০৮:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
প্রাণীর ওপর পরীক্ষা বন্ধে আমেরিকার দুই দল একজোট, কিন্তু মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নামছে কি বড় ঝুঁকি? মালয়েশিয়াকে ৮৯ রানে হারিয়ে বাংলাদেশের এইচপি দলের বড় জয় হাঙ্গুতে সেনা অভিযানে ক্যাপ্টেন শহীদ, নিহত ৭ ‘সন্ত্রাসী’ আশুলিয়ায় ছুটির মধ্যেই ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাই, কার্যাদেশ ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি পানিতে ডুবে, দর্শনার্থীদের ক্ষোভ: স্থায়ী নিষ্কাশন ব্যবস্থার দাবি নড়াইলে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় নষ্ট আউশ ধান, কৃষকের ক্ষতি কয়েক কোটি টাকা সাঘাটায় ছুরিকাঘাতে আহত জামায়াতকর্মীর ৪৮ দিন পর ঢাকার হাসপাতালে মৃত্যু দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন রিজভীর, ‘সরকারের অনুমতি ছাড়া আন্তর্জাতিক আয়োজন কীভাবে?’ সুদানের ভুলে যাওয়া যুদ্ধ: শান্তির জন্য এটাই কি শেষ সুযোগ? হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের চাপ, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে কঠিন সমঝোতার পথ

ভারতের বর্ষা বদলে যাচ্ছে—বৃষ্টি এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়

ভারতের বর্ষা একসময় ছিল প্রায় ঘড়ির কাঁটার মতো নির্ভরযোগ্য। জুনের শুরুতে বৃষ্টি নামত, কয়েক মাস ধরে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মোটামুটি নিয়মিত বৃষ্টিপাত হতো, আর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ধীরে ধীরে বর্ষা বিদায় নিত। কৃষক, ব্যবসায়ী, নগরবাসী—সবাই এই ছন্দের ওপর নিজেদের জীবন ও অর্থনীতির পরিকল্পনা করত। কিন্তু সেই পরিচিত ছন্দ এখন ভেঙে যাচ্ছে। ভারতের বর্ষা ক্রমেই হয়ে উঠছে অনিয়মিত, খামখেয়ালি এবং চরম বৈপরীত্যপূর্ণ।

প্রায় দেড়শ বছর ধরে ভারত বর্ষার বৃষ্টিপাতের তথ্য সংগ্রহ করছে। দীর্ঘ সময়ের সেই পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষার মৌসুমে মোট বৃষ্টির পরিমাণের চেয়ে এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে কখন, কোথায় এবং কীভাবে সেই বৃষ্টি নামছে

এক মাসের বৃষ্টি কয়েক দিনেই

মুম্বাইয়ের কথাই ধরা যাক। সাধারণত সেখানে জুনের ১০ তারিখের আশপাশে বর্ষা শুরু হয় এবং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বৃষ্টি কমতে থাকে। কিন্তু গত বছর মে মাস থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত গড়ায়।

এবার আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। জুনের শেষ দিক পর্যন্ত মুম্বাইয়ে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়নি। অথচ জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই এমন বৃষ্টি হলো, যা দেখে মনে হয়েছে পুরো জুলাই মাসের বৃষ্টি যেন কয়েক দিনের মধ্যেই নেমে এসেছে।

গুজরাটেও দেখা যাচ্ছে একই ধরনের অস্বাভাবিকতা। তুলনামূলক শুষ্ক এই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। তারপর আবার দীর্ঘ সময় ধরে দেখা দিচ্ছে শুষ্কতা।

দেশের অন্য প্রান্তে কৃষিনির্ভর বিহারে কৃষকেরা বরং বৃষ্টির অপেক্ষায় আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আরও পূর্বে আসামে চিত্র আরও ভয়াবহ। এ মৌসুমে সেখানে বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ হলেও ভয়াবহ বন্যায় কয়েক দিনেই ডুবে গেছে প্রায় ৯০০ গ্রাম। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮০ জন।

অর্থাৎ একই সময়ে ভারতের এক অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, অন্য অঞ্চলে অনাবৃষ্টি—বর্ষার এই বৈপরীত্যই এখন নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

কৃষকের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ

ভারতের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব কমেনি। দেশটির কর্মশক্তির প্রায় ৪৩ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বর্ষার অনিয়ম সরাসরি কোটি কোটি মানুষের জীবনে আঘাত হানতে পারে।

