১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই ওয়েম্বলিতে অধিনায়ক ববি মুর যখন জুলে রিমে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন, তখন খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিলেন যে বিশ্বকাপ জয়ের জন্য ইংল্যান্ডকে আরও অন্তত ৬০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সেই অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তে এগিয়ে থেকেও লিওনেল মেসি-প্রেরিত আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙেছে টমাস টুখেলের দলের।
এই ছয় দশকে ফুটবল বদলেছে, ব্রিটেন বদলেছে, বদলেছে বিশ্বও। কিন্তু বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ভাগ্য যেন একই জায়গায় আটকে আছে।
নতুন মুখের দীর্ঘ তালিকা
১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ড জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছে ৪৫৪ জন ফুটবলারের। ১৯৬৭ সালে স্পেনের বিপক্ষে জন হলিন্স ছিলেন এই সময়ের প্রথম অভিষিক্ত খেলোয়াড়। সর্বশেষ অভিষেক হয়েছে লিভারপুলের তরুণ রিও এনগুমোহার, যিনি ২০২৬ সালের জুনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবার জাতীয় দলের জার্সি পরেন।
১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন ১৬১ জন ভিন্ন ফুটবলার। অথচ এত নতুন প্রজন্ম এসেও ১৯৬৬ সালের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে পারেনি কেউ।
এই সময়ের মধ্যে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৫ জন প্রধান কোচ। রন গ্রিনউড, ববি রবসন, গ্লেন হডল, সভেন-গোরান এরিকসন, ফাবিও ক্যাপেলো, গ্যারেথ সাউথগেট থেকে শুরু করে বর্তমান কোচ টমাস টুখেল—সবার লক্ষ্য ছিল একই, বিশ্বকাপের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানো।
অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাত্র সাতজন অধিনায়ক—ববি মুর, মিক মিলস, ব্রায়ান রবসন, অ্যালান শিয়ারার, ডেভিড বেকহ্যাম, স্টিভেন জেরার্ড ও হ্যারি কেইন।

বারবার ভেঙেছে স্বপ্ন
১৯৬৬ সালের পর অনুষ্ঠিত ১৫টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১২টিতে অংশ নিয়েছে ইংল্যান্ড। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো নাটকীয় পরিণতিতে শেষ হয়েছে তাদের অভিযান।
১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানের লিড হারানো, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’, ১৯৯০ সালের সেমিফাইনালে পল গ্যাসকোয়েনের অশ্রু, ১৯৯৮ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড, ২০০২ সালে রোনালদিনিয়োর বিখ্যাত ফ্রি-কিক, ২০১০ সালে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের বাতিল হওয়া গোল, ২০২২ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যারি কেইনের পেনাল্টি মিস এবং ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন—সবই ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসের বেদনাময় অধ্যায় হয়ে আছে।
বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ড আর জিততে পারেনি। ১৯৯০, ২০১৮ ও ২০২৬—তিনবারই শেষ চার থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।
চেনা প্রতিপক্ষ, চেনা হতাশা
বিশ্বকাপে জার্মানি (পশ্চিম জার্মানিসহ) এবং আর্জেন্টিনা—দুই দলই তিনবার করে ইংল্যান্ডকে বিদায় করেছে। পেনাল্টি শুটআউটও দীর্ঘদিন ইংল্যান্ডের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে থেকেছে।
১৯৯০ সালের সেমিফাইনালে ক্রিস ওয়াডল ও স্টুয়ার্ট পিয়ার্সের মিস, ১৯৯৮ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে টাইব্রেকারে হার—এসব হতাশা ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
এদিকে ১৯৬৬ সালের পর অনুষ্ঠিত ৩০টি বিশ্বকাপ ফাইনালের জায়গা দখল করেছে মাত্র আটটি দেশ। জার্মানি ও আর্জেন্টিনা ছয়বার করে, ব্রাজিল, ইতালি ও ফ্রান্স চারবার করে, নেদারল্যান্ডস তিনবার, স্পেন দুইবার এবং ক্রোয়েশিয়া একবার ফাইনালে উঠেছে। এই তালিকায় নেই ইংল্যান্ড।
অপেক্ষার সঙ্গে বদলেছে পৃথিবী
ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে ব্রিটেনে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্রে দায়িত্বে এসেছেন ১১ জন প্রেসিডেন্ট। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন রাজা তৃতীয় চার্লস। সাতজন অভিনেতা অভিনয় করেছেন জেমস বন্ড চরিত্রে এবং ১৫ বার বদলেছে ‘ডক্টর হু’-এর প্রধান চরিত্র।
এই সময়ের মধ্যে মানুষ চাঁদে হেঁটেছে, বার্লিন প্রাচীর ভেঙেছে, উদ্ভাবিত হয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব, চালু হয়েছে চ্যানেল টানেল এবং স্মার্টফোন বদলে দিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল টেলিভিশনে দেখেছিলেন প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ দর্শক, যা এখনও ব্রিটিশ সম্প্রচার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ দর্শকসংখ্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বপ্ন এখনও শেষ হয়নি
দীর্ঘ ব্যর্থতার মাঝেও ইংল্যান্ড বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করে চলেছে। ১৯৮৬ সালে গ্যারি লিনেকার গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। হ্যারি কেইন ২০১৮ সালে সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করেন এবং ২০২৬ বিশ্বকাপেও ছয় গোল করেন। একই আসরে ছয়টি গোল করেন জুড বেলিংহ্যামও।
তবু ৪৫৪ জন নতুন খেলোয়াড়, ১৫ জন কোচ, সাতজন বিশ্বকাপ অধিনায়ক এবং ১৬১ জন বিশ্বকাপ ফুটবলারের পরও ববি মুরই একমাত্র ইংল্যান্ড অধিনায়ক, যিনি বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলেছেন।
আরেকটি বিশ্বকাপ চক্র শুরু হতে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের সমর্থকদের বিশ্বাসও একই রকম অটুট—হয়তো পরবর্তী প্রজন্মই অবশেষে বিশ্বকাপের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাবে।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের অপেক্ষা, ৪৫৪ অভিষেক ও ১৫ কোচের পরও শিরোপা অধরাই। ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেমিফাইনালে বিদায় তাদের দীর্ঘ হতাশার গল্পে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















