০৯:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা ৮৮০ বাগেরহাট হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সে আগুন, চালক আহত; পুড়ল ৯ মোটরসাইকেল মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যেই পরীক্ষা ফেডপ্রধান ওয়ারশের ‘গানের মাহাত্ম্য গায়কের চেয়েও বড়’: নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে উষা উত্থুপ মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যেই পরীক্ষা হবে ফেডপ্রধান ওয়ারশের নেতৃত্ব গালফের ভারতীয় প্রবাসীরা এখন শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না, গড়ছেন বৈশ্বিক সম্পদ পর্দাহীন গারমিন সিরকা: তথ্য দেবে, কিন্তু মনোযোগ কেড়ে নেবে না ড্রোন হামলা বন্ধ না হলে জাওয়িয়া তেল শোধনাগার বন্ধের হুঁশিয়ারি লিবিয়ার তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর: অন্তত তিস্তা চুক্তি তো আশা করতে পারে বাংলাদেশ নিখোঁজ রুশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদকে নিয়ে নীরব ইসরায়েল, মস্কোর জবাব চাওয়া

মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যেই পরীক্ষা হবে ফেডপ্রধান ওয়ারশের নেতৃত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে নিজের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু আগামী এক মাসে প্রকাশিতব্য দুটি মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদনই এখন তাঁর নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। এসব প্রতিবেদনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারে সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানো হবে, নাকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবে।

বুধবার প্রকাশিত হওয়ার কথা জুলাই মাসের ভোক্তা মূল্যসূচকের প্রতিবেদন। সেখানে মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকলে ওয়ারশের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে ফেডের নীতিনির্ধারকেরাও স্বস্তি পাবেন, কারণ সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিয়ে তাঁদের পূর্বাভাস সঠিক ছিল—এমন যুক্তি দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির তথ্য যদি শক্ত অবস্থান দেখায়, তাহলে ওয়ারশকে শুধু কঠোর বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর অঙ্গীকার প্রমাণ করতে হতে পারে।

২ শতাংশ লক্ষ্যের সামনে বড় পরীক্ষা

ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচক তৈরিতেও ভোক্তা মূল্যসূচকের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চলতি মাসের শেষ দিকে প্রকাশিতব্য ওই সূচকে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির উপাদান বাদ দিয়ে মূল মূল্যস্ফীতির চিত্র তুলে ধরা হয়।

অর্থনীতিবিদেরা আশা করছেন, জুলাইয়ে এই মূল ভোক্তা মূল্য ০ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে। মাসিক মূল্যবৃদ্ধি ০ দশমিক ২ শতাংশ বা তার নিচে থাকলে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যের দিকে ফিরছে—এমন ধারণা শক্তিশালী হবে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি হলে সেই আশাবাদ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ফেডের পছন্দের সূচকে জুন মাসে মূল মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এক বছর আগে একই হার ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যের তুলনায় যথেষ্ট বেশি।

Image

কেন মাসিক তথ্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে

সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির প্রতিটি মাসের তথ্য আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, ফেডের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জুনে প্রকাশিত পূর্বাভাস ও পরবর্তী বক্তব্যে বলেছিলেন, অতিরিক্ত কঠোর নীতি গ্রহণ না করেও মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত ২ শতাংশের লক্ষ্যে ফিরে আসতে পারে।

তাঁদের ধারণা ছিল, শুল্ক বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম একবার বাড়বে, এরপর সেই চাপ কমে যাবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমলে অপরিশোধিত তেলের দামও কমবে বলে তাঁরা আশা করেছিলেন।

কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি তাঁদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। এসব চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে প্রযুক্তি সরঞ্জাম ও সফটওয়্যারের দামও বাড়তে শুরু করেছে।

আগামী দুই মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য তাই দেখিয়ে দেবে, ফেড কর্মকর্তাদের আগের পূর্বাভাস এখনো কতটা টেকসই।

ওয়ারশের কঠোর অবস্থানই এখন তাঁর জন্য চাপ

মূল্যস্ফীতি কমানোকে নিজের নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান বিষয় বানিয়েছেন ওয়ারশ। ফলে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে এখন বাস্তব পদক্ষেপেরও সামঞ্জস্য দেখতে চাইছেন বিনিয়োগকারীরা।

