১০:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য আশ্রয়ও চট্টগ্রামে আগুন নেভাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বিএনপির সাবেক নেতা নিহত ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্টে বড় পরিবর্তন, একসঙ্গে ১৫ দিনের স্লট রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত, ২০ আগস্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি পৃথিবীর বাইরে জীবনের খোঁজে নতুন আশার আলো, বায়ুমণ্ডলসহ সম্ভাবনাময় গ্রহের সন্ধান ইউক্রেনের যুদ্ধের মানবিক চিত্র বদলে দিচ্ছে মার্কিন ধর্মপ্রচারকদের মনোভাব পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী কিছুই ঘটবে না—এই বাজি কি ফেডের জন্য বিপজ্জনক? ৪৩ বছর বয়সেও ‘চিরকিশোর’ রাজনীতিক! জ্যাক পোলানস্কিকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক হরমুজ ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়তেই বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে বিনিয়োগের হিড়িক

শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য আশ্রয়ও

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কাজ কী? প্রচলিত উত্তর হবে—শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, পরীক্ষা নেওয়া, গবেষণা করা এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক দিকনির্দেশনা দেওয়া। কিন্তু বাস্তব বিশ্ববিদ্যালয়জীবন এই সংজ্ঞার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষককে প্রায়ই একই সঙ্গে প্রশাসক, পরামর্শদাতা, অভিভাবক, অনুবাদক, মধ্যস্থতাকারী, অভিযোগ শোনার ব্যক্তি এবং কখনো কখনো সংকট মোকাবিলাকারীর ভূমিকাও পালন করতে হয়।

সমস্যা হলো, এই অতিরিক্ত কাজগুলোর বড় অংশই আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের তালিকায় থাকে না। অথচ শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন স্বাভাবিক রাখতে এগুলোর গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়।

শিক্ষকের ওপর বাড়তে থাকা প্রশাসনিক চাপ

মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাননিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতি প্রক্রিয়া নিজেই বড় ধরনের প্রশাসনিক শ্রম দাবি করে। মালয়েশিয়ান কোয়ালিটি এজেন্সির (এমকিউএ) নথিপত্র, পর্যালোচনা, সভা এবং স্বীকৃতি-সংক্রান্ত কাজ সামলাতে অনেক ক্ষেত্রে বিপুল সময় ও জনবল প্রয়োজন হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসবের জন্য আলাদা বিশেষায়িত দল থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানের চিত্র এক নয়।

অনেক জায়গায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদেরই এই অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়। একই ধরনের বৈষম্য দেখা যায় একাডেমিক ও বিপণন বিভাগের কাজেও। শিক্ষকদের শিক্ষার্থী ভর্তি প্রচারে অংশ নিতে দেখা যায়, কিন্তু বিপণন বিভাগের কর্মীদের একাডেমিক দায়িত্ব সামলাতে দেখা যায় না।

ফলে শিক্ষকতা ক্রমেই এমন এক পেশায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে পড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বহু অদৃশ্য কাজও শিক্ষকের কাঁধে এসে পড়ে।

Education in Malaysia

বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকই প্রথম ভরসা

মালয়েশিয়া সাশ্রয়ী ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করছে। চীন, ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নতুন স্বপ্ন নিয়ে দেশটিতে পা রাখেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর তাদের সামনে যে বাস্তবতা দাঁড়ায়, তা সব সময় সহজ নয়।

ভাষাগত সমস্যা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, পরিবার থেকে দূরে থাকার মানসিক চাপ, অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতা, বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাযথভাবে অভ্যর্থনা ও দিকনির্দেশনার ঘাটতি এবং কোর্স নির্বাচনের জটিলতা—সব মিলিয়ে একজন নতুন শিক্ষার্থী সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন।

প্রতিটি নতুন সেমিস্টারে শিক্ষকদের কাছে এমন অসংখ্য প্রশ্ন আসে। নির্বাচিত কোর্স এখনো অনুমোদিত হয়নি কেন? এতে উপস্থিতির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি? অ্যাসাইনমেন্ট কীভাবে জমা দিতে হবে? ছুটি কবে শুরু হবে? নিজ দেশের কর্তৃপক্ষকে দেখানোর জন্য পড়াশোনার সনদ পাওয়া যাবে কি?

কেউ কেউ আবার দেরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান। তখন তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে শিক্ষককে কখনো অনুবাদ-প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হয়, কখনো এমন আশ্বাস দিতে হয় যার নিশ্চয়তা আসলে তার নিজের হাতেও নেই।

এখানে শিক্ষক আর কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি হয়ে ওঠেন একটি নতুন দেশের শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থার অনানুষ্ঠানিক পথপ্রদর্শক।

যে যত্ন শিক্ষার অংশ, কিন্তু স্বীকৃতি কম

শিক্ষকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে কম দৃশ্যমান ভূমিকা সম্ভবত যত্ন নেওয়ার জায়গাটি।

বহু বছর আগে এক ঝড়ের রাতে ক্লাস শেষে আটকে পড়া একজন শিক্ষার্থীকে একজন শিক্ষক নিজের গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। আরেক শিক্ষক রাত জেগে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীকে অন্তত খাবার খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। এসব কাজ কোনো পাঠ্যক্রমের অংশ নয়, কিন্তু শিক্ষার্থীর কাছে এগুলোর প্রভাব গভীর হতে পারে।

দার্শনিক ও নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্রেইবার সমাজে যত্ননির্ভর কাজের অবমূল্যায়নের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর যুক্তির কেন্দ্রে ছিল—মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও যত্ন কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটায় না, বরং মানুষকে মানুষ হিসেবেও ধরে রাখে।

Why is diversity important in college? 5 reasons - Wellfleet Student

বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক কখনো হয়ে ওঠেন পরিবারের বড় ভাই বা বোনের মতো, কখনো অভিভাবকের বিকল্প, কখনো সাংস্কৃতিক অনুবাদক। এমনকি শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত ভুল বা সমস্যার কথাও শিক্ষকের কাছে খুলে বলেন।

একজন শিক্ষক জানিয়েছেন, তাঁর এক সহকর্মী বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে খাবার ভাগাভাগির আয়োজন করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল তাদের নিজেদের সংস্কৃতি ও গল্প একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং একাকিত্ব কমানো। চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বের মধ্যে এ কাজ নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীর মনে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে এর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

নীরব ত্যাগের মূল্য কতটা?

এই যত্নের কাজ সহজ নয়। একজন শিক্ষককে একই সময়ে বড় ক্লাস নিতে হয়, গবেষণার সময়সীমা মেনে চলতে হয়, প্রশাসনিক কাগজপত্র শেষ করতে হয় এবং প্রতিষ্ঠানের নানা দায়িত্ব সামলাতে হয়। এর মধ্যেও কোনো একজন সমস্যাগ্রস্ত শিক্ষার্থীকে সময় দিতে হয়।

অনেক ক্ষেত্রেই এই সহায়তা আসে কর্মঘণ্টার বাইরে। রাতের ফোন, অতিরিক্ত পরামর্শ, ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শোনা কিংবা কোনো জটিল প্রশাসনিক বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া—এসবের বিনিময়ে কোনো পদক নেই, আলাদা স্বীকৃতিও নেই।

কিন্তু একজন শিক্ষকের ধৈর্য কখনো কখনো একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। বাড়ির জন্য মন খারাপ করা একজন শিক্ষার্থী হয়তো সেই সহায়তার কারণেই পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

শিক্ষক কেন প্রায়ই ‘দোষী’ হয়ে যান

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। বিশ্ববিদ্যালয় যখন শিক্ষার্থীকে এক ধরনের ‘গ্রাহক’ হিসেবে বিবেচনা করে, তখন কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই তার ভাবমূর্তি ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে রক্ষা করতে চায়।

কিন্তু কোনো ঘটনায় শিক্ষার্থী বা শীর্ষ কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা সম্ভব না হলে দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়ে?

অনেক সময় সেই শিক্ষকই সামনে চলে আসেন, যিনি আসলে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করছিলেন। তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানের অসন্তোষের সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য। অর্থাৎ শিক্ষক শুধু সংকট সামলান না, কখনো কখনো সেই সংকটের দায়ও নিজের ওপর নিতে বাধ্য হন।

Invisible career paths leave millions of US teachers stuck, classrooms  suffer - The Times of India

শিক্ষার নেপথ্যের আসল শক্তি

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু শ্রেণিকক্ষ, সিলেবাস, পরীক্ষা ও ডিগ্রির সমষ্টি হিসেবে দেখলে শিক্ষকের প্রকৃত ভূমিকার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়।

বিশেষ করে যে দেশ উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক শিল্প হিসেবে এগিয়ে নিতে চায়, সেখানে শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল জ্ঞান বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদেশ থেকে আসা একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা নির্ধারিত হয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানুষগুলোর আচরণেও।

সেই জায়গায় শিক্ষকরা প্রায়ই প্রতিষ্ঠানের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ান। তারা শিক্ষার্থীর উদ্বেগ শোনেন, পথ দেখান, ভুল বোঝাবুঝি মেটান, প্রয়োজন হলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং কখনো শুধু একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ান।

সমাজে যত্নের কাজের মূল্যায়ন কম হতে পারে। কিন্তু শিক্ষা যদি মানুষের জীবন বদলানোর প্রক্রিয়া হয়, তাহলে সেই পরিবর্তনের ভিত্তিতে যত্ন, সহযোগিতা ও আস্থার জায়গাগুলোকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

একজন ভালো শিক্ষক হয়তো শিক্ষার্থীর জীবনে কোনো বড় বক্তৃতার কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না। বরং হয়তো মনে থাকবে সেই বৃষ্টির রাত, সেই ফোনকল, সেই একটি আশ্বাস কিংবা কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মুহূর্তটি।

শ্রেণিকক্ষের সামনে শিক্ষক যে জ্ঞান দেন, তা শিক্ষার দৃশ্যমান অংশ। আর শ্রেণিকক্ষের বাইরে যে অদৃশ্য সহায়তা তিনি দেন, সেটিই অনেক সময় শিক্ষার্থীকে সেই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করার শক্তি জোগায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য আশ্রয়ও

শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য আশ্রয়ও

১০:০০:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কাজ কী? প্রচলিত উত্তর হবে—শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, পরীক্ষা নেওয়া, গবেষণা করা এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক দিকনির্দেশনা দেওয়া। কিন্তু বাস্তব বিশ্ববিদ্যালয়জীবন এই সংজ্ঞার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষককে প্রায়ই একই সঙ্গে প্রশাসক, পরামর্শদাতা, অভিভাবক, অনুবাদক, মধ্যস্থতাকারী, অভিযোগ শোনার ব্যক্তি এবং কখনো কখনো সংকট মোকাবিলাকারীর ভূমিকাও পালন করতে হয়।

সমস্যা হলো, এই অতিরিক্ত কাজগুলোর বড় অংশই আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের তালিকায় থাকে না। অথচ শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন স্বাভাবিক রাখতে এগুলোর গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়।

শিক্ষকের ওপর বাড়তে থাকা প্রশাসনিক চাপ

মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাননিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতি প্রক্রিয়া নিজেই বড় ধরনের প্রশাসনিক শ্রম দাবি করে। মালয়েশিয়ান কোয়ালিটি এজেন্সির (এমকিউএ) নথিপত্র, পর্যালোচনা, সভা এবং স্বীকৃতি-সংক্রান্ত কাজ সামলাতে অনেক ক্ষেত্রে বিপুল সময় ও জনবল প্রয়োজন হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসবের জন্য আলাদা বিশেষায়িত দল থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানের চিত্র এক নয়।

অনেক জায়গায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদেরই এই অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়। একই ধরনের বৈষম্য দেখা যায় একাডেমিক ও বিপণন বিভাগের কাজেও। শিক্ষকদের শিক্ষার্থী ভর্তি প্রচারে অংশ নিতে দেখা যায়, কিন্তু বিপণন বিভাগের কর্মীদের একাডেমিক দায়িত্ব সামলাতে দেখা যায় না।

ফলে শিক্ষকতা ক্রমেই এমন এক পেশায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে পড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বহু অদৃশ্য কাজও শিক্ষকের কাঁধে এসে পড়ে।

Education in Malaysia

বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকই প্রথম ভরসা

মালয়েশিয়া সাশ্রয়ী ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করছে। চীন, ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নতুন স্বপ্ন নিয়ে দেশটিতে পা রাখেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর তাদের সামনে যে বাস্তবতা দাঁড়ায়, তা সব সময় সহজ নয়।

ভাষাগত সমস্যা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, পরিবার থেকে দূরে থাকার মানসিক চাপ, অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতা, বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাযথভাবে অভ্যর্থনা ও দিকনির্দেশনার ঘাটতি এবং কোর্স নির্বাচনের জটিলতা—সব মিলিয়ে একজন নতুন শিক্ষার্থী সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন।

প্রতিটি নতুন সেমিস্টারে শিক্ষকদের কাছে এমন অসংখ্য প্রশ্ন আসে। নির্বাচিত কোর্স এখনো অনুমোদিত হয়নি কেন? এতে উপস্থিতির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি? অ্যাসাইনমেন্ট কীভাবে জমা দিতে হবে? ছুটি কবে শুরু হবে? নিজ দেশের কর্তৃপক্ষকে দেখানোর জন্য পড়াশোনার সনদ পাওয়া যাবে কি?

কেউ কেউ আবার দেরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান। তখন তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে শিক্ষককে কখনো অনুবাদ-প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হয়, কখনো এমন আশ্বাস দিতে হয় যার নিশ্চয়তা আসলে তার নিজের হাতেও নেই।

এখানে শিক্ষক আর কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি হয়ে ওঠেন একটি নতুন দেশের শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থার অনানুষ্ঠানিক পথপ্রদর্শক।

যে যত্ন শিক্ষার অংশ, কিন্তু স্বীকৃতি কম

শিক্ষকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে কম দৃশ্যমান ভূমিকা সম্ভবত যত্ন নেওয়ার জায়গাটি।

বহু বছর আগে এক ঝড়ের রাতে ক্লাস শেষে আটকে পড়া একজন শিক্ষার্থীকে একজন শিক্ষক নিজের গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। আরেক শিক্ষক রাত জেগে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীকে অন্তত খাবার খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। এসব কাজ কোনো পাঠ্যক্রমের অংশ নয়, কিন্তু শিক্ষার্থীর কাছে এগুলোর প্রভাব গভীর হতে পারে।

দার্শনিক ও নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্রেইবার সমাজে যত্ননির্ভর কাজের অবমূল্যায়নের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর যুক্তির কেন্দ্রে ছিল—মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও যত্ন কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটায় না, বরং মানুষকে মানুষ হিসেবেও ধরে রাখে।

Why is diversity important in college? 5 reasons - Wellfleet Student

বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক কখনো হয়ে ওঠেন পরিবারের বড় ভাই বা বোনের মতো, কখনো অভিভাবকের বিকল্প, কখনো সাংস্কৃতিক অনুবাদক। এমনকি শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত ভুল বা সমস্যার কথাও শিক্ষকের কাছে খুলে বলেন।

একজন শিক্ষক জানিয়েছেন, তাঁর এক সহকর্মী বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে খাবার ভাগাভাগির আয়োজন করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল তাদের নিজেদের সংস্কৃতি ও গল্প একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং একাকিত্ব কমানো। চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বের মধ্যে এ কাজ নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীর মনে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে এর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

নীরব ত্যাগের মূল্য কতটা?

এই যত্নের কাজ সহজ নয়। একজন শিক্ষককে একই সময়ে বড় ক্লাস নিতে হয়, গবেষণার সময়সীমা মেনে চলতে হয়, প্রশাসনিক কাগজপত্র শেষ করতে হয় এবং প্রতিষ্ঠানের নানা দায়িত্ব সামলাতে হয়। এর মধ্যেও কোনো একজন সমস্যাগ্রস্ত শিক্ষার্থীকে সময় দিতে হয়।

অনেক ক্ষেত্রেই এই সহায়তা আসে কর্মঘণ্টার বাইরে। রাতের ফোন, অতিরিক্ত পরামর্শ, ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শোনা কিংবা কোনো জটিল প্রশাসনিক বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া—এসবের বিনিময়ে কোনো পদক নেই, আলাদা স্বীকৃতিও নেই।

কিন্তু একজন শিক্ষকের ধৈর্য কখনো কখনো একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। বাড়ির জন্য মন খারাপ করা একজন শিক্ষার্থী হয়তো সেই সহায়তার কারণেই পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

শিক্ষক কেন প্রায়ই ‘দোষী’ হয়ে যান

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। বিশ্ববিদ্যালয় যখন শিক্ষার্থীকে এক ধরনের ‘গ্রাহক’ হিসেবে বিবেচনা করে, তখন কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই তার ভাবমূর্তি ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে রক্ষা করতে চায়।

কিন্তু কোনো ঘটনায় শিক্ষার্থী বা শীর্ষ কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা সম্ভব না হলে দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়ে?

অনেক সময় সেই শিক্ষকই সামনে চলে আসেন, যিনি আসলে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করছিলেন। তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানের অসন্তোষের সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য। অর্থাৎ শিক্ষক শুধু সংকট সামলান না, কখনো কখনো সেই সংকটের দায়ও নিজের ওপর নিতে বাধ্য হন।

Invisible career paths leave millions of US teachers stuck, classrooms  suffer - The Times of India

শিক্ষার নেপথ্যের আসল শক্তি

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু শ্রেণিকক্ষ, সিলেবাস, পরীক্ষা ও ডিগ্রির সমষ্টি হিসেবে দেখলে শিক্ষকের প্রকৃত ভূমিকার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়।

বিশেষ করে যে দেশ উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক শিল্প হিসেবে এগিয়ে নিতে চায়, সেখানে শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল জ্ঞান বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদেশ থেকে আসা একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা নির্ধারিত হয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানুষগুলোর আচরণেও।

সেই জায়গায় শিক্ষকরা প্রায়ই প্রতিষ্ঠানের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ান। তারা শিক্ষার্থীর উদ্বেগ শোনেন, পথ দেখান, ভুল বোঝাবুঝি মেটান, প্রয়োজন হলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং কখনো শুধু একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ান।

সমাজে যত্নের কাজের মূল্যায়ন কম হতে পারে। কিন্তু শিক্ষা যদি মানুষের জীবন বদলানোর প্রক্রিয়া হয়, তাহলে সেই পরিবর্তনের ভিত্তিতে যত্ন, সহযোগিতা ও আস্থার জায়গাগুলোকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

একজন ভালো শিক্ষক হয়তো শিক্ষার্থীর জীবনে কোনো বড় বক্তৃতার কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না। বরং হয়তো মনে থাকবে সেই বৃষ্টির রাত, সেই ফোনকল, সেই একটি আশ্বাস কিংবা কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মুহূর্তটি।

শ্রেণিকক্ষের সামনে শিক্ষক যে জ্ঞান দেন, তা শিক্ষার দৃশ্যমান অংশ। আর শ্রেণিকক্ষের বাইরে যে অদৃশ্য সহায়তা তিনি দেন, সেটিই অনেক সময় শিক্ষার্থীকে সেই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করার শক্তি জোগায়।