কোম্পানিগুলো যখন কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, ঠিক তখনই কর্মক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে এক বিস্ময়কর প্রবণতা। নতুন প্রজন্মের কর্মীরা আবার ফিরছেন অপেক্ষাকৃত কম প্রযুক্তিনির্ভর উপকরণের দিকে। দামি খাতা, রঙিন ডেস্কপ্যাড, হাতে লেখা নোট এবং সাধারণ স্টিকি নোট এখন অনেক তরুণ কর্মীর অফিসজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
জেন জি কর্মীদের অনেকেই ক্রমেই মানসম্মত খাতা, হাতে লেখা নোট, রঙিন কাগজ এবং ব্যক্তিগতভাবে সাজানো ডেস্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা শুধু কাজ গোছানোর চেষ্টা করছেন না, বরং একই ধরনের ও নির্দিষ্ট কাঠামোর কর্মক্ষেত্রে নিজের জন্য একটি ব্যক্তিগত জায়গাও তৈরি করতে চাইছেন।
মানবসম্পদ পেশাজীবী জেসি লেই বলেন, নিজের বলে মনে করার মতো একটি জায়গা থাকা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, নিজের সাজসজ্জার মাধ্যমে অফিসে এমন একটি জায়গা তৈরি হয়, যেখানে মনে হয় সেখানে তাঁরও একটি নিজস্ব অস্তিত্ব রয়েছে।
লেইয়ের কাছে অফিসের অন্যতম পছন্দের সুবিধা হলো বিনামূল্যের স্টিকি নোট। বৈঠকের নোট নেওয়া এবং কম্পিউটার পর্দায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি এগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন। আগে যেসব তথ্য তিনি সবসময় ডিজিটাল নথিতে রাখতেন, সেগুলোর কিছু এখন কাগজের ছোট নোটে লিখে রাখেন।

এই ছোট স্টিকি নোট আবার তাঁর কাছে ক্ষুদ্র আঁকার খাতার মতোও হয়ে উঠেছে। বিরতির সময় তিনি সেখানে বিড়াল, পাখি কিংবা পছন্দের গান থেকে অনুপ্রাণিত নানা ছবি আঁকেন।
লেইয়ের ভাষ্য, হাতে লেখা তাঁকে টাইপ করার চেয়ে বেশি মনোযোগী থাকতে এবং তথ্য ভালোভাবে মনে রাখতে সাহায্য করে। কীবোর্ডে কথোপকথনের সঙ্গে তাল মেলানোর চেয়ে হাতে লেখা তাঁর কাছে বেশি স্বাভাবিক মনে হয়। তাঁর মতে, বিষয়টি ছোট হলেও এমন একটি সুবিধা তাঁর ব্যক্তিগত স্বস্তি ও ভালো থাকার ক্ষেত্রে বাস্তব উন্নতি আনে।
দোকানগুলোতেও দেখা যাচ্ছে পরিবর্তনের প্রভাব
কাগজ-কলমের প্রতি এই নতুন আগ্রহ শুধু অফিসের ডেস্কেই সীমাবদ্ধ নেই। পুরোনো ধরনের প্রযুক্তি ও উপকরণের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা এখন খাতা ও অফিস স্টেশনারির বাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে।
অফিস সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কুইলের জুলাই মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, জেন জি ও সহস্রাব্দ প্রজন্মের ৯৪ শতাংশ অফিসকর্মী কাগজের কাজের তালিকায় কোনো কাজ শেষ করে সেটিতে দাগ টানাকে ডিজিটাল তালিকায় একটি ঘর পূরণ করার চেয়ে বেশি তৃপ্তিদায়ক মনে করেন।
প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মী জানিয়েছেন, কর্মক্ষেত্রে বার্তা, ই-মেইল এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিজ্ঞপ্তির অবিরাম প্রবাহ তাদের আরও বেশি কাগজভিত্তিক কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।
কুইলের প্রধান গিল গ্র্যান্ডবোয়া জানান, প্রবীণ প্রজন্মের তুলনায় জেন জি কর্মীরা বৈঠকের সময় বা ব্যক্তিগত খাতায় হাতে লিখে নোট নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় দ্বিগুণ আগ্রহী।

কুইলের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, ৫৬ শতাংশ জেন জি কর্মী কোনো সহকর্মীকে সরাসরি ডিজিটাল বার্তা পাঠানোর বদলে স্টিকি নোট দিয়ে যেতে বেশি পছন্দ করেন। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এর পেছনে ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ক্লান্তির প্রভাব রয়েছে।
সাধারণ কলম-খাতার বদলে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ
তরুণ কর্মীদের আগ্রহ শুধু সাধারণ অফিস সরঞ্জামে সীমাবদ্ধ নয়। কুইলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জেন জির মধ্যে ভালো মানের খাতা, রঙিন চামড়ার ডেস্কপ্যাড, উন্নতমানের লেখার সরঞ্জাম এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে এমন অফিস সামগ্রীর চাহিদা বেশি বাড়ছে।
জরিপে অংশ নেওয়া জেন জি ও সহস্রাব্দ প্রজন্মের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মী বলেছেন, মানসম্মত অফিস সরঞ্জাম তাদের কাজের উৎসাহ বাড়াতে পারে—যেমনটি পারে উন্নত প্রযুক্তির সরঞ্জাম।
গিল গ্র্যান্ডবোয়ার মতে, এই প্রজন্মের কাছে অফিসের সাধারণ সরঞ্জামও নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অ্যানালগ পণ্যের প্রতি এই আগ্রহের প্রভাব বাজারেও দেখা যাচ্ছে। স্টেশনারি প্রতিষ্ঠান পাপিয়ের খাতা, স্মৃতিচারণের খাতা ও নোটকার্ডের মতো অ্যানালগ পণ্যে জোর বাড়িয়েছে এবং ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের বিক্রি দ্বিগুণ হয়েছে। এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে জেন জি ক্রেতারা।
দ্য বিজনেস রিসার্চ কোম্পানির এক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল লেখার সরঞ্জাম ও স্টেশনারি বাজার ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অফিস সুবিধা কি একটি নিজস্ব ডেস্ক?
কলম-কাগজে ফেরার প্রবণতার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রকে নিজের মতো করে সাজানোর আগ্রহও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তরুণ কর্মীদের একটি অংশ এমন অফিস পছন্দ করছেন, যেখানে তাঁরা দীর্ঘ সময় একই জায়গায় বসতে পারেন এবং নিজের পছন্দের জিনিস সেখানে রাখতে পারেন।
একাধিক স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক চাকরির মধ্যে থাকা জেসি লেই তাঁর আগের কর্মস্থলের ডেস্কে পাঁচটি জাপানি কোকেশি পুতুল রেখেছিলেন। সবচেয়ে ছোট থেকে সবচেয়ে বড় করে সাজানো সেই পুতুলগুলোর পাশে ছিল পুরোনো একটি চায়ের কাপ, যেটি তাঁর ব্যক্তিগত চা রাখার জায়গায় পরিণত হয়েছিল।
কাছের অফিসের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পুতুলগুলোর ওপর পড়লে আলোর পরিবর্তনের ছবি তুলতেও তিনি মাঝে মাঝে থেমে যেতেন।
নিজের আঁকা বিভিন্ন ছবিও তিনি ডেস্কের আশপাশে রাখতেন। তাঁর মতে, নিজের হাতে তৈরি ছোট ছোট জিনিস অফিসে নিজের একটি চিহ্ন তৈরি করে এবং সেই জায়গায় তাঁর স্থিতিশীলতার অনুভূতি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
স্থায়ী ডেস্ক চাইছেন তরুণ কর্মীরা
সান ফ্রান্সিসকোয় অ্যানিমে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ক্রাঞ্চিরোলে কর্মরত ক্যালভিন লির কাছেও একটি স্থায়ী ডেস্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই অফিসে বারবার জায়গা বদলে বসার ব্যবস্থা বা অস্থায়ী ডেস্কের তুলনায় তিনি নিজের নির্দিষ্ট ডেস্ককে বেশি পছন্দ করেন।
অ্যানিমে ভক্ত লির কাছে নিজের জায়গা সাজানোর মধ্যে আনন্দ রয়েছে। তিনি এমন একটি কর্মপরিসর চান, যেখানে কাজের প্রয়োজনীয়তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ ও পছন্দও প্রকাশ পাবে।
তাঁর ডেস্ককে বলা যায় এক ধরনের সর্বোচ্চ সাজানো কর্মপরিসর। সেখানে রয়েছে পোকেমন চরিত্রের স্টিকি নোট, জেনশিন ইমপ্যাক্টের নকশা করা কলম, মার্ভেলের ছোট খেলনা, ল্যাপটপজুড়ে স্টিকার এবং ঠোঁটের মলম ও চোখের প্রয়োজনীয় ফোঁটার মতো ব্যবহারিক জিনিস।
লির মতে, অফিসের সবাই যখন নির্দিষ্ট ডেস্ক ব্যবহার করেন, তখন প্রত্যেকের জায়গা কীভাবে নিজের মতো করে সাজানো হয়েছে, সেটিও দেখতে ভালো লাগে।
শুধু সাজসজ্জা নয়, কাজের ধরন নিয়েও বার্তা
পশ্চিম মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও যোগাযোগবিষয়ক অধ্যাপক লিয়া এম. ওমিলিয়ন-হজেস মনে করেন, জেন জি কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে অনেক বেশি উদ্দেশ্যপূর্ণ ও সৎ মনোভাব নিয়ে আসছেন।
তাঁর মতে, সাজানো খাতা, স্টিকার এবং ব্যক্তিগতভাবে সাজানো ডেস্ককে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এর মাধ্যমে তরুণ কর্মীরা আসলে একটি কঠোর ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করছেন—যে কোনো কাজ করার জন্য একটি মাত্র সঠিক পদ্ধতি রয়েছে।
বরং তারা মনে করছেন, একই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার একাধিক পথ থাকতে পারে। কারও জন্য কম্পিউটারে লেখা সবচেয়ে কার্যকর, আবার অন্য কারও জন্য হাতে লেখা বেশি মনোযোগ ও স্মৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ, মানুষের হাতে কলম
কর্মক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সময়ে মানুষের হাতে কলম ও কাগজের প্রয়োজন পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না।
বরং ডিজিটাল কাজের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে খাতা, কলম, স্টিকি নোট এবং ব্যক্তিগত ডেস্ক নতুন অর্থ পাচ্ছে। এগুলো তরুণ কর্মীদের কাছে মনোযোগ ধরে রাখার উপায়, তথ্য মনে রাখার সহায়ক, সৃজনশীলতার জায়গা এবং কর্মক্ষেত্রে নিজের পরিচয় প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের অফিস হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পরিচালিত হবে, কিন্তু কম্পিউটার পর্দার সামনে বসে থাকা মানুষটির পাশে একটি খাতা, একটি কলম কিংবা একটি স্টিকি নোটের জায়গা থেকেই যেতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের হাতে লেখা অভ্যাসের এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু পুরোনো দিনের স্মৃতি নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ, ব্যক্তিত্ব ও মানবিক স্বস্তির নতুন প্রকাশ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও কেন কলম-কাগজে ফিরছে জেন জি?
জেন জি কর্মীদের মধ্যে আবার জনপ্রিয় হচ্ছে খাতা, কলম, হাতে লেখা নোট ও স্টিকি নোট। ডিজিটাল ক্লান্তি, মনোযোগ ধরে রাখা এবং নিজের কর্মপরিসরকে ব্যক্তিগত করে তোলার আকাঙ্ক্ষাই এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ। পুরো প্রতিবেদনটি পড়ুন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















