১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
হরমুজ প্রণালীকে ‘অস্ত্র’ বানিয়ে দীর্ঘদিন চাপ ধরে রাখতে পারবে ইরান ১৩ বছরের কিশোরকে চাপা দিয়ে হত্যার পরও দুই বছরেই মুক্তি, ক্ষোভে ফুঁসছে পরিবার সিসিলির উপকূলে ২ হাজার বছরের পুরোনো রোমান জাহাজের সন্ধান, মিলেছে শত শত প্রাচীন পাত্র সমুদ্রের নিচে ৭০ কিলোমিটার ছুটে যায় তিমির ভয়ংকর ডাক, কেন এত জোরে ডাকে বিজ্ঞানীরাও নিশ্চিত নন তীব্র ঝাঁকুনিতে বিমান ৯১ মিটার নিচে, এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলটের মাদক পরীক্ষা ইংরেজি ভাষা নিয়ে প্রচলিত তিন ধারণা, যেগুলো আসলে পুরোপুরি সত্য নয় ইউক্রেনের আকাশে ভয়াবহ শূন্যতা, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মিত্রদের দিকেই তাকিয়ে কিয়েভ আগুনে পুড়ে ছাই ফ্রান্সের গ্রাম, ঘরে ফিরে বাসিন্দাদের একটাই প্রশ্ন—কেন রক্ষা করা গেল না? ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেও জীবনকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন সিডনি টোউল ইউরোপের বিমানবন্দরে পাঁচ ঘণ্টার লাইন, নতুন সীমান্ত ব্যবস্থায় ভোগান্তিতে যাত্রীরা

ইউক্রেনের আকাশে ভয়াবহ শূন্যতা, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মিত্রদের দিকেই তাকিয়ে কিয়েভ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। রুশ বাহিনীর একের পর এক ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হামলার সংখ্যা বাড়লেও সেই হামলা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ কমে যাচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পশ্চিমা মিত্রদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে আসছেন। যুদ্ধের প্রথম দিকের তুলনায় এখন তার আবেদন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ রাশিয়া এমন মাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ইউক্রেনের বর্তমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।

কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ঘাটতি

সাম্প্রতিক কয়েকটি রুশ হামলা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এক হামলায় রাশিয়া ৩৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও ইউক্রেন মাত্র দুটি প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। এর কয়েক দিন পর ২৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে একটিও ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

এই দুই হামলায় ২৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, পরিবহনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Russian missile attacks on Kyiv expose weakness in Ukraine's air defense |  PBS News

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগে দেশটির কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতা সীমিত ছিল। কিন্তু তখন রাশিয়ার কাছেও এত বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল না। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। রুশ বাহিনী সপ্তাহে একাধিকবার বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারছে।

ফলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একদিকে অস্ত্রের ঘাটতির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে প্রতিটি হামলা মোকাবিলায় আরও বেশি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হচ্ছে।

পশ্চিমা মিত্রদের অস্ত্রভাণ্ডারেও চাপ

ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ভরসা পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু সেই দেশগুলোর নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার নিয়েও এখন উদ্বেগ রয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে নিজেদের মজুত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। কারণ কোনো দেশই জানে না, ভবিষ্যতে নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় তাদের কতটা অস্ত্র প্রয়োজন হতে পারে।

জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, মিত্রদের হাতে প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও সেগুলো ইউক্রেনে পাঠানোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখনো যথেষ্ট দ্রুত নেওয়া হচ্ছে না।

এই দ্বিধাই কিয়েভের জন্য বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

রাশিয়ার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে

Russia is raining hellfire on Ukraine

শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ কমে যাওয়া নয়, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের গতিও ইউক্রেনের জন্য উদ্বেগের কারণ।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের দিকে প্রায় ৬৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এই সংখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ উন্নত প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও সরবরাহ সেই তুলনায় অনেক ধীর।

অর্থাৎ রাশিয়া যে গতিতে আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার করছে, পশ্চিমা দেশগুলো সেই গতিতে সেগুলো ঠেকানোর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারছে না।

