সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সোনার গয়নার বাজারে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরতে পারে। বিয়ে, নবরাত্রি, দীপাবলি, বড়দিন ও নতুন বছরের উৎসব সামনে রেখে গয়নার চাহিদা বাড়ার প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে শীতের মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে দুবাইসহ দেশটির বিভিন্ন স্বর্ণবাজারে ক্রেতার আনাগোনা আরও বাড়তে পারে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মতে, উৎসব ও বিয়ের মৌসুম ঐতিহ্যগতভাবেই গয়না কেনার বড় সময়। এ বছরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বছরের শেষভাগে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় উৎসব থাকায় উপহার, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং বিয়ের জন্য স্বর্ণালংকার কেনার প্রবণতা বাড়তে পারে।
উৎসব ও বিয়ের মৌসুমে বাড়বে চাহিদা
মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডসের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামলাল আহমেদ বলেন, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে গয়নার চাহিদা বাড়াতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নবরাত্রি, দীপাবলি, বড়দিন ও নতুন বছরের মতো বড় উৎসবের পাশাপাশি বিয়ের মৌসুমও বাজারে ক্রেতা টানবে।
তিনি বলেন, শীতল আবহাওয়া ও বছরের শেষের ছুটিকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পর্যটকের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটকদের কেনাকাটা, উপহার দেওয়া এবং উৎসব ও বিয়েকেন্দ্রিক গয়না কেনার কারণে বাজারে চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
দুবাইয়ের স্বর্ণবাজার এমনিতেই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়। তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দাম, করমুক্ত কেনাকাটার সুবিধা এবং দক্ষ কারিগরদের তৈরি নকশা—সব মিলিয়ে শহরটি বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের গয়না কেনার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে আছে।
দাম স্থিতিশীল হলে ফিরবে আস্থা
স্বর্ণের দামের ওঠানামা গত কিছুদিন ধরে ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেললেও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দাম স্থিতিশীল হলে বাজারে আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
সাম্প্রতিক হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৩৪২ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের তুলনায় ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। দুবাইয়ে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি গ্রামে ৫২৩ দশমিক ২৫ দিরহাম এবং ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ৪৮৪ দশমিক ৫০ দিরহামে অবস্থান করছে।
জয়ালুক্কাস জুয়েলারির প্রধান নির্বাহী জন পল আলুক্কাস বলেন, বছরের দ্বিতীয়ার্ধ সাধারণত গয়না ব্যবসার জন্য শক্তিশালী সময়। বিয়ে, উৎসব ও বছরের শেষের উদযাপন স্বাভাবিকভাবেই এই সময়ে গয়নার চাহিদা বাড়ায়।
তার ভাষায়, ক্রেতারা ইতোমধ্যে আসন্ন উৎসবের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন এবং বাজারে নতুন করে আগ্রহের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ক্রেতাদের দোকানে ফিরিয়ে আনতে বাড়তি সুবিধা, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং পুরোনো গয়না বদলের নমনীয় নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি জানান, গয়না কেনাকে আরও সহজলভ্য করতে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন প্রচারমূলক সুবিধা, নমনীয় কিস্তি ব্যবস্থা এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক নকশার সমন্বয়ে নতুন সংগ্রহ নিয়ে কাজ করছে। তার মতে, ক্রেতাদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরছে, ফলে আগামী মাসগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীরা আশাবাদী।
পর্যটকের ভিড়েও বাড়বে বিক্রি
কানজ জুয়েলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিল ধানাকও একই ধরনের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। তার মতে, উৎসব ও বিয়ের মৌসুমের পাশাপাশি বছরের শেষভাগের পর্যটন ও ছুটির কেনাকাটা স্বর্ণের গয়নার বাজারকে শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি বলেন, স্বর্ণের দাম যদি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে, তাহলে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে এবং আরও মানুষ গয়না কিনতে বাজারে ফিরবেন। এই অঞ্চলে স্বর্ণ শুধু একটি মূল্যবান পণ্য নয়, এর সঙ্গে আবেগ ও পারিবারিক ঐতিহ্যও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই স্বল্পমেয়াদে দামের ওঠানামা কেনাকাটার ধরন বদলালেও দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের গয়নার চাহিদার ভিত্তি শক্তিশালী থাকবে।
বাফলে জুয়েলার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিরাগ ভোরাও মনে করেন, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে গয়নার বাজার প্রথমার্ধের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে।
তার মতে, উৎসবের ধারাবাহিকতা, বিয়ের মৌসুম এবং পর্যটকের বাড়তি আগমন সংযুক্ত আরব আমিরাতজুড়ে গয়নার দোকানগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি বাড়াবে। স্বর্ণের দাম স্থিতিশীল হলে কিংবা কিছুটা কমলে ক্রেতাদের আস্থা আরও বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ীদের ধারণা, নতুন নকশার গয়না, আকর্ষণীয় বদলি সুবিধা এবং বাড়তি মূল্যসংযোজনমূলক অফার দিতে পারা প্রতিষ্ঠানগুলোই এই সম্ভাব্য বাজারচাঙ্গার সবচেয়ে বেশি সুফল পাবে।
সব মিলিয়ে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে দুবাইয়ের স্বর্ণবাজারে উৎসব, বিয়ে ও পর্যটনের মিলিত ঢেউ ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনতে পারে। দাম যদি কিছুটা স্থির থাকে, তাহলে সেই ঢেউ আরও জোরালো হয়ে স্বর্ণের গয়নার বাজারে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বর্ণবাজারে তাই সামনে এখন শুধু উৎসবের আলো নয়, ব্যবসায়ীদের চোখে সম্ভাব্য বিক্রিবৃদ্ধিরও ঝলক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















