন মনজিল মোরসেদ।

তার কারণ হিসেবে ‘মব’ আর সরকারের ভূমিকা – এই দুইটি বিষয়কেই সামনে আনছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।

তারা অভিযোগ করছেন, ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে।

একদিকে সরকার হস্তক্ষেপ করছে, অন্যদিকে “মব করে বিচারকদের ওপরে আক্রমণ করা হয়েছে। বিচারকদের অপসারণ করা হয়েছে”, বলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

একই কথা বলছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকও। “বিচারকদের যে এত বরখাস্ত করা হলো, বিচারকরদের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে”।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে ছোটো কোনো ঘটনাতেও যেমন আশেপাশের বিএনপির একশো-দুশো নেতা কর্মীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো “বর্তমান আমলে এসে সেটা আরও বেড়ে গেছে। কারণ পুলিশ অজ্ঞাতনামায় ফাঁসিয়ে দিয়ে বলবে এই মামলায় আপনার নাম ঢুকায় দেবো, আমাকে পয়সা দেন”।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক

আর এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল যে, একটি অপরাধের অভিযোগ করতে গিয়ে অনেক বেশি মানুষের নাম যখন মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই ‘এবসার্ড’ বা অর্থহীন কাজকে না থামানো।

শাহদীন মালিকের মতে, পুলিশের দায়িত্ব ছিল ‘প্রিলিমিনারি প্রবাবিলিটি যাচাই করা। “ওইটা পুলিশ করে নাই কারণ নাম বাদ দিয়ে দিলে তো তার ব্যবসা কমে যাবে”।

মামলা বাণিজ্যে ভুক্তভোগীদের হয়রানির কথা বলছিলেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনও।

তার মতে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারা আসলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করছে, জনগণের ওপর ভিত্তি করে না।

তার ওপর পাঁচই অগাস্টের পর যে মব সন্ত্রাস দেখা গেছে, যার ফলে কিছু মানুষ কাউকে বা কোনো দলকে আটক করে পুলিশের হাতে দিচ্ছে, “এবং পুলিশ তখন বাধ্য হচ্ছে মবের কাছে নতি শিকার করে মামলা নিতে বা তাদের আটক করতে”।

এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের যে ধরনের বার্তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে বলেও মনে করেন মি. লিটন।

তবে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের এসব অভিযোগের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বার্ষিক প্রতিবেদনে আরও যা আছে

বাংলাদেশের মানবাধিকারের নানা দিক নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন – ২০২৬’র তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটকের ধারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়াও নারী ও ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে আশঙ্কাজনক হারে রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরের গোষ্ঠীর মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৪ জন নিহতের খবর উঠে এসেছে।

‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানের আওতায় অন্তত আট হাজার ৬০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং মতপ্রকাশ দমনে অতীতে ব্যবহৃত দমনমূলক দুটি আইন—বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনেও আরও বহু মানুষ গ্রেপ্তার হয়ে থাকতে পারেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছরের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে ঘটা সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হন।

এরপর পুলিশ নির্বিচারে শত শত কথিত আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করে এবং আট হাজার ৪০০’র বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের করে, যাদের বেশিরভাগই অজ্ঞাতনামা।

যদিও সরকার এই ‘গণগ্রেফতার’-এর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অক্টোবরে প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের বরাত দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে নির্যাতনের ফলে ১৪ জনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন প্রায় আট হাজার মানুষ আর নিহত হয়েছেন ৮১ জন।

 

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

মিলান বিমানবন্দরে কে-পপ তারকা সুনঘুনকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা

হাজারও মানুষ নির্বিচারে আটক, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

১১:৩৭:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সেখানকার আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শংকর মুখার্জীকে গত ২৭শে ডিসেম্বর নিজ বাড়ি থেকে সাদা পোশাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। এর একদিন পর ২০২২ সালে দায়ের করা এক মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

অভিযোগ করা হয়, তিনি বিএনপি অফিস হামলা-ভাঙচুরের সাথে যুক্ত ছিলেন।

তবে পরিবারের দাবি, বাজারে থাকা তাদের জমি-জমা দখল ও খামারের দখল নিতেই তার বিরুদ্ধে ওই মামলা দেওয়া হয়েছে। কারণ, ২০২২ সালে যখন মামলাটি করা হয় সেখানে মি. মুখার্জীর নাম ছিল না।

কেবল শংকর মুখার্জীই নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্বিচার আটক যেমন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তা জারি থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ – এইচআরডব্লিউ’র বার্ষিক প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থককে সন্দেহভাজন হত্যা মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, যাদের মধ্যে আছেন অভিনয়শিল্পী, আইনজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মীরাও।

অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে এবিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা যাবে না। তারপরও পরিস্থিতি না বদলের কারণ হিসেবে ‘মব সহিংসতা করে বিচার ব্যবস্থাকে জিম্মি’ এবং সরকারের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার দিকেই আঙ্গুল তুলছেন আইনজ্ঞরা।

দুটি হাত একটি লোহার গ্রিল খামচে ধরে আছে, একটি হাতে হাতকড়া

বাংলাদেশের সংবিধানে আইন বহির্ভূতভাবে কাউকে আটকে রাখাকে স্পষ্টভাবে মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে

বিনা বিচারে একজন ব্যক্তিকে কতক্ষণ আটক রাখা যেতে পারে?

শংকর মুখার্জীর মামলাটি পরিচালনা করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। ‘মিথ্যা মামলা’ উল্লেখ করে আদালতের কাছে দুইবার জামিন চাওয়া হলেও তা মঞ্জুর করা হয়নি বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশের মানবাধিকারের নানা দিক নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন – ২০২৬’এ বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিংবা প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

জোরপূর্বক গুমসহ ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি কমে এলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হাজার হাজার ব্যক্তিকে নির্বিচারে আটক করেছে এই সরকার।

অথচ বাংলাদেশের আইনে বিচার ছাড়া কাউকে ‘এক মুহূর্তও’ আটকে রাখা যায় না বলে বিবিসি বাংলাকে জানান আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

প্রয়োজন মনে হলে কাউকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রেও ২৪ ঘণ্টার বেশি হলে তাকে আদালতে পাঠাতে হবে।

“এমনিতে কাউকে আটক করার কোনো ক্ষমতা নাই তার বিরুদ্ধে মামলা না থাকলে বা আদালতের কোনো নির্দেশনা না থাকলে,” বলেন মি. মোরসেদ।

হাইকোর্টের সামনে সেনাসদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন

মব সন্ত্রাসে ভীত বিচারকরা, বলছেন আইনজ্ঞরা। ছবি প্রতীকী

বাংলাদেশের সংবিধানে আইন বহির্ভূতভাবে কাউকে আটকে রাখাকে স্পষ্টভাবে মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সংবিধানের ৩৩ ধারায় বলা আছে, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতারের কারণ না জানিয়ে আটক রাখা এবং তাকে তার আইনজীবীর সাথে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

গ্রেফতার কিংবা আটক ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে এবং ম্য্যাজস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া তাকে আটক রাখা যাবে না।

কিন্তু বিদেশি শত্রু এবং নিবর্তনমূলক আইনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না। তবে সেক্ষেত্রেও আবার এমন ব্যক্তিকে ছয় মাসের বেশি আটকে রাখতে হলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদমর্যাদার দুইজন এবং প্রবীণ সরকারি কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত পর্ষদের অনুমতি প্রয়োজন হবে।

এছাড়াও সংবিধানের ১০২ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী, আইনের বাইরে কিছু হলে সুপ্রিম কোর্ট নিজে অথবা কেউ যদি নিজে কোনো আবেদন নিয়ে আসে – উভয় ক্ষেত্রেই যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে কোনো ব্যক্তির মুক্তি নিশ্চিতের ক্ষমতা আদালতকে দেয়া হয়েছে।

গ্রেফতার হবার পর আইন অনুযায়ী ব্যক্তির জামিন পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু “সেটা অহরহ ভঙ্গ হচ্ছে, আগেও ভঙ্গ হয়েছে, এখন ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে”, বলছিলেন মি. মোরসেদ।

ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনে নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবিকভাবে তার বিপরীত দৃশ্যই সামনে আসছে। বরং পতিত আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ

দেদারসে চলছে মামলা বাণিজ্য

সংবিধান সমুন্নত রাখার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। ফলে সংবিধানে উল্লিখিত মানবাধিকার লঙ্ঘন হলেও ‘সুপ্রিম কোর্ট এবিষয়ে যথেষ্ট সক্রিয় নয়’ বলেই মনে করছেন আইনজীবীরা।