এই ব্যবধান যত বাড়বে, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সংকটও তত গভীর হবে।

প্যাট্রিয়টের ওপর বড় নির্ভরতা

ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে উন্নত প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রকে ইউক্রেনের অন্যতম কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ইউক্রেনে পৌঁছানোর পর দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশও সহায়তা দেয়।

কিন্তু এখন প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেই সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারণ রাশিয়া একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশ হামলার অস্ত্র ব্যবহার করছে। ফলে ইউক্রেনকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, সামরিক স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহন অবকাঠামোর জন্য পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হচ্ছে।

Ukraine to get 'license' for making Patriot interceptors, Trump pledges

আসন্ন শীত নিয়ে বড় আশঙ্কা

ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন আসন্ন শীতকাল। রাশিয়া অতীতেও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের আশঙ্কা, সামনে আবারও বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের হামলা হতে পারে।

শীতের সময়ে এমন হামলা সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে শুধু আলো বা যোগাযোগব্যবস্থা নয়, ঘর গরম রাখা, পানি সরবরাহ, হাসপাতাল পরিচালনা এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই ইউক্রেনের কাছে পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা এখন শুধু সামরিক প্রয়োজন নয়; এটি বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষারও অন্যতম প্রধান উপায়।

ন্যাটোর সহায়তা কতটা কার্যকর হবে

ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে ন্যাটোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কেনার একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে।

কিন্তু এই ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থ আসছে না। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে শুরুতে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র কেনার অর্থ পাওয়ার আশা করা হয়েছিল। বাস্তবে প্রথম বছরে মাসিক অবদান তার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি হয়েছে।

ফলে অর্থের ঘাটতি সরাসরি অস্ত্র সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলছে।

জেলেনস্কি তাই শুধু আরও অস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন না; তিনি উৎপাদন বাড়ানোরও দাবি করছেন। কারণ দীর্ঘমেয়াদে মিত্রদের মজুত থেকে অস্ত্র নিয়ে ইউক্রেনের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে না।

নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা

Think Tank reports on Russia's war of aggression against Ukraine - Consilium

ইউক্রেন বুঝতে পারছে যে কেবল বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাই দেশটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা তৈরির অনুমতি পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে। কারখানা তৈরি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।

অথচ রাশিয়ার হামলা বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে

আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতির সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউক্রেনে ১ হাজার ৩৯৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জাতিসংঘের তথ্য জানিয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৩৭ শতাংশ বেশি। দুই বছর আগের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি ১১৪ শতাংশ।

কিয়েভের একটি উপশহরের রেলস্টেশনের কাছের হামলা এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সেখানে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা মানুষের কাছে হামলার পর প্ল্যাটফর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ধারকারীরা নিহতদের মরদেহ সাদা ব্যাগে করে সরিয়ে নেন।

এ ধরনের হামলা ইউক্রেনের মানুষের কাছে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে প্রতিদিনের বাস্তবতায় পরিণত করছে।

সবচেয়ে বড় ভয়—হামলাকে স্বাভাবিক মনে করা

The Future of European Security: What is Next For NATO - CEPA

ইউক্রেনের ন্যাটো রাষ্ট্রদূত আলিওনা গেতমানচুকের উদ্বেগ আরও গভীর। তার মতে, রাশিয়ার নিয়মিত হামলা এত ঘন ঘন ঘটছে যে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে প্রতিটি নতুন হামলা আলাদা করে আগের মতো বড় ঘটনা হিসেবে ধরা পড়ছে না।

এটি ইউক্রেনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সমস্যা।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের মনোযোগ ধীরে ধীরে অন্য সংকটের দিকে চলে যেতে পারে। কিন্তু ইউক্রেনের জন্য প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এখনও জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

জেলেনস্কির আবেদন তাই কেবল অস্ত্রের জন্য নয়; আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখারও চেষ্টা।

সামনে কঠিন সময়

ইউক্রেন এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে রাশিয়ার আক্রমণের সক্ষমতা বাড়ছে, অথচ আকাশ প্রতিরক্ষার সরবরাহ কমছে। পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অস্ত্র উৎপাদনের গতি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা—সবকিছুই এখন কিয়েভের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আসন্ন শীত এই সংকটকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। রাশিয়া যদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের হামলা চালায় এবং ইউক্রেন পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র না পায়, তাহলে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

ইউক্রেনের সামনে তাই প্রশ্ন একটাই—মিত্ররা কত দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে?