কৃষকরা সাধারণত বর্ষার আগমনের সময় বিবেচনা করে বীজ বোনেন। কিন্তু বৃষ্টি যদি সময়মতো না আসে, ফসলের ক্ষতি হয়। আবার বীজ বোনার পর হঠাৎ প্রবল বর্ষণ হলে জমি প্লাবিত হয়ে ফসল নষ্ট হতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টির পর দীর্ঘ শুষ্ক সময় আসে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর পরবর্তী দীর্ঘ বিরতিতে মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা থাকে না।

আগের মতো শুধু মোট বৃষ্টির পরিমাণ দেখে তাই পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। একই পরিমাণ বৃষ্টি যদি কয়েক মাসে ছড়িয়ে পড়ে, তার প্রভাব এক রকম। আর সেই বৃষ্টি যদি কয়েক দিনের মধ্যে নেমে আসে, তার প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শহরও নিরাপদ নয়

ভারতের দ্রুত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত এক দশকেই বহু শহর আরও ঘনবসতিপূর্ণ হয়েছে, বেড়েছে কংক্রিটের বিস্তার। ফলে অতিবৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে ঢোকার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

একটানা প্রবল বৃষ্টি হলে শহরের নালা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দ্রুত অচল হয়ে পড়তে পারে। সড়ক, রেলপথ, ঘরবাড়ি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যান চলাচল থেমে যায়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়।

কিন্তু সমস্যাটি শুধু বন্যা নয়। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে মাটিও শক্ত হয়ে যায়। মাটির পানি শোষণের ক্ষমতা কমে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার পুনরায় পূরণ হওয়ার সুযোগ কমে যায়। পরবর্তী সময়ে যখন প্রবল বৃষ্টি আসে, তখন সেই পানি মাটির গভীরে প্রবেশ না করে দ্রুত নদী-নালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে কিংবা বাষ্প হয়ে হারিয়ে যেতে পারে।

ফলে একই বর্ষা একদিকে বন্যা সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের পানিসংকটও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ছাপ

ভারতের বর্ষার এই অস্বাভাবিকতার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ভূমিকা রয়েছে।

বর্ষার মৌলিক প্রক্রিয়া এখনও একই। এপ্রিল ও মে মাসে ভারতের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়। সেই উত্তপ্ত স্থলভাগ ভারত মহাসাগর থেকে ঠান্ডা ও আর্দ্র বাতাস টেনে আনে। এই বাতাসই বর্ষার মূল শক্তি।

কিন্তু পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রও দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। স্থলভাগ একই হারে উষ্ণ না হওয়ায় স্থল ও সমুদ্রের বায়ুচাপের পার্থক্য আগের তুলনায় কিছুটা দুর্বল হচ্ছে। এর ফলে বর্ষার বাতাস কিছুটা দুর্বল হতে পারে।

অন্যদিকে উষ্ণ বাতাস বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে যখন বৃষ্টি হয়, তখন তা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের বর্ষায় একটি অদ্ভুত দ্বৈততা দেখা দিতে পারে—বৃষ্টি আসবে অনিয়মিতভাবে, কিন্তু যখন আসবে তখন আরও প্রবল হয়ে নামতে পারে।

পূর্বাভাসের গুরুত্ব বাড়ছে

ভারতের আবহাওয়া দপ্তর অবশ্য এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। দেশটির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গত কয়েক দশকে যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে। আরও উন্নত পূর্বাভাস তৈরির জন্য নতুন মডেল ও প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

এ বছরের বর্ষার আগে পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, মৌসুমি বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের প্রায় ৯২ শতাংশ হতে পারে। একসময় এমন পূর্বাভাস কৃষি ও খাদ্যের দামের জন্য বড় সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হতো।

কিন্তু এখন দেশের কৃষিজমির অর্ধেকেরও বেশি কোনো না কোনো ধরনের সেচের আওতায় রয়েছে। ফলে মোট বৃষ্টির পরিমাণ কয়েক শতাংশ কম বা বেশি হওয়াই সবকিছু নির্ধারণ করে না। আসল প্রশ্ন হলো—বৃষ্টির পানি কোথায় এবং কখন পাওয়া যাচ্ছে।

কেন্দ্রের পাশাপাশি স্থানীয় প্রস্তুতিও জরুরি

ভারত সরকার ইতোমধ্যে কম সেচসুবিধা থাকা ১১১টি জেলাকে সম্ভাব্য বৃষ্টিঘাটতির ঝুঁকিতে চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকায় স্থানীয়ভাবে পানি সংরক্ষণ বাড়ানো, পশুখাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং তুলনামূলক প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে পারে এমন ফসলের চাষ উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে ভারতের মতো বিশাল দেশে সব সমস্যার সমাধান কেন্দ্রীয়ভাবে করা সম্ভব নয়।

একটি রাজ্যে যখন বন্যা, অন্য রাজ্যে তখন খরা—এই বাস্তবতায় রাজ্য সরকার, শহর প্রশাসন এমনকি স্থানীয় গ্রামগুলোকেও নিজেদের মতো করে প্রস্তুত হতে হবে।

হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, উন্নত সেচব্যবস্থা, শক্তিশালী পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত জলাধার ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

কারণ আগামী দিনের ভারতের জন্য শুধু বেশি বৃষ্টি নয়, বৃষ্টির চরম অনিয়মই হতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্ষার নতুন স্বভাব

ভারতের মানুষ বহু শতাব্দী ধরে বর্ষার ওপর নির্ভর করে এসেছে। কৃষি, বাণিজ্য, নদীপথ—দেশটির সভ্যতা ও অর্থনীতির বহু অধ্যায় এই মৌসুমি বৃষ্টির ছন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

কিন্তু সেই ছন্দ এখন বদলাচ্ছে।

কোথাও দীর্ঘ খরা, তারপর হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি। কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি, আবার অল্প দূরেই ভয়াবহ বন্যা। কোথাও কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টি কয়েক দিনের মধ্যে নেমে আসছে।

তাই ভারতের জন্য আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো আর “এ বছর কত বৃষ্টি হবে?” নয়। বরং প্রশ্নটি হবে—বৃষ্টি কখন আসবে, কোথায় আসবে এবং কতটা তীব্র হয়ে আসবে?

মৃত্যু ও করের মতো বর্ষাকেও একসময় জীবনের নিশ্চিত বাস্তবতা মনে করা হতো। এখন সেই তালিকায় আরেকটি বিষয় যোগ করতে হচ্ছে—বর্ষার চরম অনিশ্চয়তা।

ভারতের ভবিষ্যৎ কৃষি, শহর ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

ভারতের বর্ষা আর শুধু বর্ষা নয়—এটি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন ও অনিশ্চিত মুখ।

ভারতের বর্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে নতুন বাস্তবতা—যেখানে বৃষ্টির মোট পরিমাণের চেয়ে তার সময় ও তীব্রতাই হয়ে উঠছে বড় সংকেত।

ভারতের বর্ষা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও অনিয়মিত হয়ে উঠছে; অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা কৃষি ও শহরজীবনে বাড়াচ্ছে ঝুঁকি।

ভারতের বর্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, কৃষি, আবহাওয়া, ভারত, মৌসুমি বৃষ্টি, পানি সংকট

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রাণীর ওপর পরীক্ষা বন্ধে আমেরিকার দুই দল একজোট, কিন্তু মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নামছে কি বড় ঝুঁকি?

ভারতের বর্ষা বদলে যাচ্ছে—বৃষ্টি এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়

০৬:৫১:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

ভারতের বর্ষা একসময় ছিল প্রায় ঘড়ির কাঁটার মতো নির্ভরযোগ্য। জুনের শুরুতে বৃষ্টি নামত, কয়েক মাস ধরে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মোটামুটি নিয়মিত বৃষ্টিপাত হতো, আর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ধীরে ধীরে বর্ষা বিদায় নিত। কৃষক, ব্যবসায়ী, নগরবাসী—সবাই এই ছন্দের ওপর নিজেদের জীবন ও অর্থনীতির পরিকল্পনা করত। কিন্তু সেই পরিচিত ছন্দ এখন ভেঙে যাচ্ছে। ভারতের বর্ষা ক্রমেই হয়ে উঠছে অনিয়মিত, খামখেয়ালি এবং চরম বৈপরীত্যপূর্ণ।

প্রায় দেড়শ বছর ধরে ভারত বর্ষার বৃষ্টিপাতের তথ্য সংগ্রহ করছে। দীর্ঘ সময়ের সেই পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষার মৌসুমে মোট বৃষ্টির পরিমাণের চেয়ে এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে কখন, কোথায় এবং কীভাবে সেই বৃষ্টি নামছে

এক মাসের বৃষ্টি কয়েক দিনেই

মুম্বাইয়ের কথাই ধরা যাক। সাধারণত সেখানে জুনের ১০ তারিখের আশপাশে বর্ষা শুরু হয় এবং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বৃষ্টি কমতে থাকে। কিন্তু গত বছর মে মাস থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত গড়ায়।

এবার আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। জুনের শেষ দিক পর্যন্ত মুম্বাইয়ে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়নি। অথচ জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই এমন বৃষ্টি হলো, যা দেখে মনে হয়েছে পুরো জুলাই মাসের বৃষ্টি যেন কয়েক দিনের মধ্যেই নেমে এসেছে।

গুজরাটেও দেখা যাচ্ছে একই ধরনের অস্বাভাবিকতা। তুলনামূলক শুষ্ক এই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। তারপর আবার দীর্ঘ সময় ধরে দেখা দিচ্ছে শুষ্কতা।

দেশের অন্য প্রান্তে কৃষিনির্ভর বিহারে কৃষকেরা বরং বৃষ্টির অপেক্ষায় আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আরও পূর্বে আসামে চিত্র আরও ভয়াবহ। এ মৌসুমে সেখানে বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ হলেও ভয়াবহ বন্যায় কয়েক দিনেই ডুবে গেছে প্রায় ৯০০ গ্রাম। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮০ জন।

অর্থাৎ একই সময়ে ভারতের এক অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, অন্য অঞ্চলে অনাবৃষ্টি—বর্ষার এই বৈপরীত্যই এখন নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

কৃষকের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ

ভারতের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব কমেনি। দেশটির কর্মশক্তির প্রায় ৪৩ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বর্ষার অনিয়ম সরাসরি কোটি কোটি মানুষের জীবনে আঘাত হানতে পারে।

কৃষকরা সাধারণত বর্ষার আগমনের সময় বিবেচনা করে বীজ বোনেন। কিন্তু বৃষ্টি যদি সময়মতো না আসে, ফসলের ক্ষতি হয়। আবার বীজ বোনার পর হঠাৎ প্রবল বর্ষণ হলে জমি প্লাবিত হয়ে ফসল নষ্ট হতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টির পর দীর্ঘ শুষ্ক সময় আসে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর পরবর্তী দীর্ঘ বিরতিতে মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা থাকে না।

আগের মতো শুধু মোট বৃষ্টির পরিমাণ দেখে তাই পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। একই পরিমাণ বৃষ্টি যদি কয়েক মাসে ছড়িয়ে পড়ে, তার প্রভাব এক রকম। আর সেই বৃষ্টি যদি কয়েক দিনের মধ্যে নেমে আসে, তার প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শহরও নিরাপদ নয়

ভারতের দ্রুত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত এক দশকেই বহু শহর আরও ঘনবসতিপূর্ণ হয়েছে, বেড়েছে কংক্রিটের বিস্তার। ফলে অতিবৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে ঢোকার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

একটানা প্রবল বৃষ্টি হলে শহরের নালা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দ্রুত অচল হয়ে পড়তে পারে। সড়ক, রেলপথ, ঘরবাড়ি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যান চলাচল থেমে যায়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়।

কিন্তু সমস্যাটি শুধু বন্যা নয়। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে মাটিও শক্ত হয়ে যায়। মাটির পানি শোষণের ক্ষমতা কমে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার পুনরায় পূরণ হওয়ার সুযোগ কমে যায়। পরবর্তী সময়ে যখন প্রবল বৃষ্টি আসে, তখন সেই পানি মাটির গভীরে প্রবেশ না করে দ্রুত নদী-নালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে কিংবা বাষ্প হয়ে হারিয়ে যেতে পারে।

ফলে একই বর্ষা একদিকে বন্যা সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের পানিসংকটও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ছাপ

ভারতের বর্ষার এই অস্বাভাবিকতার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ভূমিকা রয়েছে।

বর্ষার মৌলিক প্রক্রিয়া এখনও একই। এপ্রিল ও মে মাসে ভারতের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়। সেই উত্তপ্ত স্থলভাগ ভারত মহাসাগর থেকে ঠান্ডা ও আর্দ্র বাতাস টেনে আনে। এই বাতাসই বর্ষার মূল শক্তি।

কিন্তু পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রও দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। স্থলভাগ একই হারে উষ্ণ না হওয়ায় স্থল ও সমুদ্রের বায়ুচাপের পার্থক্য আগের তুলনায় কিছুটা দুর্বল হচ্ছে। এর ফলে বর্ষার বাতাস কিছুটা দুর্বল হতে পারে।

