স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর সারাক্ষণ অনলাইনে থাকার অভ্যাস থেকে একটু দূরে সরে যেতে চাইছে তরুণ প্রজন্ম। আর সেই চাওয়াই এবার তৈরি করেছে নতুন এক জীবনধারা—‘অ্যানালগ ব্যাগ’। বই, ডায়েরি, ধাঁধার খাতা, রঙ-তুলি, সেলাইয়ের সরঞ্জাম কিংবা ছোট কোনো খেলনা—অনলাইনের বাইরে বাস্তব জীবনে সময় কাটানোর নানা উপকরণ নিয়ে তৈরি হচ্ছে এসব ব্যাগ।
তরুণদের মধ্যে এখন উল্টো দিকে হাঁটার এক ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ স্মার্টফোনের বদলে পুরোনো ধরনের মুঠোফোন ব্যবহার করছেন, কেউ হাতে লিখছেন ডায়েরি, কেউ আবার চিঠি লিখছেন বন্ধুদের। সূচিকর্ম, বুনন, কাগজের কাজ, ছবি আঁকা ও বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজও নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ব্যাগে থাকছে অনলাইন দুনিয়ার বিকল্প
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ২৫ বছর বয়সী ক্যাটলিন কাসলার নিজের অ্যানালগ ব্যাগকে এক ধরনের চলমান ছোট্ট জগত হিসেবে দেখেন। তাঁর ব্যাগে রয়েছে গোলাপি ভ্রমণ মাহজং সেট, ধাঁধা, কাগজের দিনপঞ্জি রাখার খাতা, চামড়ার বাঁধানো নোটবুক, রান্নার বই, সুডোকু এবং রহস্যভিত্তিক ধাঁধার বই।
কাসলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর অভ্যাস কমাতে বছরের শুরুতে এই ব্যাগ তৈরি করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল অবসর পেলেই মুঠোফোন হাতে নেওয়ার বদলে এমন কিছু করা, যা তাঁকে বাস্তব জীবনের কোনো কাজে মনোযোগী রাখবে।
তিনি মনে করেন, অনলাইনে ক্রমাগত নতুন নতুন বিষয় দেখতে দেখতে মানুষ খুব সহজেই নিজের সময় হারিয়ে ফেলতে পারে। তাই বই পড়া, ধাঁধা সমাধান বা কোনো শখের কাজে মন দেওয়া তাঁকে সেই অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করছে।
ফ্যাশনেও এসেছে ‘অফলাইনের’ ছোঁয়া
অ্যানালগ ব্যাগ শুধু শখের উপকরণ বহনের মাধ্যম নয়, এটি এখন তরুণদের ফ্যাশনেরও অংশ হয়ে উঠেছে। নানা নকশার কাপড়ের ব্যাগে ঝুলছে পুঁতির অলংকার, নরম খেলনা ও ছোট ছোট শৌখিন সামগ্রী। অনেকেই ব্যাগে নিজের নাম, আদ্যক্ষর কিংবা আত্মযত্নের মতো বার্তা সেলাই করে দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে একটি জনপ্রিয় ক্যানভাসের নৌকাভ্রমণধাঁচের ব্যাগ এই প্রবণতার সবচেয়ে পছন্দের বাহন হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এসব ব্যাগের বিক্রি ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বসন্ত মৌসুমেই এর সবচেয়ে ভালো বিক্রির মাস দেখা গেছে।
নিউইয়র্কের ২৯ বছর বয়সী জুলিয়া লাকায়োকে তাঁর বন্ধুরা জন্মদিনে নিজের নাম লেখা এমন একটি ব্যাগ উপহার দেন। তিনি এতে রাখেন ডায়েরি, চশমা, কানে শোনার যন্ত্র, রোদ প্রতিরোধের সামগ্রী, ঠোঁটের প্রসাধনী ও একটি বই।
লাকায়ো বলেন, বাড়িতে বসে বই পড়তে গেলে মুঠোফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তাই তিনি পার্কে বা কোনো পানশালায় গিয়ে বই পড়তে পছন্দ করেন। এতে বইয়ের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই অফলাইনের প্রচার
এই প্রবণতার সবচেয়ে মজার দিক হলো—অনলাইনের আসক্তি কমানোর আন্দোলনের প্রচারও হচ্ছে অনলাইনেই। তরুণরা নিজেদের অ্যানালগ ব্যাগের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন। ‘আমার অ্যানালগ ব্যাগে কী আছে’ ধরনের ভিডিওতে নানা সাজসজ্জা, নড়াচড়া করা লেখা ও শব্দের ব্যবহার করে বিপুল দর্শকও তৈরি হচ্ছে।
এই প্রবণতার নামটি জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব দেওয়া হয় কনটেন্ট নির্মাতা সিয়েরা ক্যাম্পবেলকে। গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি পর্দায় কাটানো সময় কমানোর নানা উপায় নিয়ে কথা বলার সময় অ্যানালগ ব্যাগের ধারণাটি তুলে ধরেন। এরপর ধীরে ধীরে এটি তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে কাসলারের কাছে এই বৈপরীত্য খুব একটা সমস্যা নয়। তাঁর মতে, অনলাইনেই পরিচিত হওয়া বন্ধুদের সঙ্গে বই, ধাঁধা কিংবা নতুন কোনো শখ নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহারকে অন্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই এখানে মূল বিষয়।
পুরোনো জিনিসের প্রতি নতুন টান
তরুণদের মধ্যে শুধু অ্যানালগ ব্যাগ নয়, পুরোনো দিনের নানা প্রযুক্তি ও অভ্যাসের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। স্মার্টফোনের বদলে অনেকে ভাঁজ করা পুরোনো ধরনের মুঠোফোন ব্যবহার করছেন। পুরোনো তারযুক্ত ফোন, গান শোনার পুরোনো যন্ত্র এবং তাৎক্ষণিক ছবি তোলার ক্যামেরার চাহিদাও বাড়ছে।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পুরোনো ধরনের মুঠোফোন খোঁজার ওয়েবসাইটে মানুষের যাতায়াত প্রায় ১২ গুণ বেড়েছে। একই সময়ে পুরোনো ধাঁচের গান শোনার যন্ত্রের বিক্রি ১১১ শতাংশ এবং তাৎক্ষণিক ছবি তোলার ক্যামেরার বিক্রি ১৫৭ শতাংশ বেড়েছে বলে একটি বাজার গবেষণায় উঠে এসেছে।
চিঠি লেখার প্রতিও ফিরছে আগ্রহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি জনপ্রিয় ছবির প্ল্যাটফর্মের ২০২৬ সালের পূর্বাভাসে দেখা গেছে, ‘ডাকযোগে চিঠি বা উপহার’ সম্পর্কিত খোঁজ ১১০ শতাংশ বেড়েছে।

মহামারির পর বদলেছে তরুণদের ভাবনা
তরুণদের পর্দা-নির্ভর জীবন নিয়ে উদ্বেগ গত কয়েক বছরে আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। করোনাভাইরাস মহামারির পর একাকীত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুঠোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে পুরোনো দিনের প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়াও তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কমে যাওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বদলে যাওয়া চাকরির বাজার তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন করছে।
নস্টালজিয়া নিয়ে গবেষণা করা মনোবিজ্ঞানী ক্লে রাউটলেজের মতে, তরুণরা এমন এক সময়ের কথা ভাবছেন যখন মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ছিল তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক ও সরাসরি। তাই অতীতের জিনিসগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা আসলে শুধু পুরোনো বস্তু ব্যবহারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই সময়ের জীবনযাপন ও মানসিকতার প্রতি আকর্ষণ।
প্রযুক্তিকে বাদ নয়, নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা
নিউইয়র্কের ২৬ বছর বয়সী পেটন মাডার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন না। তাঁর হাতে রয়েছে নকিয়া ব্র্যান্ডের একটি ভাঁজ করা মুঠোফোন। তিনি বুঝতেই পারেননি যে নিজের জীবনযাপনের মাধ্যমে তিনি একটি নতুন প্রবণতার অংশ হয়ে উঠেছেন।

তাঁর অ্যানালগ ব্যাগে রয়েছে কাগজের দিনপঞ্জি, দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণ লেখার খাতা এবং বিভিন্ন ছোটখাটো শৌখিন জিনিস। এক সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের একটি মুঠোফোনমুক্ত অনুষ্ঠানে তাঁর ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আসে হাতে তৈরি ছোট্ট একটি খেলনা প্রাণী।
মাডারের কাছে বিষয়টি আনন্দের যে অনেক তরুণ নিজেরাই আলাদা আলাদাভাবে একই ধরনের জীবনযাপনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানী রাউটলেজ মনে করেন, অতীতের প্রতি এই আকর্ষণ তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিও দিতে পারে। পুরোনো দিনের কিছু অভ্যাস তাদের জীবনে অর্থবোধ, নিয়ন্ত্রণ ও আশাবাদ ফিরিয়ে আনতে পারে।
অ্যানালগ প্রবণতার মূল কথা তাই প্রযুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা নয়। বরং প্রযুক্তি যেন মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ না করে, সে বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া। তরুণ প্রজন্ম হয়তো স্মার্টফোন পুরোপুরি ছাড়ছে না, কিন্তু তারা ক্রমেই বুঝতে চাইছে—কখন পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে বইয়ের পাতায়, ডায়েরির লেখায় কিংবা কোনো বাস্তব শখের দিকে ফিরে যেতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















