আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট Javier Milei দেশের দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির সংকট মোকাবিলায় এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঠামোতেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চাইছেন। তাঁর লক্ষ্য শুধু বর্তমান সরকারের অর্থ ছাপিয়ে ঘাটতি মেটানোর প্রবণতা বন্ধ করা নয়, ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকেও যেন একই পথে ফিরে যেতে না পারে, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা।
৩০ জুলাই টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে মিলেই অতীতের সরকারগুলোর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ‘লুট’ করার অভিযোগ তোলেন। একই সঙ্গে তিনি গত ৯১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কারের একটি প্যাকেজের কথা জানান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতায় বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত আইনে সরকারকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হবে মুদ্রার মূল্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণের জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে।
মিলেইয়ের যুক্তি, রাজনৈতিক সরকারগুলো যখন অতিরিক্ত ব্যয় করে এবং সেই ঘাটতি পূরণ করতে নতুন টাকা ছাপে, তখনই আর্জেন্টিনায় মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার নেয়। তিনি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতায় আসার সময় দেশটিতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ। কঠোর ব্যয়সংকোচন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অর্থায়ন বন্ধ করার মাধ্যমে সেটি এখন প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
তবে মিলেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার আবার অর্থ ছাপানোর পথ বেছে নিতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য তাই সেই সম্ভাবনা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।

পুরোনো জটিল লক্ষ্য সরিয়ে সরল কাঠামো
বর্তমানে আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক লক্ষ্য রয়েছে, যার মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সমতার মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। মিলেইয়ের প্রস্তাব এসব জটিলতা কমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্বকে আরও স্পষ্ট করতে চায়।
গভর্নরকে সহজে অপসারণ করা না গেলে তিনি সরকারের অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা পাবেন—এমনটাই আশা করা হচ্ছে। সরকারের সব স্তরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন সরাসরি নিষিদ্ধ করাও সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এর পাশাপাশি পুঁজি ও বিমা বাজার আরও উন্মুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে সরকারের আয় থেকে ব্যয় বেশি হলে টানা কয়েক মাস পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো একটি প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গভর্নর নিয়োগ নিয়ে থেকেই যাচ্ছে প্রশ্ন
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অপসারণ কঠিন করার উদ্যোগকে যুক্তিসঙ্গত মনে করা হলেও গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়ায় একই ধরনের সংস্কার না থাকায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
মিলেই আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, অর্থ ছাপানোর প্রক্রিয়ায় সহায়তা করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তির বিধান আনা হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন কঠোর ব্যবস্থা মেধাবী ও দক্ষ অর্থনীতিবিদদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাজ করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন নেই
সংস্কারের সবচেয়ে বড় ঘাটতিগুলোর একটি হলো বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। আর্জেন্টিনায় দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বাজারে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণ সাময়িক স্থিতিশীলতা আনলেও অতীতে বারবার অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির চক্র তৈরি করেছে।
দক্ষিণ আমেরিকার Peru এর বিপরীতে অনেক বেশি মুক্ত মুদ্রাবাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু মুক্তবাজারপন্থী হিসেবে পরিচিত মিলেইও এখনো ডলারের মূল্য পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নন। তাঁর আশঙ্কা, হঠাৎ বাজারমুখী পরিবর্তনে অস্থিরতা ও স্বল্পমেয়াদি মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
মুদ্রানীতি নিয়েও স্পষ্টতা কম
আর্জেন্টিনার বর্তমান মুদ্রানীতি নিয়েও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনভেকিউর অর্থনীতিবিদ সান্তিয়াগো বুলাতের মতে, দেশটির মুদ্রানীতির সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পেসোকে শক্তিশালী রাখতে কঠোর নীতি নেওয়া হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি কমেছে ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ঘটনাও বেড়েছে।
বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সুদের হারকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো অর্থের সরবরাহের ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ সরকার চাইলে সংস্কার উল্টে দিতে পারে
মিলেইয়ের পরিকল্পনার আরেকটি দুর্বলতা হলো—নতুন কংগ্রেস চাইলে ভবিষ্যতে এসব নিয়ম তুলনামূলক সহজেই পরিবর্তন করতে পারে।
গভর্নরকে অপসারণে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান রাখা হলেও সেই বিধানটি পরিবর্তন করতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট হতে পারে। অর্থাৎ আইন বদলে ফেলার রাজনৈতিক খরচ বাড়লেও ভবিষ্যৎ সরকারকে অর্থ ছাপানো থেকে পুরোপুরি আটকানোর নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা শুধু আইনের ওপর নির্ভর করে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক রীতিনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আসল পরীক্ষা ২০২৭ সালের নির্বাচন
মিলেইয়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক সংস্কারের ফল জনগণের সামনে তুলে ধরা। ২০২৭ সালের অক্টোবরে তাঁর পুনর্নির্বাচনের লড়াই। আপাতত তাঁর সামনে শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
তাঁর নীতিতে আর্জেন্টিনার মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশটির ঋণমানও সম্প্রতি কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে উন্নত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার পদক্ষেপও বাজারে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। চীনের সঙ্গে ১৯ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় চুক্তিও আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনো দুর্বল ও অসম। তেলসহ কিছু খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এসব খাতে তুলনামূলক কম কর্মসংস্থান তৈরি হয়। চলতি বছর আর্জেন্টিনার অর্থনীতি ৩ শতাংশের কম বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান কমছে এবং মে মাসে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাধিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারি, যা সরকারের জনপ্রিয়তায় চাপ তৈরি করেছে। জুলাইয়ে মিলেই সরকারের প্রতি সমর্থন তাঁর বর্তমান মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়।
শুধু আইন বদলালেই মিলবে না স্থায়ী সমাধান
আর্জেন্টিনার ইতিহাস বলছে, নির্বাচনের বছরে জনপ্রিয়তায় পতন দ্রুত অর্থনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হলে বন্ড ও অন্যান্য সম্পদের বিক্রি বাড়তে পারে, আর সেই অর্থনৈতিক চাপ আবার সরকারের জনপ্রিয়তা আরও কমিয়ে দিতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারের মাধ্যমে মিলেই এই চক্র ভাঙতে চাইছেন। তাঁর বার্তা হলো—সরকার পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক নীতির বড় অংশ যেন হঠাৎ বদলে না যায়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী আইন দিয়ে বেঁধে রাখাই যথেষ্ট হবে না। ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদদের কাছে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় ও সহজে অর্থ ছাপাকে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক না করে তোলাই হবে মিলেইয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার ফল নির্ধারণে ২০২৭ সালের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মিলেই যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানেও স্থায়ী উন্নতি দেখাতে পারেন, তাহলে তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। আর যদি অর্থনীতি আবার দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যত শক্তিশালী আইনই করা হোক, তাঁর সংস্কার প্রকল্পকে রক্ষা করা কঠিন হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















