দেশের উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অস্ত্রোপচার কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ৩৪৪টিতেই রোগীদের অস্ত্রোপচার বন্ধ। অর্থাৎ প্রায় ৭৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার থাকলেও সেখানে অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। কোথাও কয়েক মাস, আবার কোথাও কয়েক বছর ধরে অপারেশন থিয়েটারে তালা ঝুলছে।
জনবল সংকটেই অচল ওটি
অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকার প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের সংকট। এর সঙ্গে রয়েছে সার্জারি ও গাইনি বিশেষজ্ঞের ঘাটতি, ওটি সহকারী ও কারিগরি জনবলের অভাব এবং প্রয়োজনীয় ওষুধসামগ্রীর সংকট। আবার কোনো কোনো হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়িত থাকলেও সংযুক্তির কারণে তাঁরা অন্য প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ৬৯ হাজার ১১৭টি জনবলের পদের মধ্যে ২৫ হাজার ৮৬টি পদই শূন্য। উপজেলা পর্যায়েও এ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে অস্ত্রোপচারসেবায়।
অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট সবচেয়ে বড় সংকট

দেশের ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট আছেন মাত্র ১৪২ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের প্রায় ৭০ শতাংশই খালি। দেশে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার হলেও সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যুক্ত আছেন প্রায় এক হাজার।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, একজন সার্জনের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ০ দশমিক ৩৭ জন। প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের সংখ্যা গড়ে ০ দশমিক ৪৫ জন। অন্যদিকে প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সার্জন রয়েছেন ১ দশমিক ২২ জন এবং ল্যাব টেকনিশিয়ান মাত্র ০ দশমিক ১৭ জন।
ফলে সার্জন ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের অভাবে নিরাপদ অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। একটি জনবলের ঘাটতিতেই পুরো অপারেশন থিয়েটার অচল হয়ে পড়ছে।
ডায়াগনস্টিক সেবাতেও ঘাটতি
শুধু অস্ত্রোপচার নয়, উপজেলা পর্যায়ের অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাতেও রয়েছে বড় ঘাটতি। ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ১০১টিতে এক্স-রে সুবিধা নেই। ১৯৬টিতে আলট্রাসনোগ্রাম করা হয় না এবং ৭০টিতে ইসিজি সেবা নেই।
এর ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, অপারেশন থিয়েটার ও কেনা মূল্যবান যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে অস্ত্রোপচারের সুযোগ না থাকায় রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয়, ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।
মাঠপর্যায়ে একই চিত্র
শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১১ জন। নেই সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ। ৩১ শয্যার হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও অস্ত্রোপচারসেবা চালু হয়নি।

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় তিন বছর ধরে সিজারিয়ানসহ সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ। অ্যানেস্থেসিয়া, গাইনি ও সার্জারি কনসালট্যান্ট না থাকাই এর কারণ। ১৮ জন মেডিক্যাল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সাত-আট মাস ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ। ৪১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৫ জন। গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন থাকলেও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট না থাকায় সিজারিয়ান, অ্যাপেনডিক্স ও হার্নিয়ার মতো অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না। অপারেশন থিয়েটারে তালা ঝুলছে, পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি।
মেহেরপুরে জনবল ব্যবস্থাপনার সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট। জেলার জেনারেল হাসপাতাল এবং মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানের অস্ত্রোপচারসেবা কার্যত একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গত ১৯ জুন তাঁকে চুয়াডাঙ্গা জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হলে তিনটি প্রতিষ্ঠানেই অস্ত্রোপচার বন্ধ হয়ে যায়।
সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চিকিৎসক নিয়োগ বা নতুন ভবন নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার বন্ধের কারণ চিহ্নিত করে চিকিৎসক, অ্যানেস্থেটিস্ট, যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও সহায়ক জনবলের সমন্বিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁদের মতে, উপজেলা পর্যায়ে নিরাপদে করা সম্ভব এমন ছোট ও মাঝারি অস্ত্রোপচার, সিজারিয়ান এবং চোখ ও নাক-কান-গলার সাধারণ অস্ত্রোপচার দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিটি ওটি কত দিন ধরে বন্ধ, কেন বন্ধ এবং কবে নাগাদ চালু হবে—তার প্রকাশ্য তালিকা তৈরি করে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