গত মাসে ফেড সুদের হার অপরিবর্তিত রাখে। সিদ্ধান্তটি মোটামুটি প্রত্যাশিত হলেও, ওয়ারশ সংবাদ সম্মেলনে সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়।

মূল্যস্ফীতি কম না এলে সুদের হার বাড়ানোই সমাধান কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়ারশ বলেন, উচ্চ সুদের হার সমাধানের অংশ হতে পারে, তবে সম্ভবত সেটিই প্রধান সমাধান নয়। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় ফেডের কিছু কাজ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। এমনকি ফেডের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটি নতুনভাবে ভাবার ইঙ্গিতও দেন তিনি।

তাঁর এসব বক্তব্যে বাজারে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়নি যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে তিনি সুদের হার বাড়াতে প্রস্তুত কি না।

বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন সংশয়

ফেড চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পর দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদহার বেড়ে যায় এবং পরবর্তী সময়েও তা পুরোপুরি কমেনি। এর অর্থ হতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে কি না—এ নিয়ে বাজারে সংশয় তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, গত মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পেছনে ফেডের যথেষ্ট কারণ ছিল। শ্রমের ব্যয় উৎপাদনশীলতার তুলনায় ধীরে বাড়ছে। ফলে ব্যাপকভাবে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে শুল্কজনিত মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও ধীরে ধীরে কমে আসছে।

আর ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচকে পদ্ধতিগত কিছু পরিবর্তনের কারণে সেপ্টেম্বরের হিসাবে মূল মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা নিচে নেমে আসতে পারে।

সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানোর চাপ বাড়তে পারে

ফেডের ১৯ জন নীতিনির্ধারকের মধ্যে জুলাইয়ের বৈঠকের পর অন্তত ছয়জন সাম্প্রতিক সময়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি যথেষ্ট না কমলে তাঁরা ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে যেতে পারেন।

গত মাসের বৈঠকেই তিনজন নীতিনির্ধারক সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন। জুলাইয়ের বৈঠকের পর ১৯ জনের মধ্যে ১০ জন প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা ফেডের সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি কিছুটা বুঝতে পেরেছেন, যা ওয়ারশের সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট হয়নি।

এখন জুলাই ও আগস্ট—দুই মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্যই যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসে, তাহলে সেপ্টেম্বরে ওয়ারশের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তিনি সুদের হার বাড়াতে পারেন, অথবা অপরিবর্তিত রেখে আরও কয়েকজন নীতিনির্ধারকের ভিন্নমত মেনে নিতে পারেন।

সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলে গত মাসে তৈরি হওয়া বাজারের সংশয় আরও গভীর হতে পারে।

রাজনৈতিক চাপও রয়েছে

ওয়ারশের অবস্থান নিয়ে আরেকটি প্রশ্নও উঠেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি কি সত্যিই মনে করেন কঠোর বক্তব্য দিয়েই সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন বিলম্বিত করা সম্ভব? নাকি তাঁকে নিয়োগ দেওয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে তিনি সুদের হার বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন?

তবে ওয়ারশকে যারা কাছ থেকে চেনেন, তাঁরা উভয় ব্যাখ্যাই প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, গত মাসের সংবাদ সম্মেলনের পর তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি তাঁকে কোনো এক পর্যায়ে পরিষ্কার করতে হতে পারে। এ জন্য চলতি মাসের শেষ দিকে ওয়াইওমিংয়ের জ্যাকসন হোলে অনুষ্ঠিতব্য কানসাস সিটি ফেডের বার্ষিক সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জ্যাকসন হোলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন ওয়ারশ

বাজারের কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ওয়ারশকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়া কিছুটা অতিরঞ্জিত। বাজারভিত্তিক মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশার সূচকগুলো খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি।

তবে সাবেক ফেড ভাইস চেয়ারম্যান ডোনাল্ড কোহনের মতে, সংবাদ সম্মেলনের পর দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বেড়ে যাওয়া এবং স্বল্পমেয়াদি সুদের হার কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ফেডের জন্য আদর্শ নয়।

ওয়ারশ শুরু থেকেই ফেডের যোগাযোগের ধরন বদলাতে চেয়েছেন। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে কোন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী পদক্ষেপ নেবে, তা আগে থেকে বেশি স্পষ্ট করে দিলে বাজারের সঙ্গে ফেডের হাত-পা বাঁধা পড়ে যেতে পারে। বরং কম নির্দেশনা দিলে বাজার অর্থনীতি সম্পর্কে নিজের প্রত্যাশা আরও স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে।

কিন্তু এই পদ্ধতিরও ঝুঁকি রয়েছে। ফেড কী ভাবছে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা যদি পরিষ্কার না হয়, তাহলে পরে নিজেদের পূর্বাভাসের যথার্থতা যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

Image

দুই মাসের তথ্য বদলে দিতে পারে পুরো হিসাব

জুলাই ও আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্য যদি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকে, তাহলে ওয়ারশ আপাতত বড় চাপ থেকে মুক্তি পাবেন। সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে থাকা নীতিনির্ধারকদের অবস্থানও দুর্বল হবে। একই সঙ্গে জ্যাকসন হোলের সম্মেলনে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির তথ্যের চাপ ছাড়াই নিজের নীতিগত অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন তিনি।

কিন্তু মূল্যস্ফীতি যদি টানা শক্তিশালী থাকে, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। ফেডকে সুদের হার বাড়ানো অথবা বাজারের আস্থা আরও ঝুঁকির মুখে ফেলার মধ্যে একটি পথ বেছে নিতে হতে পারে।

এখানেই ওয়ারশের জন্য সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। তিনি নিজেই বলেছেন, নীতিনির্ধারণ যেন কোনো একটি মাসের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়। অথচ তাঁর নেতৃত্বের শুরুতেই পরপর দুটি মাসের মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর অসাধারণ প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।

ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষার ঝুঁকি

সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর ফেডের পরবর্তী বৈঠকটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই সময় নতুন করে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে কর্মকর্তারা রাজনৈতিক ও বাজারগত নানা ঝুঁকি বিবেচনা করতে পারেন।

ফলে সেপ্টেম্বরে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে গেলে পরবর্তী কার্যকর সুযোগ ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে। অর্থাৎ আরও কয়েক মাস ফেডকে এমন একটি মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা এরই মধ্যে নীতিনির্ধারকদের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে, আগামী দুই মাসের মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির গতিপথই দেখাবে না; এগুলো নতুন ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশের নেতৃত্ব, যোগাযোগ কৌশল এবং মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে বাস্তবে কতটা কঠোর হতে পারেন—তারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা ৮৮০

মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যেই পরীক্ষা হবে ফেডপ্রধান ওয়ারশের নেতৃত্ব

০৭:৫৭:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে নিজের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু আগামী এক মাসে প্রকাশিতব্য দুটি মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদনই এখন তাঁর নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। এসব প্রতিবেদনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারে সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানো হবে, নাকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবে।

বুধবার প্রকাশিত হওয়ার কথা জুলাই মাসের ভোক্তা মূল্যসূচকের প্রতিবেদন। সেখানে মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকলে ওয়ারশের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে ফেডের নীতিনির্ধারকেরাও স্বস্তি পাবেন, কারণ সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিয়ে তাঁদের পূর্বাভাস সঠিক ছিল—এমন যুক্তি দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির তথ্য যদি শক্ত অবস্থান দেখায়, তাহলে ওয়ারশকে শুধু কঠোর বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর অঙ্গীকার প্রমাণ করতে হতে পারে।

২ শতাংশ লক্ষ্যের সামনে বড় পরীক্ষা

ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচক তৈরিতেও ভোক্তা মূল্যসূচকের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চলতি মাসের শেষ দিকে প্রকাশিতব্য ওই সূচকে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির উপাদান বাদ দিয়ে মূল মূল্যস্ফীতির চিত্র তুলে ধরা হয়।

অর্থনীতিবিদেরা আশা করছেন, জুলাইয়ে এই মূল ভোক্তা মূল্য ০ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে। মাসিক মূল্যবৃদ্ধি ০ দশমিক ২ শতাংশ বা তার নিচে থাকলে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যের দিকে ফিরছে—এমন ধারণা শক্তিশালী হবে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি হলে সেই আশাবাদ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ফেডের পছন্দের সূচকে জুন মাসে মূল মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এক বছর আগে একই হার ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যের তুলনায় যথেষ্ট বেশি।

Image

কেন মাসিক তথ্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে

সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির প্রতিটি মাসের তথ্য আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, ফেডের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জুনে প্রকাশিত পূর্বাভাস ও পরবর্তী বক্তব্যে বলেছিলেন, অতিরিক্ত কঠোর নীতি গ্রহণ না করেও মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত ২ শতাংশের লক্ষ্যে ফিরে আসতে পারে।

তাঁদের ধারণা ছিল, শুল্ক বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম একবার বাড়বে, এরপর সেই চাপ কমে যাবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমলে অপরিশোধিত তেলের দামও কমবে বলে তাঁরা আশা করেছিলেন।

কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি তাঁদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। এসব চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে প্রযুক্তি সরঞ্জাম ও সফটওয়্যারের দামও বাড়তে শুরু করেছে।

আগামী দুই মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য তাই দেখিয়ে দেবে, ফেড কর্মকর্তাদের আগের পূর্বাভাস এখনো কতটা টেকসই।

ওয়ারশের কঠোর অবস্থানই এখন তাঁর জন্য চাপ

মূল্যস্ফীতি কমানোকে নিজের নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান বিষয় বানিয়েছেন ওয়ারশ। ফলে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে এখন বাস্তব পদক্ষেপেরও সামঞ্জস্য দেখতে চাইছেন বিনিয়োগকারীরা।

গত মাসে ফেড সুদের হার অপরিবর্তিত রাখে। সিদ্ধান্তটি মোটামুটি প্রত্যাশিত হলেও, ওয়ারশ সংবাদ সম্মেলনে সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়।

মূল্যস্ফীতি কম না এলে সুদের হার বাড়ানোই সমাধান কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়ারশ বলেন, উচ্চ সুদের হার সমাধানের অংশ হতে পারে, তবে সম্ভবত সেটিই প্রধান সমাধান নয়। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় ফেডের কিছু কাজ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। এমনকি ফেডের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটি নতুনভাবে ভাবার ইঙ্গিতও দেন তিনি।

তাঁর এসব বক্তব্যে বাজারে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়নি যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে তিনি সুদের হার বাড়াতে প্রস্তুত কি না।

বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন সংশয়

ফেড চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পর দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদহার বেড়ে যায় এবং পরবর্তী সময়েও তা পুরোপুরি কমেনি। এর অর্থ হতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে কি না—এ নিয়ে বাজারে সংশয় তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, গত মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পেছনে ফেডের যথেষ্ট কারণ ছিল। শ্রমের ব্যয় উৎপাদনশীলতার তুলনায় ধীরে বাড়ছে। ফলে ব্যাপকভাবে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে শুল্কজনিত মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও ধীরে ধীরে কমে আসছে।

আর ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচকে পদ্ধতিগত কিছু পরিবর্তনের কারণে সেপ্টেম্বরের হিসাবে মূল মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা নিচে নেমে আসতে পারে।

সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানোর চাপ বাড়তে পারে

ফেডের ১৯ জন নীতিনির্ধারকের মধ্যে জুলাইয়ের বৈঠকের পর অন্তত ছয়জন সাম্প্রতিক সময়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি যথেষ্ট না কমলে তাঁরা ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে যেতে পারেন।

গত মাসের বৈঠকেই তিনজন নীতিনির্ধারক সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন। জুলাইয়ের বৈঠকের পর ১৯ জনের মধ্যে ১০ জন প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা ফেডের সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি কিছুটা বুঝতে পেরেছেন, যা ওয়ারশের সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট হয়নি।

এখন জুলাই ও আগস্ট—দুই মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্যই যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসে, তাহলে সেপ্টেম্বরে ওয়ারশের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তিনি সুদের হার বাড়াতে পারেন, অথবা অপরিবর্তিত রেখে আরও কয়েকজন নীতিনির্ধারকের ভিন্নমত মেনে নিতে পারেন।

সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলে গত মাসে তৈরি হওয়া বাজারের সংশয় আরও গভীর হতে পারে।

রাজনৈতিক চাপও রয়েছে

ওয়ারশের অবস্থান নিয়ে আরেকটি প্রশ্নও উঠেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি কি সত্যিই মনে করেন কঠোর বক্তব্য দিয়েই সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন বিলম্বিত করা সম্ভব? নাকি তাঁকে নিয়োগ দেওয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে তিনি সুদের হার বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন?

তবে ওয়ারশকে যারা কাছ থেকে চেনেন, তাঁরা উভয় ব্যাখ্যাই প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, গত মাসের সংবাদ সম্মেলনের পর তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি তাঁকে কোনো এক পর্যায়ে পরিষ্কার করতে হতে পারে। এ জন্য চলতি মাসের শেষ দিকে ওয়াইওমিংয়ের জ্যাকসন হোলে অনুষ্ঠিতব্য কানসাস সিটি ফেডের বার্ষিক সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জ্যাকসন হোলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন ওয়ারশ

বাজারের কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ওয়ারশকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়া কিছুটা অতিরঞ্জিত। বাজারভিত্তিক মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশার সূচকগুলো খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি।

তবে সাবেক ফেড ভাইস চেয়ারম্যান ডোনাল্ড কোহনের মতে, সংবাদ সম্মেলনের পর দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বেড়ে যাওয়া এবং স্বল্পমেয়াদি সুদের হার কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ফেডের জন্য আদর্শ নয়।

ওয়ারশ শুরু থেকেই ফেডের যোগাযোগের ধরন বদলাতে চেয়েছেন। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে কোন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী পদক্ষেপ নেবে, তা আগে থেকে বেশি স্পষ্ট করে দিলে বাজারের সঙ্গে ফেডের হাত-পা বাঁধা পড়ে যেতে পারে। বরং কম নির্দেশনা দিলে বাজার অর্থনীতি সম্পর্কে নিজের প্রত্যাশা আরও স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে।

কিন্তু এই পদ্ধতিরও ঝুঁকি রয়েছে। ফেড কী ভাবছে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা যদি পরিষ্কার না হয়, তাহলে পরে নিজেদের পূর্বাভাসের যথার্থতা যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

Image

দুই মাসের তথ্য বদলে দিতে পারে পুরো হিসাব

জুলাই ও আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্য যদি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকে, তাহলে ওয়ারশ আপাতত বড় চাপ থেকে মুক্তি পাবেন। সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে থাকা নীতিনির্ধারকদের অবস্থানও দুর্বল হবে। একই সঙ্গে জ্যাকসন হোলের সম্মেলনে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির তথ্যের চাপ ছাড়াই নিজের নীতিগত অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন তিনি।

কিন্তু মূল্যস্ফীতি যদি টানা শক্তিশালী থাকে, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। ফেডকে সুদের হার বাড়ানো অথবা বাজারের আস্থা আরও ঝুঁকির মুখে ফেলার মধ্যে একটি পথ বেছে নিতে হতে পারে।

এখানেই ওয়ারশের জন্য সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। তিনি নিজেই বলেছেন, নীতিনির্ধারণ যেন কোনো একটি মাসের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়। অথচ তাঁর নেতৃত্বের শুরুতেই পরপর দুটি মাসের মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর অসাধারণ প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।

ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষার ঝুঁকি

সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর ফেডের পরবর্তী বৈঠকটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই সময় নতুন করে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে কর্মকর্তারা রাজনৈতিক ও বাজারগত নানা ঝুঁকি বিবেচনা করতে পারেন।

ফলে সেপ্টেম্বরে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে গেলে পরবর্তী কার্যকর সুযোগ ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে। অর্থাৎ আরও কয়েক মাস ফেডকে এমন একটি মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা এরই মধ্যে নীতিনির্ধারকদের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে, আগামী দুই মাসের মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির গতিপথই দেখাবে না; এগুলো নতুন ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশের নেতৃত্ব, যোগাযোগ কৌশল এবং মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে বাস্তবে কতটা কঠোর হতে পারেন—তারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে।