যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মুসলিম ও ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক বক্তব্য ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। রিপাবলিকান দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা মুসলিম প্রার্থী ও মুসলিম নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন উদ্যোগকে নিরাপত্তা, উগ্রবাদ এবং ধর্মীয় আইনের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার চালাচ্ছেন। সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে নিশানা করা হচ্ছে।
মুসলিম প্রার্থীদের ঘিরে আক্রমণ
মিশিগান থেকে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মুসলিম ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সাইয়েদ। সম্প্রতি এক নির্বাচনী সমাবেশে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাকে ‘অত্যন্ত খারাপ’ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যা দেন। মার্চে ডেট্রয়েটের উপশহরের একটি ইহুদি উপাসনালয়ে হামলার পর এল-সাইয়েদের দেওয়া মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই মূলত এই আক্রমণ।
এল-সাইয়েদ হামলার নিন্দা করলেও হামলাকারী সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আহত মানুষই অন্য মানুষকে আঘাত করে।’ তিনি হামলাকারীর লেবাননে থাকা কয়েকজন স্বজনের সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন। পরে তিনি বলেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে বোঝা হয়ে থাকতে পারে এবং এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
ভ্যান্সের সমালোচনার জবাবে এল-সাইয়েদ পাল্টা বলেন, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কমিয়ে ধনীদের কর সুবিধা দেওয়া, সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপণ্যের দাম ও জ্বালানি ব্যয় বাড়তে দেওয়া এবং রাজনৈতিক স্বার্থে মানুষকে বিভক্ত করাই প্রকৃত অন্যায়।
টেক্সাস ও আলাবামাতেও মুসলিম ইস্যু
টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও মুসলিম নেতৃত্বাধীন একটি আবাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছেন। তিনি সেখানে কথিত ‘শরিয়াহ আদালত’ গঠনের প্রচেষ্টার তদন্ত দাবি করেছেন। প্রকল্পের উদ্যোক্তা ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অ্যাবটের প্রচারশিবিরের বক্তব্য, তাদের আপত্তি ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নয়; বরং কথিত বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগের তদন্ত নিয়েই তাদের অবস্থান।
আলাবামায় মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধ শতাংশেরও কম। তারপরও গভর্নর পদপ্রার্থী রিপাবলিকান সিনেটর টমি টিউবারভিল ‘শত্রু আমাদের দরজার ভেতরেই’—এমন মন্তব্য করে কথিত উগ্র ইসলাম নিয়ে সতর্ক করেছেন।
বাড়ছে মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনসংখ্যা এখন প্রায় ৫৫ লাখ। ২০০৭ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ লাখ। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ মুসলিম।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিমদের দৃশ্যমানতাও বেড়েছে। নিউইয়র্ক শহর প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম মেয়র নির্বাচিত করেছে। ভার্জিনিয়ায় গাজালা হাশমি প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। আর এল-সাইয়েদ নির্বাচিত হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হতে পারেন।
মুসলিম ইস্যু এখন শুধু সিনেট বা গভর্নর নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য ‘শরিয়াহমুক্ত আমেরিকা’ নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করেছেন। ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি র্যান্ডি ফাইনও যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইনের কথিত বিস্তার মোকাবিলায় আইন প্রস্তাব করেছেন।
নির্বাচনী কৌশল নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, ইরান যুদ্ধ এবং অভিবাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় মুসলিম ও ইসলামকে নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রে আনা হচ্ছে।
রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব ও ইসলাম-ইহুদি সম্পর্কের গবেষক অ্যারন হিউজের মতে, মুসলিমদের সমালোচনা করে জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশপ্রেমের আবরণ তৈরি করা সহজ হলেও এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বা যুদ্ধের মতো বাস্তব সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়। তার ভাষায়, এটি মূলত ভয়কে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর কৌশল।
হিউজ আরও বলেন, মুসলিমদের সঙ্গে হামাস বা ইরানের মতো বিষয়কে একাকার করে দেখানো একটি বড় ধরনের সাধারণীকরণ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মুসলিমের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান এমন কিছু বিষয়ে রিপাবলিকানদের সঙ্গে মিলে যায়, যেমন কিছু গর্ভপাতবিরোধী অবস্থান এবং সমলিঙ্গের বিবাহের বিরোধিতা।
রাজনীতিতে সংখ্যালঘুদের নিশানা করার পুরোনো প্রবণতা
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার বানানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিয়েও এমন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা ওহাইওর স্প্রিংফিল্ড শহরে বসবাসকারী হাইতি থেকে আসা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়েছিলেন যে তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের পোষা প্রাণী খাচ্ছেন। সেই অভিযোগ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
এবারও সমালোচকদের আশঙ্কা, মুসলিমদের নিয়ে একই ধরনের ভয় ও সন্দেহের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
শুধু রিপাবলিকানদের দায় নয়
তবে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যকে শুধু রিপাবলিকান দলের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সহসভাপতি আশিক সিদ্দিক। তার মতে, ডেমোক্র্যাট দলের নেতাদের মধ্যেও কখনো কখনো মুসলিমবিরোধী বক্তব্য দেখা গেছে।
তিনি নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের সময় অ্যান্ড্রু কুওমোর একটি মন্তব্যের কথা উল্লেখ করেন। গত বছরের অক্টোবরে কুওমো প্রশ্ন তুলেছিলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সময় যদি জোহরান মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র থাকতেন, তাহলে পরিস্থিতি কেমন হতো।
নির্বাচনী প্রচারের বাইরেও বিতর্ক
মুসলিম ইস্যু এখন নির্বাচনী প্রচারের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগস্টে অ্যাবট টেক্সাসের দুটি বিমানবন্দরে মুসলিমদের অজু করার জন্য নির্ধারিত সুবিধা নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তের আহ্বান জানান। তার যুক্তি ছিল, সরকারি মালিকানাধীন বিমানবন্দর কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে না।
হিউস্টনের ডেমোক্র্যাট মেয়র জন হুইটমায়ার অবশ্য জানান, বিমানবন্দরগুলোর অজুর স্থান ও সংলগ্ন প্রার্থনার কক্ষ সব ধর্মের যাত্রী, কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য উন্মুক্ত। তার ভাষায়, সেখানে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয় না এবং কাউকেও বাদ দেওয়া হয় না।
ভোটের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ ও আমদানি শুল্ক নিয়ে জনমনে অসন্তোষের পাশাপাশি মুসলিম ও ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক বক্তব্যও এখন নির্বাচনী বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণও বাড়ছে। ফলে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন নিয়ে লড়াই নয়, বরং ধর্ম, পরিচয়, নিরাপত্তা ও বহুত্ববাদ নিয়ে আমেরিকার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