অন্যদিকে উষ্ণ বাতাস বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে যখন বৃষ্টি হয়, তখন তা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের বর্ষায় একটি অদ্ভুত দ্বৈততা দেখা দিতে পারে—বৃষ্টি আসবে অনিয়মিতভাবে, কিন্তু যখন আসবে তখন আরও প্রবল হয়ে নামতে পারে।

পূর্বাভাসের গুরুত্ব বাড়ছে

ভারতের আবহাওয়া দপ্তর অবশ্য এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। দেশটির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গত কয়েক দশকে যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে। আরও উন্নত পূর্বাভাস তৈরির জন্য নতুন মডেল ও প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

এ বছরের বর্ষার আগে পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, মৌসুমি বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের প্রায় ৯২ শতাংশ হতে পারে। একসময় এমন পূর্বাভাস কৃষি ও খাদ্যের দামের জন্য বড় সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হতো।

কিন্তু এখন দেশের কৃষিজমির অর্ধেকেরও বেশি কোনো না কোনো ধরনের সেচের আওতায় রয়েছে। ফলে মোট বৃষ্টির পরিমাণ কয়েক শতাংশ কম বা বেশি হওয়াই সবকিছু নির্ধারণ করে না। আসল প্রশ্ন হলো—বৃষ্টির পানি কোথায় এবং কখন পাওয়া যাচ্ছে।

কেন্দ্রের পাশাপাশি স্থানীয় প্রস্তুতিও জরুরি

ভারত সরকার ইতোমধ্যে কম সেচসুবিধা থাকা ১১১টি জেলাকে সম্ভাব্য বৃষ্টিঘাটতির ঝুঁকিতে চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকায় স্থানীয়ভাবে পানি সংরক্ষণ বাড়ানো, পশুখাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং তুলনামূলক প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে পারে এমন ফসলের চাষ উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে ভারতের মতো বিশাল দেশে সব সমস্যার সমাধান কেন্দ্রীয়ভাবে করা সম্ভব নয়।

একটি রাজ্যে যখন বন্যা, অন্য রাজ্যে তখন খরা—এই বাস্তবতায় রাজ্য সরকার, শহর প্রশাসন এমনকি স্থানীয় গ্রামগুলোকেও নিজেদের মতো করে প্রস্তুত হতে হবে।

হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, উন্নত সেচব্যবস্থা, শক্তিশালী পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত জলাধার ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

কারণ আগামী দিনের ভারতের জন্য শুধু বেশি বৃষ্টি নয়, বৃষ্টির চরম অনিয়মই হতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্ষার নতুন স্বভাব

ভারতের মানুষ বহু শতাব্দী ধরে বর্ষার ওপর নির্ভর করে এসেছে। কৃষি, বাণিজ্য, নদীপথ—দেশটির সভ্যতা ও অর্থনীতির বহু অধ্যায় এই মৌসুমি বৃষ্টির ছন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

কিন্তু সেই ছন্দ এখন বদলাচ্ছে।

কোথাও দীর্ঘ খরা, তারপর হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি। কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি, আবার অল্প দূরেই ভয়াবহ বন্যা। কোথাও কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টি কয়েক দিনের মধ্যে নেমে আসছে।

তাই ভারতের জন্য আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো আর “এ বছর কত বৃষ্টি হবে?” নয়। বরং প্রশ্নটি হবে—বৃষ্টি কখন আসবে, কোথায় আসবে এবং কতটা তীব্র হয়ে আসবে?

মৃত্যু ও করের মতো বর্ষাকেও একসময় জীবনের নিশ্চিত বাস্তবতা মনে করা হতো। এখন সেই তালিকায় আরেকটি বিষয় যোগ করতে হচ্ছে—বর্ষার চরম অনিশ্চয়তা।

ভারতের ভবিষ্যৎ কৃষি, শহর ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

ভারতের বর্ষা আর শুধু বর্ষা নয়—এটি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন ও অনিশ্চিত মুখ।

ভারতের বর্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে নতুন বাস্তবতা—যেখানে বৃষ্টির মোট পরিমাণের চেয়ে তার সময় ও তীব্রতাই হয়ে উঠছে বড় সংকেত।

ভারতের বর্ষা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও অনিয়মিত হয়ে উঠছে; অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা কৃষি ও শহরজীবনে বাড়াচ্ছে ঝুঁকি।

ভারতের বর্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, কৃষি, আবহাওয়া, ভারত, মৌসুমি বৃষ্টি, পানি সংকট