০৮:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করবে যুক্তরাজ্য সাইবার হামলায় উৎপাদন ব্যাহত, বার্ষিক লক্ষ্য হারাতে পারে বোস্টন সায়েন্টিফিক বড় এআই চিপ তৈরির সীমাবদ্ধতা কাটাতে নতুন প্রযুক্তি আনছে এএসএমএল ভারতের প্যাকেটজাত খাবারের প্রতি পাঁচ নমুনার একটিতে অনিয়ম এআই ও উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যে ভর করে চীনের রপ্তানি বেড়েছে ২৫ শতাংশ দুর্গাপূজার আগে সমান অধিকার ও নিরাপত্তার আশ্বাস সরকারের দেশের সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ১৮ মাসে হতাহত ৯২৮ মূল্যস্ফীতি কমে ৮.২৬ শতাংশ, মজুরি বৃদ্ধিকে এখনো ছাড়িয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় এলডিসি উত্তরণ পেছাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের শেষ কূটনৈতিক চেষ্টা জার্মানির ‘ফায়ারওয়াল’ ভাঙছে, ইউরোপের ডানপন্থার উত্থান থেকে ব্রিটেনের কী শিক্ষা?

শিকড়, পাসপোর্ট ও ফুটবল: বিশ্বকাপের নতুন জাতীয়তার গল্প

বিশ্বকাপকে আমরা সাধারণত জাতির প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি। একটি দেশের পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, সমর্থকদের আবেগ—সব মিলিয়ে এটি যেন জাতীয় পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চ। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই পরিচিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ মাঠে নামা অসংখ্য ফুটবলার জন্মেছেন এক দেশে, বেড়ে উঠেছেন অন্য দেশে, আর প্রতিনিধিত্ব করছেন তৃতীয় কোনো দেশকে। অনেকের কাছে এটি জাতীয় ফুটবলের ঐতিহ্যগত ধারণাকে জটিল করে তুলতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি আজকের বিশ্বেরই প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বায়নের যুগে মানুষ কেবল ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়। অভিবাসন, দ্বৈত নাগরিকত্ব, আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে কোটি কোটি মানুষের পরিচয় একাধিক দেশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে “জাতীয় দল” বলতে কাকে বোঝানো হবে, সেই প্রশ্নও আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। ফুটবলও সেই পরিবর্তন থেকে আলাদা নয়।

একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশের প্রতিনিধিত্বের নিয়ম ছিল অনেক কঠোর। অল্প বয়সে কোনো দেশের যুব দলে খেললেই একজন ফুটবলারের ভবিষ্যৎ কার্যত নির্ধারিত হয়ে যেত। পরবর্তীতে তিনি অন্য কোনো দেশের হয়ে খেলতে চাইলে সেটি সম্ভব হতো না। এই ব্যবস্থা কাগজে-কলমে জাতীয় দলের স্বচ্ছতা রক্ষা করলেও বাস্তবে বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে আটকে দিত। বিশেষ করে অভিবাসী পরিবার থেকে আসা তরুণদের জন্য এটি ছিল একটি বড় সীমাবদ্ধতা।

সমস্যাটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ইউরোপ ও আফ্রিকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে। উদাহরণ হিসেবে আলজেরিয়ার কথা বলা যায়। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা বহু আলজেরীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় ফরাসি ফুটবল ব্যবস্থার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা যদি ফ্রান্সের মূল দলে জায়গা না পেতেন, তবুও পরবর্তীতে আলজেরিয়ার হয়ে খেলার সুযোগ হারাতেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতো শুধু আলজেরিয়া নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যও।

গত দুই দশকে ফিফা ধীরে ধীরে এই বাস্তবতা স্বীকার করেছে। নিয়ম পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে খেলোয়াড়দের জাতীয় দল বদলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বহু দেশ তাদের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবল আরও বৈচিত্র্যময় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একজন মানুষের জাতীয় পরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হবে? জন্মস্থান কি একমাত্র মানদণ্ড? নাকি পরিবার, সংস্কৃতি, ভাষা ও আবেগের বন্ধনও সমান গুরুত্বপূর্ণ?

এই প্রশ্নের একটি আকর্ষণীয় উত্তর দিয়েছে কেপ ভার্দে। জনসংখ্যায় ছোট এই দ্বীপরাষ্ট্রের প্রবাসী সম্প্রদায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। দেশের ভেতরের জনসংখ্যার তুলনায় বিদেশে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ানদের সংখ্যা অনেক বেশি। তারা শুধু অর্থ পাঠায় না, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। বিশ্বকাপে দেশের সাফল্য উদ্‌যাপন করতে দেখা গেছে হাজার মাইল দূরে বসবাসকারী প্রবাসীদেরও। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশে জন্ম নেওয়া কোনো ফুটবলারকে “কম কেপ ভার্দিয়ান” বলা কতটা যৌক্তিক?

আসলে আধুনিক জাতীয়তার ধারণা ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রের সীমানা স্থির থাকলেও জাতীয় সম্প্রদায় অনেক সময় সীমান্ত অতিক্রম করে বিস্তৃত হয়। ফুটবল সেই বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তুলছে মাত্র।

এই পরিবর্তনের সুবিধা শুধু ছোট দেশগুলোই পাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও প্রবাসী ও বহুজাতিক পটভূমির খেলোয়াড়দের মাধ্যমে নিজেদের দলকে আরও শক্তিশালী করছে। একইভাবে ক্যারিবীয় অঞ্চল, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশ তাদের বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন শক্তি অর্জন করছে।

বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ করে ৪৮ দলে উন্নীত করার মধ্যেও এই দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে। আরও বেশি দেশের অংশগ্রহণ মানে শুধু বেশি ম্যাচ নয়; এর অর্থ হলো বিশ্বের আরও বৈচিত্র্যময় পরিচয়, ইতিহাস ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব। ফুটবলকে যদি সত্যিই বিশ্বের খেলা বলা হয়, তবে সেই বিশ্বকে তার বর্তমান রূপেই মেনে নিতে হবে।

তাই প্রবাসী খেলোয়াড়দের উপস্থিতিকে নিয়মের ফাঁক বা জাতীয় পরিচয়ের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি দেখায় যে আধুনিক পৃথিবীতে পরিচয় একক নয়, বহুস্তরীয়। বিশ্বকাপের মাঠে সেই বাস্তবতাই প্রতিফলিত হচ্ছে—যেখানে একজন ফুটবলারের পাসপোর্টের চেয়ে তার শিকড়, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের গল্প অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করবে যুক্তরাজ্য

শিকড়, পাসপোর্ট ও ফুটবল: বিশ্বকাপের নতুন জাতীয়তার গল্প

০৪:০২:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপকে আমরা সাধারণত জাতির প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি। একটি দেশের পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, সমর্থকদের আবেগ—সব মিলিয়ে এটি যেন জাতীয় পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চ। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই পরিচিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ মাঠে নামা অসংখ্য ফুটবলার জন্মেছেন এক দেশে, বেড়ে উঠেছেন অন্য দেশে, আর প্রতিনিধিত্ব করছেন তৃতীয় কোনো দেশকে। অনেকের কাছে এটি জাতীয় ফুটবলের ঐতিহ্যগত ধারণাকে জটিল করে তুলতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি আজকের বিশ্বেরই প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বায়নের যুগে মানুষ কেবল ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়। অভিবাসন, দ্বৈত নাগরিকত্ব, আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে কোটি কোটি মানুষের পরিচয় একাধিক দেশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে “জাতীয় দল” বলতে কাকে বোঝানো হবে, সেই প্রশ্নও আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। ফুটবলও সেই পরিবর্তন থেকে আলাদা নয়।

একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশের প্রতিনিধিত্বের নিয়ম ছিল অনেক কঠোর। অল্প বয়সে কোনো দেশের যুব দলে খেললেই একজন ফুটবলারের ভবিষ্যৎ কার্যত নির্ধারিত হয়ে যেত। পরবর্তীতে তিনি অন্য কোনো দেশের হয়ে খেলতে চাইলে সেটি সম্ভব হতো না। এই ব্যবস্থা কাগজে-কলমে জাতীয় দলের স্বচ্ছতা রক্ষা করলেও বাস্তবে বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে আটকে দিত। বিশেষ করে অভিবাসী পরিবার থেকে আসা তরুণদের জন্য এটি ছিল একটি বড় সীমাবদ্ধতা।

সমস্যাটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ইউরোপ ও আফ্রিকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে। উদাহরণ হিসেবে আলজেরিয়ার কথা বলা যায়। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা বহু আলজেরীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় ফরাসি ফুটবল ব্যবস্থার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা যদি ফ্রান্সের মূল দলে জায়গা না পেতেন, তবুও পরবর্তীতে আলজেরিয়ার হয়ে খেলার সুযোগ হারাতেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতো শুধু আলজেরিয়া নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যও।

গত দুই দশকে ফিফা ধীরে ধীরে এই বাস্তবতা স্বীকার করেছে। নিয়ম পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে খেলোয়াড়দের জাতীয় দল বদলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বহু দেশ তাদের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবল আরও বৈচিত্র্যময় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একজন মানুষের জাতীয় পরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হবে? জন্মস্থান কি একমাত্র মানদণ্ড? নাকি পরিবার, সংস্কৃতি, ভাষা ও আবেগের বন্ধনও সমান গুরুত্বপূর্ণ?

এই প্রশ্নের একটি আকর্ষণীয় উত্তর দিয়েছে কেপ ভার্দে। জনসংখ্যায় ছোট এই দ্বীপরাষ্ট্রের প্রবাসী সম্প্রদায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। দেশের ভেতরের জনসংখ্যার তুলনায় বিদেশে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ানদের সংখ্যা অনেক বেশি। তারা শুধু অর্থ পাঠায় না, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। বিশ্বকাপে দেশের সাফল্য উদ্‌যাপন করতে দেখা গেছে হাজার মাইল দূরে বসবাসকারী প্রবাসীদেরও। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশে জন্ম নেওয়া কোনো ফুটবলারকে “কম কেপ ভার্দিয়ান” বলা কতটা যৌক্তিক?

আসলে আধুনিক জাতীয়তার ধারণা ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রের সীমানা স্থির থাকলেও জাতীয় সম্প্রদায় অনেক সময় সীমান্ত অতিক্রম করে বিস্তৃত হয়। ফুটবল সেই বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তুলছে মাত্র।

এই পরিবর্তনের সুবিধা শুধু ছোট দেশগুলোই পাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও প্রবাসী ও বহুজাতিক পটভূমির খেলোয়াড়দের মাধ্যমে নিজেদের দলকে আরও শক্তিশালী করছে। একইভাবে ক্যারিবীয় অঞ্চল, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশ তাদের বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন শক্তি অর্জন করছে।

বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ করে ৪৮ দলে উন্নীত করার মধ্যেও এই দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে। আরও বেশি দেশের অংশগ্রহণ মানে শুধু বেশি ম্যাচ নয়; এর অর্থ হলো বিশ্বের আরও বৈচিত্র্যময় পরিচয়, ইতিহাস ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব। ফুটবলকে যদি সত্যিই বিশ্বের খেলা বলা হয়, তবে সেই বিশ্বকে তার বর্তমান রূপেই মেনে নিতে হবে।

তাই প্রবাসী খেলোয়াড়দের উপস্থিতিকে নিয়মের ফাঁক বা জাতীয় পরিচয়ের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি দেখায় যে আধুনিক পৃথিবীতে পরিচয় একক নয়, বহুস্তরীয়। বিশ্বকাপের মাঠে সেই বাস্তবতাই প্রতিফলিত হচ্ছে—যেখানে একজন ফুটবলারের পাসপোর্টের চেয়ে তার শিকড়, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের গল্প অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।