মামলা নিয়ে গেলে বিচারকদের তা শুনতে অনীহা প্রকাশ এবং “হাজার হাজার মামলা হলেও লিস্টে আসছে অল্প কিছু সংখ্যক, এ ব্যবস্থাটা করা হয়েছে – যার ফলে এই দায় বা দায়িত্ব যে বিচার বিভাগের ওপর দেওয়া হয়েছে, সেই বিচার বিভাগও এখানে ব্যর্থ হয়েছে এই মানুষগুলোর অধিকার রক্ষা করার জন্য”, বলছিলেন মনজিল মোরসেদ।

তার কারণ হিসেবে ‘মব’ আর সরকারের ভূমিকা – এই দুইটি বিষয়কেই সামনে আনছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।

তারা অভিযোগ করছেন, ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে।

একদিকে সরকার হস্তক্ষেপ করছে, অন্যদিকে “মব করে বিচারকদের ওপরে আক্রমণ করা হয়েছে। বিচারকদের অপসারণ করা হয়েছে”, বলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

একই কথা বলছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকও। “বিচারকদের যে এত বরখাস্ত করা হলো, বিচারকরদের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে”।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে ছোটো কোনো ঘটনাতেও যেমন আশেপাশের বিএনপির একশো-দুশো নেতা কর্মীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো “বর্তমান আমলে এসে সেটা আরও বেড়ে গেছে। কারণ পুলিশ অজ্ঞাতনামায় ফাঁসিয়ে দিয়ে বলবে এই মামলায় আপনার নাম ঢুকায় দেবো, আমাকে পয়সা দেন”।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক

আর এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল যে, একটি অপরাধের অভিযোগ করতে গিয়ে অনেক বেশি মানুষের নাম যখন মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই ‘এবসার্ড’ বা অর্থহীন কাজকে না থামানো।

শাহদীন মালিকের মতে, পুলিশের দায়িত্ব ছিল ‘প্রিলিমিনারি প্রবাবিলিটি যাচাই করা। “ওইটা পুলিশ করে নাই কারণ নাম বাদ দিয়ে দিলে তো তার ব্যবসা কমে যাবে”।

মামলা বাণিজ্যে ভুক্তভোগীদের হয়রানির কথা বলছিলেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনও।

তার মতে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারা আসলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করছে, জনগণের ওপর ভিত্তি করে না।

তার ওপর পাঁচই অগাস্টের পর যে মব সন্ত্রাস দেখা গেছে, যার ফলে কিছু মানুষ কাউকে বা কোনো দলকে আটক করে পুলিশের হাতে দিচ্ছে, “এবং পুলিশ তখন বাধ্য হচ্ছে মবের কাছে নতি শিকার করে মামলা নিতে বা তাদের আটক করতে”।

এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের যে ধরনের বার্তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে বলেও মনে করেন মি. লিটন।

তবে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের এসব অভিযোগের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বার্ষিক প্রতিবেদনে আরও যা আছে

বাংলাদেশের মানবাধিকারের নানা দিক নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন – ২০২৬’র তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটকের ধারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়াও নারী ও ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে আশঙ্কাজনক হারে রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরের গোষ্ঠীর মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৪ জন নিহতের খবর উঠে এসেছে।

‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানের আওতায় অন্তত আট হাজার ৬০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং মতপ্রকাশ দমনে অতীতে ব্যবহৃত দমনমূলক দুটি আইন—বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনেও আরও বহু মানুষ গ্রেপ্তার হয়ে থাকতে পারেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছরের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে ঘটা সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হন।

এরপর পুলিশ নির্বিচারে শত শত কথিত আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করে এবং আট হাজার ৪০০’র বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের করে, যাদের বেশিরভাগই অজ্ঞাতনামা।

যদিও সরকার এই ‘গণগ্রেফতার’-এর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অক্টোবরে প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের বরাত দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে নির্যাতনের ফলে ১৪ জনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন প্রায় আট হাজার মানুষ আর নিহত হয়েছেন ৮১ জন।

 

বিবিসি নিউজ বাংলা