ইংরেজি ভাষা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কেউ মনে করেন, ইংরেজিতে প্রাণীদের দলবদ্ধতার জন্য অসংখ্য চমৎকার নাম রয়েছে। কেউ ভাবেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ভাষাই ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যায়। আবার কারও ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালেচিয়ান পাহাড়ি অঞ্চলে এখনো শেক্সপিয়রের সময়কার ইংরেজি ভাষা টিকে আছে।
শুনতে এসব কথা বেশ আকর্ষণীয়। এমনকি ভাষাবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলার সময় অনেকেই উজ্জ্বল চোখে এসব তথ্য তুলে ধরেন। কিন্তু ভাষার ইতিহাস ও পরিবর্তন একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, জনপ্রিয় এই ধারণাগুলোর অনেকটাই সত্যের চেয়ে গল্পের কাছাকাছি।
প্রাণীদের দলবদ্ধতার এত বিচিত্র নাম কি সত্যিই ব্যবহৃত হয়?
ইংরেজি ভাষায় প্রাণীদের দল বোঝাতে কিছু চমৎকার শব্দ আছে—এ কথা সত্য। যেমন গরুর দলকে বলা হয় পাল, পাখির দলকে ঝাঁক এবং হাঁসের দলকে এক ধরনের বিশেষ সমষ্টিবাচক শব্দ দিয়ে বোঝানো হয়। এর বাইরে কাকের দল, ফ্লেমিঙ্গোর দল, জিরাফের দল, ময়ূরের দল কিংবা জেব্রার দলের জন্যও নানা অভিনব নামের তালিকা পাওয়া যায়।
কাকের দলকে হত্যার দল, ফ্লেমিঙ্গোর দলকে চাকচিক্যের দল, জিরাফের দলকে টাওয়ার বা মিনারের মতো উঁচু সমষ্টি—এমন সব নাম শুনলে মনে হতে পারে ইংরেজি ভাষা বুঝি প্রাণীদের দলবদ্ধতা নিয়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন।
এই শব্দগুলোর বড় একটি অংশ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রায় ব্যবহৃতই হয় না। অনেক শব্দ অভিধানে খুঁজে পাওয়া গেলেও বাস্তব জীবনে মানুষ সেগুলো ব্যবহার করে না। বরং এগুলোর বেশির ভাগই ভাষার চেয়ে মজার শব্দখেলা হিসেবে বেশি পরিচিত।
এর পেছনে রয়েছে কয়েক শত বছরের পুরোনো একটি বই। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে জুলিয়ানা বার্নার্স নামে এক নারী লেখক প্রাণীদের দলবদ্ধতার নানা নাম নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে শুধু প্রাণী নয়, মানুষের দল নিয়েও বেশ কিছু মজার সমষ্টিবাচক নাম দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ শুরু থেকেই বিষয়টির মধ্যে খানিকটা রসিকতা ছিল।
পরবর্তী সময়ে বইটির বিভিন্ন সংস্করণে আরও অনেক নতুন নাম যোগ হতে থাকে। ফলে ফ্লেমিঙ্গো, ময়ূর কিংবা অন্য প্রাণীর দল নিয়ে যে চমৎকার সব নাম আমরা আজ শুনি, তার অনেকগুলোই প্রাচীন ইংরেজির স্বাভাবিক ও বহুল ব্যবহৃত শব্দ নয়।
এগুলোকে বলা যায় ভাষার এক ধরনের ঐতিহাসিক শব্দখেলা।
শব্দগুলো টিকে আছে মূলত মানুষের কৌতূহল ও আনন্দের কারণে। অনেকটা এমন—কোনো পুরোনো জিনিস ঘরে পড়ে আছে, ব্যবহার করা হয় না, কিন্তু সেটি আছে বলেই ভালো লাগে।
সময়ের সঙ্গে ভাষা কি শুধু সহজ হয়ে যায়?
এটি ইংরেজি ভাষা নিয়ে আরেকটি বহুল প্রচলিত ধারণা।
আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, মানুষ দ্রুত কথা বললে শব্দের কিছু অংশ বাদ পড়ে যায়। যেমন একটি বাক্য দ্রুত উচ্চারণ করতে গিয়ে কয়েকটি শব্দ ছোট হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিবর্তন চলতে থাকলে মনে হতে পারে, ভাষা বুঝি ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যাচ্ছে।
ইংরেজির পুরোনো রূপের সঙ্গে আধুনিক ইংরেজির তুলনা করলেও বিষয়টি এমন মনে হতে পারে। প্রাচীন ইংরেজিতে ব্যাকরণের কাঠামো ছিল অনেক বেশি জটিল। আধুনিক ইংরেজিতে তার অনেক কিছুই আর নেই।
তাহলে কি ভাষা ক্রমেই সরল হয়ে যাচ্ছে?
ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে উত্তর হলো—না।
ভাষা সাধারণত সহজ বা কঠিন হওয়ার দিকে সরলরেখায় এগোয় না। বরং ভাষা বদলায়।
![]()
কিছু বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়, আবার নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। কোনো পুরোনো নিয়ম বিলুপ্ত হয়, অন্য কোনো নতুন নিয়ম জায়গা নেয়। ফলে ভাষাকে একটি চলমান ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে পরিবর্তন অবিরাম ঘটে।
একটি ভাষা একদিকে কিছু জটিলতা হারাতে পারে, কিন্তু একই সময়ে অন্য জায়গায় নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
মানুষের মুখে মুখে জন্ম নেয় নতুন ভাষার নিয়ম
ভাষার পরিবর্তন অনেক সময় খুব ধীরে ঘটে। আবার কখনো দৈনন্দিন কথাবার্তার মধ্যেই তার সূচনা হয়।
মানুষ দ্রুত কথা বলার সময় কয়েকটি শব্দকে একসঙ্গে উচ্চারণ করতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে এমন উচ্চারণ চলতে থাকলে শব্দের কোনো অংশ হারিয়ে যেতে পারে। পরে সেই পরিবর্তিত উচ্চারণই নতুন একটি ভাষাগত কাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ ভাষার পরিবর্তনকে শুধু ‘ক্ষয়’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এটি অনেকটা প্রবাহমান নদীর মতো। নদীর একটি অংশে মাটি সরে যায়, অন্য অংশে নতুন চর তৈরি হয়। ভাষার ক্ষেত্রেও পুরোনো কিছু হারায়, আবার নতুন কিছু জন্ম নেয়।
আর পৃথিবীতে মানুষের ভাষার ইতিহাস এত দীর্ঘ যে ভাষা যদি কেবল সময়ের সঙ্গে সহজই হতে থাকত, তাহলে বহু হাজার বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলার পর পৃথিবীর ভাষাগুলো এখন অত্যন্ত সরল হয়ে যাওয়ার কথা।
বাস্তবে তা হয়নি।
আজকের পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা রয়েছে। অনেক ভাষার ব্যাকরণ অত্যন্ত জটিল। কোনো কোনো ভাষা একজন প্রাপ্তবয়স্ক নতুন করে শিখতে গেলে যথেষ্ট কঠিন মনে হতে পারে।
তাই ভাষা আসলে সহজ হচ্ছে না; ভাষা তার প্রয়োজন, ব্যবহারকারী এবং সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে।

অ্যাপালেচিয়ানে কি এখনো শেক্সপিয়রের ইংরেজি শোনা যায়?
ইংরেজি নিয়ে তৃতীয় জনপ্রিয় ধারণাটি আরও রোমাঞ্চকর।
অনেকদিন ধরেই বলা হয়ে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালেচিয়ান পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ নাকি শেক্সপিয়রের সময়কার ইংরেজি ভাষা ধরে রেখেছেন।
ধারণাটির ভিত্তি খুব সহজ।
পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল। বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কম ছিল। তাই ধারণা করা হয়, সেখানে ভাষা পরিবর্তনের গতি ধীর ছিল এবং কয়েক শত বছর আগের ইংরেজির অনেক বৈশিষ্ট্য সেখানে এখনো রয়ে গেছে।
শুনতে ভালো লাগলেও ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ঠিক নয়।
ভাষা কখনো পুরোপুরি স্থির হয়ে থাকে না। মানুষ বাইরের বিশ্বের সঙ্গে খুব কম যোগাযোগ করলেও তার নিজের সমাজের ভেতরেই ভাষা বদলাতে থাকে।
অ্যাপালেচিয়ান অঞ্চলের ইংরেজিও তার ব্যতিক্রম নয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কিছু গবেষক ও লেখক অ্যাপালেচিয়ান ইংরেজিকে প্রাচীন ইংরেজির সংরক্ষিত রূপ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য হয়তো অবজ্ঞা করা ছিল না। বরং তাঁরা দেখাতে চেয়েছিলেন, এই অঞ্চলের ভাষা আলাদা ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ।
কিন্তু সেই ব্যাখ্যার মধ্যেই একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়।
পুরোনো শব্দ থাকলেই পুরো ভাষা পুরোনো হয় না
অ্যাপালেচিয়ান ইংরেজিতে এমন কিছু ক্রিয়ার রূপ পাওয়া যায়, যেগুলো আধুনিক প্রচলিত ইংরেজিতে আর তেমন ব্যবহৃত হয় না।
যেমন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘সহায়তা করা’ অর্থে ব্যবহৃত পুরোনো ধরনের ক্রিয়ার রূপ কিংবা ‘নিয়ে আসা’ অর্থের পুরোনো উচ্চারণের মতো কিছু রূপ টিকে আছে।
এসব শব্দের সঙ্গে ইংরেজির পুরোনো রূপের মিল থাকায় অনেকেই ধরে নিয়েছেন, অ্যাপালেচিয়ানরা যেন কয়েক শত বছর আগের ইংরেজি সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
কিন্তু ভাষা এমনভাবে কাজ করে না।
একটি অঞ্চলের মানুষ একটি পুরোনো শব্দ ধরে রাখতে পারেন, অন্য একটি শব্দ পরিবর্তন করতে পারেন। আবার অন্য অঞ্চলে ঠিক উল্টোটা হতে পারে।
ধরা যাক, একটি অঞ্চলের মানুষ এমন কিছু ক্রিয়ার পুরোনো রূপ ধরে রাখলেন, যেগুলো অন্য অঞ্চলে হারিয়ে গেছে। একই সময়ে তারা এমন কিছু নতুন রূপ ব্যবহার করলেন, যেগুলো প্রাচীন ইংরেজিতে ছিল না।
তাহলে সেই ভাষাকে পুরোনো ভাষা বলা যায় না।
এটি বরং ভাষার স্বাভাবিক পরিবর্তনের একটি আঞ্চলিক রূপ।
ভাষার ইতিহাস বুঝতে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি
অ্যাপালেচিয়ান ইংরেজিকে প্রাচীন ইংরেজির জীবন্ত নমুনা মনে করার প্রবণতাটি মূলত একটি দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যাও বটে।
যারা অ্যাপালেচিয়ান ভাষা শুনে কিছু পুরোনো শব্দ পান, তাঁরা সেগুলোকে প্রাচীনতার নিদর্শন হিসেবে দেখেন। কিন্তু একইভাবে অ্যাপালেচিয়ান ভাষাভাষীরা যদি আধুনিক মূলধারার আমেরিকান ইংরেজি শুনে এমন কিছু পুরোনো রূপ খুঁজে পান, যা তাঁদের অঞ্চলে বদলে গেছে, তাহলে তাঁরাও চাইলে বলতে পারেন—‘এই তো পুরোনো ইংরেজি এখনো টিকে আছে।’
অর্থাৎ কোন শব্দকে পুরোনো মনে হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে আমরা কোন ভাষার রূপকে মানদণ্ড হিসেবে ধরছি তার ওপর।
ভাষার পরিবর্তন কোনো এক জায়গায় থেমে থাকে না।
ভাষা আসলে জীবন্ত
ইংরেজিকে ঘিরে প্রচলিত এসব গল্পের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—ভাষাকে স্থির কোনো বস্তু হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
ভাষা মানুষের মতোই পরিবর্তনশীল। মানুষ যেমন নতুন অভ্যাস তৈরি করে, পুরোনো কিছু ভুলে যায়, নতুন কিছু গ্রহণ করে, ভাষাও তেমনই বদলায়।
কখনো কোনো পুরোনো শব্দ টিকে যায়। কখনো নতুন শব্দ তৈরি হয়। কখনো উচ্চারণ বদলায়। কখনো ব্যাকরণের নিয়ম পাল্টে যায়। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে এমন বৈশিষ্ট্য টিকে থাকে, যা অন্য অঞ্চলে অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।
তাই প্রাণীদের দলবদ্ধতার বিচিত্র নাম, ভাষা ক্রমেই সহজ হয়ে যাওয়ার ধারণা কিংবা অ্যাপালেচিয়ানে শেক্সপিয়রের ইংরেজি টিকে থাকার গল্প—এসবের মধ্যে আকর্ষণ থাকলেও বাস্তব ভাষাবিজ্ঞান আরও বেশি চমকপ্রদ।
কারণ ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো—এটি কখনো স্থির থাকে না।
আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই ভাষার প্রকৃত ইতিহাস লুকিয়ে থাকে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ভাষা কোনো জাদুঘরে রাখা পুরোনো নিদর্শন নয়। এটি মানুষের মুখে, কথায়, সম্পর্কের মধ্যে এবং প্রতিদিনের ব্যবহারে বেঁচে থাকা এক জীবন্ত ব্যবস্থা। তাই ইংরেজির ইতিহাসও কেবল পুরোনো শব্দের গল্প নয়; এটি মানুষের পরিবর্তন, সমাজের পরিবর্তন এবং যোগাযোগের পরিবর্তনেরও গল্প।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















