যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের যুদ্ধকবলিত বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোপন সফর নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে তুরস্ক থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক গোপন বিমান বদলের ঘটনা সেই পুরোনো রীতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ৮ জুলাই ন্যাটো সম্মেলন শেষে তুরস্ক ছাড়ার সময় ট্রাম্পকে মূল প্রেসিডেন্টের বিমানের বদলে একটি ছোট সরকারি বিমানে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে নেওয়া এই পদক্ষেপে এমনকি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা অনেক কর্মকর্তা ও সাংবাদিকও শুরুতে বিষয়টি জানতে পারেননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে একটি খাবার সরবরাহকারী গাড়ির মাধ্যমে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে নেওয়া হয়েছিল। বাইরে থেকে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, যাতে মনে হয় তিনি আগের বিমানেই রয়েছেন। পরে জানা যায়, তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে ট্রাম্প অন্য একটি সরকারি বিমানে যাত্রা করেছিলেন। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা।
কেন এত গোপনীয়তা
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঝুঁকিপূর্ণ সফরের ক্ষেত্রে সাধারণত হোয়াইট হাউসের অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা ও নির্বাচিত সাংবাদিককে আগেই জানানো হয়। তাঁদের কঠোরভাবে গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রয়োজন হলে কেউ সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।

কিন্তু ট্রাম্পের তুরস্ক ছাড়ার ঘটনাটি ছিল আরও কঠোর গোপনীয়তায় মোড়া। তাঁর সঙ্গে থাকা অনেক কর্মকর্তা, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সাংবাদিকদের একটি অংশ বুঝতেই পারেননি যে তাঁরা যে বিমানে আছেন, সেটি কার্যত একটি বিভ্রান্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের নিরাপত্তার জন্য পরিস্থিতিটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পও জানান, তিনি গোপন সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিমান বদল করেছিলেন এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নির্দেশ অনুসরণ করেছিলেন।
২০০৩ সালে বুশের গোপন বাগদাদ সফর
গোপন প্রেসিডেন্ট সফরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল ২০০৩ সালে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের সময় ইরাকের বাগদাদে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন।
ওই সময় হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছিল, বুশ তাঁর টেক্সাসের খামারবাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের খাবার উপভোগ করবেন। এমনকি খাবারের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বুশ তখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটির দিকে যাচ্ছিলেন।
প্রথমে তাঁকে গোপনে ওয়াশিংটনের কাছে অ্যান্ড্রুজ ঘাঁটিতে নেওয়া হয়। এরপর আলো নিভিয়ে এবং বিমানের জানালার পর্দা বন্ধ রেখে তিনি অন্য একটি বিমানে বাগদাদের উদ্দেশে রওনা হন। সাংবাদিকদের বৈদ্যুতিন যন্ত্র সাময়িকভাবে নিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যাতে সফরের খবর বাইরে না যায়।
সফরের বিষয়ে আগে থেকেই সীমিতসংখ্যক সাংবাদিককে জানানো হয়েছিল এবং সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল—তথ্য ফাঁস হলে বিমান মাঝপথে ঘুরিয়ে দেওয়া হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোনো তথ্য ফাঁস হয়নি। বিমান নিরাপদ এলাকায় ফিরে আসার পরই বুশের বাগদাদ সফরের খবর প্রকাশ করা হয়।
:max_bytes(150000):strip_icc():focal(999x0:1001x2)/bill-clinton-pakistan-81226-39e473d7f90c49c9ac28770cdd3d8aec.jpg)
ভারত থেকে পাকিস্তানে ক্লিনটনের গোপন বিমান বদল
২০০০ সালে বিল ক্লিনটনের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার কারণে বিমান বদলের ঘটনা ঘটেছিল। ভারত সফর শেষে তাঁর পাকিস্তানে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল উত্তেজনাপূর্ণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও ছিল।
ক্লিনটনকে বহনকারী বিমান সরাসরি পাকিস্তানে না গিয়ে একটি সামরিক ঘাঁটিতে যায়। সেখানে বড় একটি সামরিক বিমানের আড়ালে রাখা ছোট দুটি বিমানের দিকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি ছিল সাদা রঙের, কোনো পরিচিত চিহ্ন ছিল না। অন্যটিতে ছিল এয়ার ফোর্স ওয়ানের পরিচিত চিহ্ন।
ক্লিনটন শেষ পর্যন্ত চিহ্নহীন সাদা বিমানটিতে ওঠেন এবং সেটিতেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যান। উদ্দেশ্য ছিল তাঁর প্রকৃত যাত্রাপথ ও পরিচয় গোপন রেখে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানো।
আফগানিস্তানে ওবামার আকস্মিক সফর
২০১৪ সালের স্মরণ দিবসে বারাক ওবামা আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটিতে আকস্মিক সফর করেন। এটি ছিল আফগানিস্তানে তাঁর চতুর্থ সফর।
সফরটি কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রস্তুত করা হলেও তাঁর সেখানে যাওয়ার খবর গোপন রাখা হয়েছিল। যাত্রার মাত্র কয়েক দিন আগে সীমিতসংখ্যক সাংবাদিককে সঙ্গে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
সেনাদের সামনে গিয়ে ওবামা রসিকতা করে বলেছিলেন, তিনি কাছাকাছি এলাকায় ছিলেন এবং ভাবলেন একবার দেখা করে যাওয়া যাক। প্রায় তিন হাজার মার্কিন সেনার সামনে তাঁর এই উপস্থিতি ছিল মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করা সেনাদের প্রতি সমর্থন জানানোর একটি প্রতীকী বার্তা।

ইরাকে ট্রাম্পের আকস্মিক সফর
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পও এর আগে গোপন সফরের নজির রেখেছেন। ২০১৮ সালের বড়দিনে তিনি স্ত্রী মেলানিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ইরাকে মার্কিন সেনাদের দেখতে যান।
সেটি ছিল তাঁর প্রথম কোনো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সফর। এর কয়েক দিন আগেই তিনি প্রতিবেশী সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফলে ইরাক সফরটি রাজনৈতিক ও সামরিক—দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
এবার কেন ট্রাম্পের ঘটনা আলাদা
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের গোপন সফরের ইতিহাসে নিরাপত্তার স্বার্থে তথ্য গোপন রাখা নতুন নয়। তবে তুরস্কের ঘটনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে কারণ এখানে শুধু সফরের গন্তব্য নয়, প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থানও গোপন রাখা হয়েছিল।
সাংবাদিক ও সফরসঙ্গীদের একটি অংশ এমন একটি বিমানে ছিলেন, যেটিকে কার্যত বিভ্রান্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাজ্যে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিলভাবে সাজানো হয়, যাতে ট্রাম্পকে আবার আগের বিমানের যাত্রী হিসেবে দেখা যায়।

এই কারণেই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের জানার অধিকার, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় হওয়া উচিত।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের গোপন সফরের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের গোপন বিমান বদল ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি অভিযান। নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা এই বিভ্রান্তিমূলক কৌশল এখন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা, সামরিক ঝুঁকি এবং হোয়াইট হাউসের স্বচ্ছতা—তিনটি বিষয়কেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের গোপন সফর, ট্রাম্পের তুরস্ক থেকে গোপন বিমান বদল এবং অতীতের বুশ, ক্লিনটন ও ওবামার ঝুঁকিপূর্ণ সফর—সবকিছু মিলিয়ে ইতিহাস বলছে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় গোপনীয়তা অনেক পুরোনো কৌশল। কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই কৌশলকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