কারণ কিয়েভের কাছে প্রতিটি অতিরিক্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র শুধু একটি সামরিক সরঞ্জাম নয়। সেটি হতে পারে একটি শহর রক্ষা করার উপায়, একটি হাসপাতাল সচল রাখার মাধ্যম কিংবা একজন সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগ।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালীকে ‘অস্ত্র’ বানিয়ে দীর্ঘদিন চাপ ধরে রাখতে পারবে ইরান

ইউক্রেনের আকাশে ভয়াবহ শূন্যতা, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মিত্রদের দিকেই তাকিয়ে কিয়েভ

১১:১৯:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। রুশ বাহিনীর একের পর এক ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হামলার সংখ্যা বাড়লেও সেই হামলা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ কমে যাচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পশ্চিমা মিত্রদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে আসছেন। যুদ্ধের প্রথম দিকের তুলনায় এখন তার আবেদন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ রাশিয়া এমন মাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ইউক্রেনের বর্তমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।

কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ঘাটতি

সাম্প্রতিক কয়েকটি রুশ হামলা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এক হামলায় রাশিয়া ৩৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও ইউক্রেন মাত্র দুটি প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। এর কয়েক দিন পর ২৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে একটিও ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

এই দুই হামলায় ২৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, পরিবহনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Russian missile attacks on Kyiv expose weakness in Ukraine's air defense |  PBS News

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগে দেশটির কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতা সীমিত ছিল। কিন্তু তখন রাশিয়ার কাছেও এত বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল না। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। রুশ বাহিনী সপ্তাহে একাধিকবার বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারছে।

ফলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একদিকে অস্ত্রের ঘাটতির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে প্রতিটি হামলা মোকাবিলায় আরও বেশি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হচ্ছে।

পশ্চিমা মিত্রদের অস্ত্রভাণ্ডারেও চাপ

ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ভরসা পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু সেই দেশগুলোর নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার নিয়েও এখন উদ্বেগ রয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে নিজেদের মজুত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। কারণ কোনো দেশই জানে না, ভবিষ্যতে নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় তাদের কতটা অস্ত্র প্রয়োজন হতে পারে।

জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, মিত্রদের হাতে প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও সেগুলো ইউক্রেনে পাঠানোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখনো যথেষ্ট দ্রুত নেওয়া হচ্ছে না।

এই দ্বিধাই কিয়েভের জন্য বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

রাশিয়ার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে

Russia is raining hellfire on Ukraine

শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ কমে যাওয়া নয়, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের গতিও ইউক্রেনের জন্য উদ্বেগের কারণ।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের দিকে প্রায় ৬৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এই সংখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ উন্নত প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও সরবরাহ সেই তুলনায় অনেক ধীর।

অর্থাৎ রাশিয়া যে গতিতে আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার করছে, পশ্চিমা দেশগুলো সেই গতিতে সেগুলো ঠেকানোর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারছে না।

এই ব্যবধান যত বাড়বে, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সংকটও তত গভীর হবে।

প্যাট্রিয়টের ওপর বড় নির্ভরতা

ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে উন্নত প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রকে ইউক্রেনের অন্যতম কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ইউক্রেনে পৌঁছানোর পর দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশও সহায়তা দেয়।

কিন্তু এখন প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেই সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারণ রাশিয়া একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশ হামলার অস্ত্র ব্যবহার করছে। ফলে ইউক্রেনকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, সামরিক স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহন অবকাঠামোর জন্য পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হচ্ছে।

Ukraine to get 'license' for making Patriot interceptors, Trump pledges

আসন্ন শীত নিয়ে বড় আশঙ্কা

ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন আসন্ন শীতকাল। রাশিয়া অতীতেও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের আশঙ্কা, সামনে আবারও বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের হামলা হতে পারে।

শীতের সময়ে এমন হামলা সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে শুধু আলো বা যোগাযোগব্যবস্থা নয়, ঘর গরম রাখা, পানি সরবরাহ, হাসপাতাল পরিচালনা এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই ইউক্রেনের কাছে পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা এখন শুধু সামরিক প্রয়োজন নয়; এটি বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষারও অন্যতম প্রধান উপায়।

ন্যাটোর সহায়তা কতটা কার্যকর হবে

ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে ন্যাটোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কেনার একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে।

কিন্তু এই ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থ আসছে না। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে শুরুতে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র কেনার অর্থ পাওয়ার আশা করা হয়েছিল। বাস্তবে প্রথম বছরে মাসিক অবদান তার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি হয়েছে।

ফলে অর্থের ঘাটতি সরাসরি অস্ত্র সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলছে।

জেলেনস্কি তাই শুধু আরও অস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন না; তিনি উৎপাদন বাড়ানোরও দাবি করছেন। কারণ দীর্ঘমেয়াদে মিত্রদের মজুত থেকে অস্ত্র নিয়ে ইউক্রেনের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে না।

নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা

Think Tank reports on Russia's war of aggression against Ukraine - Consilium

ইউক্রেন বুঝতে পারছে যে কেবল বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাই দেশটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা তৈরির অনুমতি পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে। কারখানা তৈরি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।

অথচ রাশিয়ার হামলা বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে

আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতির সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউক্রেনে ১ হাজার ৩৯৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জাতিসংঘের তথ্য জানিয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৩৭ শতাংশ বেশি। দুই বছর আগের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি ১১৪ শতাংশ।

কিয়েভের একটি উপশহরের রেলস্টেশনের কাছের হামলা এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সেখানে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা মানুষের কাছে হামলার পর প্ল্যাটফর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ধারকারীরা নিহতদের মরদেহ সাদা ব্যাগে করে সরিয়ে নেন।

এ ধরনের হামলা ইউক্রেনের মানুষের কাছে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে প্রতিদিনের বাস্তবতায় পরিণত করছে।

সবচেয়ে বড় ভয়—হামলাকে স্বাভাবিক মনে করা

The Future of European Security: What is Next For NATO - CEPA

ইউক্রেনের ন্যাটো রাষ্ট্রদূত আলিওনা গেতমানচুকের উদ্বেগ আরও গভীর। তার মতে, রাশিয়ার নিয়মিত হামলা এত ঘন ঘন ঘটছে যে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে প্রতিটি নতুন হামলা আলাদা করে আগের মতো বড় ঘটনা হিসেবে ধরা পড়ছে না।

এটি ইউক্রেনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সমস্যা।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের মনোযোগ ধীরে ধীরে অন্য সংকটের দিকে চলে যেতে পারে। কিন্তু ইউক্রেনের জন্য প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এখনও জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

জেলেনস্কির আবেদন তাই কেবল অস্ত্রের জন্য নয়; আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখারও চেষ্টা।

সামনে কঠিন সময়

ইউক্রেন এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে রাশিয়ার আক্রমণের সক্ষমতা বাড়ছে, অথচ আকাশ প্রতিরক্ষার সরবরাহ কমছে। পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অস্ত্র উৎপাদনের গতি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা—সবকিছুই এখন কিয়েভের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আসন্ন শীত এই সংকটকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। রাশিয়া যদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের হামলা চালায় এবং ইউক্রেন পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র না পায়, তাহলে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

ইউক্রেনের সামনে তাই প্রশ্ন একটাই—মিত্ররা কত দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে?

কারণ কিয়েভের কাছে প্রতিটি অতিরিক্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র শুধু একটি সামরিক সরঞ্জাম নয়। সেটি হতে পারে একটি শহর রক্ষা করার উপায়, একটি হাসপাতাল সচল রাখার মাধ্যম কিংবা একজন সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগ।