১০:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর

মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মারাঠি ভাষা শেখার জন্য আরও এক বছর সময় দিয়েছে রাজ্য সরকার। স্থানীয় ভাষা জানা বাধ্যতামূলক করার নতুন নিয়ম ঘিরে চালকদের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এই সময় বাড়ানো হয়েছে।

আগামী এক বছর চালকদের মারাঠি ভাষায় কাজ চালানোর মতো জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এর মধ্যে যেসব চালক ভাষা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা আপাতত কমেছে।

যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভাষা শেখার উদ্যোগ

মহারাষ্ট্রের সরকারি ভাষা মারাঠি। গত ২০ আগস্ট থেকে পরিবহন কর্মকর্তারা ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মৌলিক মারাঠি কথোপকথনের সক্ষমতা যাচাই শুরু করেন।

সরকারের বক্তব্য, চালক ও যাত্রীদের মধ্যে সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং যাত্রাপথ আরও নিরাপদ করতেই এই নিয়ম চালু করা হয়েছে। তবে চালকদের সংগঠনগুলো এর বিরোধিতা করে জানায়, ভাষা শেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে পরীক্ষায় ব্যর্থতার কারণে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা হলে বহু মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

Mumbai: Action Against Auto And Taxi Drivers Who Don't Speak Marathi From  Today - What You Should Know

মহারাষ্ট্রে কর্মরত চালকদের বড় একটি অংশ অন্য রাজ্য থেকে আসা অভিবাসী। বিশেষ করে হিন্দিভাষী উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে বহু মানুষ কাজের সন্ধানে মহারাষ্ট্রে এসেছেন।

বিক্ষোভের পর সময় বাড়ল এক বছর

চালকদের প্রতিবাদের পর মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ গত সপ্তাহে ঘোষণা করেন, মারাঠি শেখার জন্য চালকদের আরও এক বছর সময় দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা অনেক চালকের জন্য ভাষা শেখায় বাড়তি সময় প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রাজ্যের পরিবহনমন্ত্রী প্রতাপ সরনায়েক জানিয়েছেন, এই এক বছরের মধ্যে চালকদের মারাঠি শেখার প্রত্যাশা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও সময় বাড়ানোর সুযোগও থাকবে।

মহারাষ্ট্রে বৈধ ট্যাক্সি ও অটোরিকশার অনুমতির সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৭৯ হাজার। এর প্রায় অর্ধেকই মুম্বাই মহানগর অঞ্চলে।

সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরেছে চালকদের মধ্যে। মুম্বাইয়ের ট্যাক্সিচালক লক্ষ্মণ পাণ্ডে বলেন, লাইসেন্স স্থগিত হলে দৈনিক আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন। এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন তারা।

ভাষা নিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্ক

তবে এই সিদ্ধান্ত মহারাষ্ট্রে ভাষা, অভিবাসন ও কর্মসংস্থান নিয়ে বহু পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশ আখোলকর মনে করেন, বিষয়টি শুধু চালক ও যাত্রীর যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মারাঠি পরিচয়, অভিবাসন এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

মহারাষ্ট্রের ভাষাভিত্তিক রাজনীতির ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৬০ সালে দীর্ঘ আন্দোলনের পর মারাঠিভাষী অঞ্চল নিয়ে মহারাষ্ট্র রাজ্য গঠিত হয়। এরপর মুম্বাই ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে শহরটিতে আসতে শুরু করেন।

Maha cabbies to get Marathi lessons before action: Govt - Rediff.com

এর ফলে স্থানীয় ভাষা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন ধীরে ধীরে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৬৬ সালে মারাঠি জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে শিবসেনা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের অন্যতম প্রধান বক্তব্য ছিল, বাইরের রাজ্য থেকে আসা মানুষের কারণে মারাঠিভাষীরা চাকরির সুযোগ হারাচ্ছেন। পরবর্তী সময়ে এই ভাষা ও স্থানীয় পরিচয়ের রাজনীতি মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।

বর্তমানে দেবেন্দ্র ফড়নবিশের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি ও শিবসেনার একটি অংশের জোট সরকার মহারাষ্ট্রে ক্ষমতায় রয়েছে। অন্যদিকে শিবসেনার প্রতিদ্বন্দ্বী অংশ এবং মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনাও মারাঠি ভাষা ও পরিচয়ের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরে।

‘ভাষা শেখা উচিত, তবে জীবিকা ঝুঁকিতে নয়’

প্রকাশ আখোলকর মনে করেন, কোনো রাজ্যে দীর্ঘদিন বসবাস করলে স্থানীয় ভাষার কিছুটা জ্ঞান অর্জন করা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তবে সাধারণ মানুষের ভাষা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় রাজনৈতিক দলগুলোর মতো তীব্র নয় বলেও তিনি মনে করেন।

মারাঠি ভাষা প্রচারের সঙ্গে যুক্ত মারাঠি অধ্যয়ন কেন্দ্রের সভাপতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দীপক পাওয়ার অবশ্য আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, যারা বছরের পর বছর মহারাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করছেন, তাদের অন্তত মৌলিক মারাঠি জানা উচিত।

তার ভাষায়, দীর্ঘদিন রাজ্যে বসবাসের পরও স্থানীয় ভাষা শেখার ব্যাপারে অনীহা দেখানো ‘ভাষাগত ঔদ্ধত্য’।

পড়া বা লেখা নয়, প্রয়োজন শুধু কাজ চালানোর মতো মারাঠি

সরকার অবশ্য বলছে, চালকদের মারাঠি পড়তে বা লিখতে জানতে হবে না। সাবলীলভাবে কথা বলার বাধ্যবাধকতাও নেই। মোটরযান সংক্রান্ত নিয়মে তাদের শুধু ভাষাটির ‘কাজ চালানোর মতো জ্ঞান’ অর্জন করতে হবে।

চালকদের সহায়তার জন্য সরকার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছে। এসব প্রশিক্ষণে যাত্রী কোথায় যেতে চান, ভাড়া নিয়ে কথা বলা, পথনির্দেশ দেওয়া—এ ধরনের দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজনীয় শব্দ ও বাক্য শেখানো হচ্ছে।

রাজ্যের পরিবহন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার চালক ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

চার দিনের প্রশিক্ষণে শেখানো হচ্ছে প্রয়োজনীয় বাক্য

৫৮ বছর বয়সী অটোরিকশাচালক মুনাওয়ার শেখও এমন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। মুম্বাইয়ের কাছের থানে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চার দিন ধরে তিনি অন্য চালকদের সঙ্গে মারাঠিতে ব্যবহৃত ১৬টি সাধারণ প্রশ্ন ও বাক্য শিখেছেন।

এর মধ্যে ছিল ‘আপনি কোথায় যেতে চান?’, ‘চিন্তা করবেন না’ এবং ‘মিটারের হিসাবে ভাড়া হবে’—এ ধরনের বাক্য।

প্রশিক্ষণ শেষে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। যারা উত্তীর্ণ হন, তাদের সনদ দেওয়া হয়, যা পরিবহন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় দেখানো যায়।

শেখের মতে, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাত্রীদের সঙ্গে সাধারণ কথাবার্তা চালানোর মতো মারাঠি তিনি শিখতে পেরেছেন।

Marathi to be mandatory for taxi and rickshaw drivers in Maharashtra from 1  May

ভাষা শেখার চেয়েও বড় সমস্যা সময়

তবে অনেক চালকের কাছে ভাষা শেখার ইচ্ছার চেয়ে বড় বাধা হলো সময় বের করা।

মুম্বাইয়ের ট্যাক্সিচালক অজয় সিং বলেন, তিনি মারাঠি শিখতে চান। কিন্তু সারাদিন গাড়ি চালানোর পর নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেওয়া তার পক্ষে কঠিন।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ি চালাতে হয়, কারণ একদিন কাজ বন্ধ রাখলেও সংসারে খাবারের সংকট তৈরি হতে পারে। কয়েক ঘণ্টা ক্লাস করার জন্য কাজ থেকে সময় বের করা তার মতো চালকের জন্য আর্থিকভাবে কঠিন।

সিংয়ের দৈনিক আয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার রুপি। কয়েক দিনের আয় কমে গেলেই বাড়িভাড়া ও সন্তানদের স্কুলের খরচ মেটাতে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই তিনি গাড়ি চালানোর সময় মারাঠি বেতার অনুষ্ঠান শোনেন এবং মারাঠিভাষী যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে ভাষাটি শেখার চেষ্টা করছেন।

‘আমরা এখানে থাকি, কাজ করি—মারাঠি শেখা উচিত’

অতিরিক্ত এক বছর সময় পাওয়ায় চালকদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। লক্ষ্মণ পাণ্ডের বক্তব্য, তারা কখনোই মারাঠি শেখার বিরোধিতা করেননি। তাদের আপত্তি ছিল পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার বিষয়ে।

তার কথায়, তারা মহারাষ্ট্রে থাকেন, এখানেই কাজ করেন। তাই মারাঠি শেখা অবশ্যই উচিত। তবে জীবিকা ঝুঁকিতে না ফেলে ভাষা শেখার জন্য প্রয়োজনীয় সময় তাদের দেওয়া উচিত।

মহারাষ্ট্র সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত তাই আপাতত ভাষা ও জীবিকার সংঘাতকে কিছুটা প্রশমিত করেছে। তবে স্থানীয় ভাষা, অভিবাসন ও কর্মসংস্থান নিয়ে রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্ক যে এখানেই শেষ হচ্ছে না, তা স্পষ্ট।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর

০২:১২:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মারাঠি ভাষা শেখার জন্য আরও এক বছর সময় দিয়েছে রাজ্য সরকার। স্থানীয় ভাষা জানা বাধ্যতামূলক করার নতুন নিয়ম ঘিরে চালকদের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এই সময় বাড়ানো হয়েছে।

আগামী এক বছর চালকদের মারাঠি ভাষায় কাজ চালানোর মতো জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এর মধ্যে যেসব চালক ভাষা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা আপাতত কমেছে।

যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভাষা শেখার উদ্যোগ

মহারাষ্ট্রের সরকারি ভাষা মারাঠি। গত ২০ আগস্ট থেকে পরিবহন কর্মকর্তারা ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মৌলিক মারাঠি কথোপকথনের সক্ষমতা যাচাই শুরু করেন।

সরকারের বক্তব্য, চালক ও যাত্রীদের মধ্যে সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং যাত্রাপথ আরও নিরাপদ করতেই এই নিয়ম চালু করা হয়েছে। তবে চালকদের সংগঠনগুলো এর বিরোধিতা করে জানায়, ভাষা শেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে পরীক্ষায় ব্যর্থতার কারণে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা হলে বহু মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

Mumbai: Action Against Auto And Taxi Drivers Who Don't Speak Marathi From  Today - What You Should Know

মহারাষ্ট্রে কর্মরত চালকদের বড় একটি অংশ অন্য রাজ্য থেকে আসা অভিবাসী। বিশেষ করে হিন্দিভাষী উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে বহু মানুষ কাজের সন্ধানে মহারাষ্ট্রে এসেছেন।

বিক্ষোভের পর সময় বাড়ল এক বছর

চালকদের প্রতিবাদের পর মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ গত সপ্তাহে ঘোষণা করেন, মারাঠি শেখার জন্য চালকদের আরও এক বছর সময় দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা অনেক চালকের জন্য ভাষা শেখায় বাড়তি সময় প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রাজ্যের পরিবহনমন্ত্রী প্রতাপ সরনায়েক জানিয়েছেন, এই এক বছরের মধ্যে চালকদের মারাঠি শেখার প্রত্যাশা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও সময় বাড়ানোর সুযোগও থাকবে।

মহারাষ্ট্রে বৈধ ট্যাক্সি ও অটোরিকশার অনুমতির সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৭৯ হাজার। এর প্রায় অর্ধেকই মুম্বাই মহানগর অঞ্চলে।

সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরেছে চালকদের মধ্যে। মুম্বাইয়ের ট্যাক্সিচালক লক্ষ্মণ পাণ্ডে বলেন, লাইসেন্স স্থগিত হলে দৈনিক আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন। এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন তারা।

ভাষা নিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্ক

তবে এই সিদ্ধান্ত মহারাষ্ট্রে ভাষা, অভিবাসন ও কর্মসংস্থান নিয়ে বহু পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশ আখোলকর মনে করেন, বিষয়টি শুধু চালক ও যাত্রীর যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মারাঠি পরিচয়, অভিবাসন এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

মহারাষ্ট্রের ভাষাভিত্তিক রাজনীতির ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৬০ সালে দীর্ঘ আন্দোলনের পর মারাঠিভাষী অঞ্চল নিয়ে মহারাষ্ট্র রাজ্য গঠিত হয়। এরপর মুম্বাই ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে শহরটিতে আসতে শুরু করেন।

Maha cabbies to get Marathi lessons before action: Govt - Rediff.com

এর ফলে স্থানীয় ভাষা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন ধীরে ধীরে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৬৬ সালে মারাঠি জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে শিবসেনা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের অন্যতম প্রধান বক্তব্য ছিল, বাইরের রাজ্য থেকে আসা মানুষের কারণে মারাঠিভাষীরা চাকরির সুযোগ হারাচ্ছেন। পরবর্তী সময়ে এই ভাষা ও স্থানীয় পরিচয়ের রাজনীতি মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।

বর্তমানে দেবেন্দ্র ফড়নবিশের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি ও শিবসেনার একটি অংশের জোট সরকার মহারাষ্ট্রে ক্ষমতায় রয়েছে। অন্যদিকে শিবসেনার প্রতিদ্বন্দ্বী অংশ এবং মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনাও মারাঠি ভাষা ও পরিচয়ের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরে।

‘ভাষা শেখা উচিত, তবে জীবিকা ঝুঁকিতে নয়’

প্রকাশ আখোলকর মনে করেন, কোনো রাজ্যে দীর্ঘদিন বসবাস করলে স্থানীয় ভাষার কিছুটা জ্ঞান অর্জন করা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তবে সাধারণ মানুষের ভাষা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় রাজনৈতিক দলগুলোর মতো তীব্র নয় বলেও তিনি মনে করেন।

মারাঠি ভাষা প্রচারের সঙ্গে যুক্ত মারাঠি অধ্যয়ন কেন্দ্রের সভাপতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দীপক পাওয়ার অবশ্য আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, যারা বছরের পর বছর মহারাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করছেন, তাদের অন্তত মৌলিক মারাঠি জানা উচিত।

তার ভাষায়, দীর্ঘদিন রাজ্যে বসবাসের পরও স্থানীয় ভাষা শেখার ব্যাপারে অনীহা দেখানো ‘ভাষাগত ঔদ্ধত্য’।

পড়া বা লেখা নয়, প্রয়োজন শুধু কাজ চালানোর মতো মারাঠি

সরকার অবশ্য বলছে, চালকদের মারাঠি পড়তে বা লিখতে জানতে হবে না। সাবলীলভাবে কথা বলার বাধ্যবাধকতাও নেই। মোটরযান সংক্রান্ত নিয়মে তাদের শুধু ভাষাটির ‘কাজ চালানোর মতো জ্ঞান’ অর্জন করতে হবে।

চালকদের সহায়তার জন্য সরকার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছে। এসব প্রশিক্ষণে যাত্রী কোথায় যেতে চান, ভাড়া নিয়ে কথা বলা, পথনির্দেশ দেওয়া—এ ধরনের দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজনীয় শব্দ ও বাক্য শেখানো হচ্ছে।

রাজ্যের পরিবহন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার চালক ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

চার দিনের প্রশিক্ষণে শেখানো হচ্ছে প্রয়োজনীয় বাক্য

৫৮ বছর বয়সী অটোরিকশাচালক মুনাওয়ার শেখও এমন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। মুম্বাইয়ের কাছের থানে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চার দিন ধরে তিনি অন্য চালকদের সঙ্গে মারাঠিতে ব্যবহৃত ১৬টি সাধারণ প্রশ্ন ও বাক্য শিখেছেন।

এর মধ্যে ছিল ‘আপনি কোথায় যেতে চান?’, ‘চিন্তা করবেন না’ এবং ‘মিটারের হিসাবে ভাড়া হবে’—এ ধরনের বাক্য।

প্রশিক্ষণ শেষে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। যারা উত্তীর্ণ হন, তাদের সনদ দেওয়া হয়, যা পরিবহন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় দেখানো যায়।

শেখের মতে, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাত্রীদের সঙ্গে সাধারণ কথাবার্তা চালানোর মতো মারাঠি তিনি শিখতে পেরেছেন।

Marathi to be mandatory for taxi and rickshaw drivers in Maharashtra from 1  May

ভাষা শেখার চেয়েও বড় সমস্যা সময়

তবে অনেক চালকের কাছে ভাষা শেখার ইচ্ছার চেয়ে বড় বাধা হলো সময় বের করা।

মুম্বাইয়ের ট্যাক্সিচালক অজয় সিং বলেন, তিনি মারাঠি শিখতে চান। কিন্তু সারাদিন গাড়ি চালানোর পর নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেওয়া তার পক্ষে কঠিন।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ি চালাতে হয়, কারণ একদিন কাজ বন্ধ রাখলেও সংসারে খাবারের সংকট তৈরি হতে পারে। কয়েক ঘণ্টা ক্লাস করার জন্য কাজ থেকে সময় বের করা তার মতো চালকের জন্য আর্থিকভাবে কঠিন।

সিংয়ের দৈনিক আয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার রুপি। কয়েক দিনের আয় কমে গেলেই বাড়িভাড়া ও সন্তানদের স্কুলের খরচ মেটাতে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই তিনি গাড়ি চালানোর সময় মারাঠি বেতার অনুষ্ঠান শোনেন এবং মারাঠিভাষী যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে ভাষাটি শেখার চেষ্টা করছেন।

‘আমরা এখানে থাকি, কাজ করি—মারাঠি শেখা উচিত’

অতিরিক্ত এক বছর সময় পাওয়ায় চালকদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। লক্ষ্মণ পাণ্ডের বক্তব্য, তারা কখনোই মারাঠি শেখার বিরোধিতা করেননি। তাদের আপত্তি ছিল পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার বিষয়ে।

তার কথায়, তারা মহারাষ্ট্রে থাকেন, এখানেই কাজ করেন। তাই মারাঠি শেখা অবশ্যই উচিত। তবে জীবিকা ঝুঁকিতে না ফেলে ভাষা শেখার জন্য প্রয়োজনীয় সময় তাদের দেওয়া উচিত।

মহারাষ্ট্র সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত তাই আপাতত ভাষা ও জীবিকার সংঘাতকে কিছুটা প্রশমিত করেছে। তবে স্থানীয় ভাষা, অভিবাসন ও কর্মসংস্থান নিয়ে রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্ক যে এখানেই শেষ হচ্ছে না, তা স্পষ্ট।