০১:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খাবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা যে ৫ খাবার এড়িয়ে চলেন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই, তীব্র গরমের সঙ্গে বন্যা-আগুনের তাণ্ডব হেইডেন প্যানেটিয়ার: পর্দার কান্নার আড়ালে ছিল এক কঠিন জীবনসংগ্রাম যুদ্ধের আগুন এবার রাশিয়ার সাধারণ জীবনেও, ইউক্রেনের হামলার নিশানায় ওয়াইল্ডবেরিজ সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ভরসা মারুফা টাকার বিনিময়ে ট্রাম্পের পোস্ট আগে পাওয়ার সুযোগ, তীব্র বিতর্ক ড্রোন আতঙ্কে জেলেনস্কির নরওয়ে যাত্রা থমকে গেল হরমুজে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় নৌ-সংঘাত নিজের মাটিতে বিশ্বকাপ: মরক্কো কি এবার ফাইনালে উঠতে পারবে? দুই সেট পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে তিয়াফো

রাশিয়ার হামলায় কাঁপছে ইউক্রেনের নারীদের হাত, তবু সন্তানদের নিয়ে থামছে না জীবন

রাশিয়ার একের পর এক বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ইউক্রেনের মানুষের জীবন বদলে গেছে। বিশেষ করে দেশটির নারীরা প্রতিদিন মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে সন্তানদের আগলে বেঁচে আছেন। বাইরে থেকে তারা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও ভেতরে জমে আছে ভয়, উদ্বেগ আর দীর্ঘদিনের যুদ্ধের মানসিক চাপ।

সম্প্রতি কিয়েভে দুই নারী বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ইউক্রেনীয় লেখক আলিনা সারনাতস্কা জানতে পারেন, বিমান হামলার সময় তাদের হাত কাঁপতে শুরু করেছে। আগে এমন কখনো হয়নি। দুজনেরই একই প্রশ্ন—‘আমার সঙ্গে হঠাৎ এমন কী হলো?’

সারনাতস্কার নিজের হাতও বিমান হামলার সময় কাঁপে। দোনেৎস্ক অঞ্চলে একবার ভয়াবহ হামলার মধ্যে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এরপর আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেননি। এখন তিনি যেন যুদ্ধের আতঙ্কে কাঁপতে থাকা মানুষেরই একজন প্রতিনিধি।

যুদ্ধের মধ্যে বদলে গেছে স্বাভাবিক জীবন

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর রুশ ড্রোন, রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছে। কখনো বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, কখনো বাঁধ ধ্বংস করে ব্যাপক বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। শীতের মধ্যে তাপ ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন করে তোলা হয়েছে।

পরমাণু হামলার হুমকিও বারবার এসেছে। দূরপাল্লার বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে।

Russian missile strike in Kyiv, 8 September 2026.

গত ১৯ জুলাই ভোরে ইউক্রেনের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানায়, রাশিয়া বড় ধরনের সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। ওই হামলায় ৪১টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২৫টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। মূল লক্ষ্য ছিল কিয়েভ।

এর পরদিন সকালে সারনাতস্কার বন্ধু ভালিয়া তাকে লিখেছিলেন, সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ করেই কিছু একটা বদলে যায়। বাড়িতে সবাই ঘুমাচ্ছে, অথচ তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি তীব্র উদ্বেগে ভুগছেন।

হামলা শেষ হলেই আবার সন্তানদের নিয়ে ছুটতে হয়

বিমান হামলার পর ইউক্রেনের নারীরা নিজেদের সামলে নেন। সন্তানদের সকালে বিদ্যালয়ে পাঠাতে হয়, কাজে যেতে হয়, সংসার চালাতে হয়। যুদ্ধ থেমে থাকলেও জীবন থেমে থাকে না।

কোনো সরকারি বিদ্যালয়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র না থাকলে সন্তানকে নিরাপদ জায়গায় পাঠাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সেটির খরচও অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি বোঝা।

রাতের হামলার সময় অনেক মা সন্তানদের নিয়ে বাড়ির করিডরে ঘুমান। কেউ আশ্রয় নেন ভূগর্ভস্থ গাড়ি রাখার জায়গায়, কেউ পাতাল রেলকেন্দ্রে, আবার কেউ পথচারীদের ভূগর্ভস্থ চলাচলের পথে।

পরদিন সকালে তারা বলেন, ‘সব ঠিক আছে।’ রাতভর কিয়েভে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলেও তাদের মুখে শোনা যায়, ‘শব্দটা অনেক বেশি ছিল, কিন্তু সব ঠিক আছে।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ঠিক নেই। তাদের হাত কাঁপে। বুকের ভেতর ভয় কাজ করে। তারপরও অনেকে নিজেদের দুর্বল ভাবেন।

দাদির কঠোর জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা

Ukrainian Women Share Their Stories, As Moms and Daughters

সারনাতস্কা স্মরণ করেছেন তার দাদি দিনার কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মাত্র ১৭ বছর বয়সে নাৎসিরা তার গ্রামের দখল নেয়। জোরপূর্বক শ্রমে নিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে তিনি একবার ঘরের চিলেকোঠায় লুকিয়েছিলেন। পরে মাঠে কাজ করার সময় ধরা পড়েন। তাকে গবাদিপশু পরিবহনের ট্রেনে করে জার্মানিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখান থেকে পালিয়ে কয়েকশ কিলোমিটার হেঁটে তিনি নিজের গ্রামে ফিরে আসেন।

দিনা ছিলেন অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের মানুষ। ছোটবেলায় সারনাতস্কা আত্মীয়দের জড়িয়ে ধরলে দাদি তাকে বকতেন। কাঁদলেও বলতেন, জীবন কঠিন—এভাবে আদর পেলে সে জীবন সামলাতে পারবে না।

একবার বাড়ির কাছে দীর্ঘদিন ধরে দাদির খাওয়ানো একটি বিড়াল মারা যায়। শিশুসুলভ কষ্টে সারনাতস্কা কাঁদতে কাঁদতে দাদির কাছে ছুটে গেলে দাদি তাকেও বকা দিয়েছিলেন। সেই সময় ছোট্ট মেয়েটির মনে হয়েছিল, তার দাদি বুঝি মানুষ নন, কোনো যন্ত্র।

যুদ্ধ মানুষকে শক্ত করে, কিন্তু কেড়ে নেয় কোমলতা

বড় হয়ে সারনাতস্কা বুঝেছেন, দাদি কেন এত কঠোর ছিলেন। নিজের অনুভূতির প্রতি তিনি কখনো সহানুভূতিশীল হতে পারেননি। অন্যের প্রতিও মমতা দেখানোর সুযোগ নিজেকে দেননি। কারণ তার কাছে মমতা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

আজকের ইউক্রেনীয় নারীদের জীবনেও সেই কঠোরতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ তাদের মানসিকভাবে এক ধরনের বর্ম পরিয়ে দিয়েছে। তারা হামলার মধ্যে বাঁচেন, কাজ করেন, সন্তান লালন-পালন করেন এবং প্রয়োজন হলে যুদ্ধে অংশ নেন।

2023 Version

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফল্য, নিজের যত্ন কিংবা নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার নানা বার্তা হয়তো স্বাভাবিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতায়, যখন ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা মাত্র কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং পাশে অসুস্থ সন্তান, তখন এসব কথার কোনো অর্থ থাকে না।

তবু ভালোবাসাকে হারাতে চান না তারা

যুদ্ধ ইউক্রেনের নারীদের বদলে দিয়েছে। প্রতিদিন মৃত্যু দেখা, হামলার শব্দ শোনা এবং সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাদের আরও কঠিন করে তুলেছে।

কিন্তু সারনাতস্কা মনে করেন, বেঁচে থাকার জন্য এই কঠোরতা যেন মানুষের কোমলতাকে পুরোপুরি কেড়ে না নেয়।

তিনি চান নিজের ভেতরের কোমলতাটুকু ধরে রাখতে। মানুষকে জড়িয়ে ধরতে, প্রিয়জনকে কাছে টেনে নিতে এবং অন্যের হাতের উষ্ণতা অনুভব করতে চান। কারণ তার কাছে ভালোবাসা এমন এক ঝুঁকি, যা নেওয়া মূল্যবান।

ইউক্রেনের মায়েরা সন্তানদের সামনে শান্ত থাকার চেষ্টা করেন। কারণ সন্তানরা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সকালে তাদের বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে হয়। কাজ করতে হয়। জীবন চালিয়ে যেতে হয়।

কিন্তু সবসময় শক্ত থাকার বাধ্যবাধকতা যেন কাঁপতে থাকা হাতকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতায় পরিণত না করে—এটাই সারনাতস্কার বার্তা।

যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকা জরুরি। কিন্তু শুধু বেঁচে থাকাই সব নয়। মানুষের প্রতি মমতা, ভালোবাসা এবং নিজের প্রতি সহানুভূতিও বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। কারণ যুদ্ধ যদি মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তবে ভালোবাসাই হতে পারে সেই মানবিকতার শেষ আশ্রয়।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

খাবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা যে ৫ খাবার এড়িয়ে চলেন

রাশিয়ার হামলায় কাঁপছে ইউক্রেনের নারীদের হাত, তবু সন্তানদের নিয়ে থামছে না জীবন

১০:৫৩:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাশিয়ার একের পর এক বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ইউক্রেনের মানুষের জীবন বদলে গেছে। বিশেষ করে দেশটির নারীরা প্রতিদিন মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে সন্তানদের আগলে বেঁচে আছেন। বাইরে থেকে তারা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও ভেতরে জমে আছে ভয়, উদ্বেগ আর দীর্ঘদিনের যুদ্ধের মানসিক চাপ।

সম্প্রতি কিয়েভে দুই নারী বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ইউক্রেনীয় লেখক আলিনা সারনাতস্কা জানতে পারেন, বিমান হামলার সময় তাদের হাত কাঁপতে শুরু করেছে। আগে এমন কখনো হয়নি। দুজনেরই একই প্রশ্ন—‘আমার সঙ্গে হঠাৎ এমন কী হলো?’

সারনাতস্কার নিজের হাতও বিমান হামলার সময় কাঁপে। দোনেৎস্ক অঞ্চলে একবার ভয়াবহ হামলার মধ্যে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এরপর আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেননি। এখন তিনি যেন যুদ্ধের আতঙ্কে কাঁপতে থাকা মানুষেরই একজন প্রতিনিধি।

যুদ্ধের মধ্যে বদলে গেছে স্বাভাবিক জীবন

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর রুশ ড্রোন, রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছে। কখনো বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, কখনো বাঁধ ধ্বংস করে ব্যাপক বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। শীতের মধ্যে তাপ ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন করে তোলা হয়েছে।

পরমাণু হামলার হুমকিও বারবার এসেছে। দূরপাল্লার বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে।

Russian missile strike in Kyiv, 8 September 2026.

গত ১৯ জুলাই ভোরে ইউক্রেনের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানায়, রাশিয়া বড় ধরনের সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। ওই হামলায় ৪১টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২৫টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। মূল লক্ষ্য ছিল কিয়েভ।

এর পরদিন সকালে সারনাতস্কার বন্ধু ভালিয়া তাকে লিখেছিলেন, সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ করেই কিছু একটা বদলে যায়। বাড়িতে সবাই ঘুমাচ্ছে, অথচ তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি তীব্র উদ্বেগে ভুগছেন।

হামলা শেষ হলেই আবার সন্তানদের নিয়ে ছুটতে হয়

বিমান হামলার পর ইউক্রেনের নারীরা নিজেদের সামলে নেন। সন্তানদের সকালে বিদ্যালয়ে পাঠাতে হয়, কাজে যেতে হয়, সংসার চালাতে হয়। যুদ্ধ থেমে থাকলেও জীবন থেমে থাকে না।

কোনো সরকারি বিদ্যালয়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র না থাকলে সন্তানকে নিরাপদ জায়গায় পাঠাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সেটির খরচও অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি বোঝা।

রাতের হামলার সময় অনেক মা সন্তানদের নিয়ে বাড়ির করিডরে ঘুমান। কেউ আশ্রয় নেন ভূগর্ভস্থ গাড়ি রাখার জায়গায়, কেউ পাতাল রেলকেন্দ্রে, আবার কেউ পথচারীদের ভূগর্ভস্থ চলাচলের পথে।

পরদিন সকালে তারা বলেন, ‘সব ঠিক আছে।’ রাতভর কিয়েভে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলেও তাদের মুখে শোনা যায়, ‘শব্দটা অনেক বেশি ছিল, কিন্তু সব ঠিক আছে।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ঠিক নেই। তাদের হাত কাঁপে। বুকের ভেতর ভয় কাজ করে। তারপরও অনেকে নিজেদের দুর্বল ভাবেন।

দাদির কঠোর জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা

Ukrainian Women Share Their Stories, As Moms and Daughters

সারনাতস্কা স্মরণ করেছেন তার দাদি দিনার কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মাত্র ১৭ বছর বয়সে নাৎসিরা তার গ্রামের দখল নেয়। জোরপূর্বক শ্রমে নিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে তিনি একবার ঘরের চিলেকোঠায় লুকিয়েছিলেন। পরে মাঠে কাজ করার সময় ধরা পড়েন। তাকে গবাদিপশু পরিবহনের ট্রেনে করে জার্মানিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখান থেকে পালিয়ে কয়েকশ কিলোমিটার হেঁটে তিনি নিজের গ্রামে ফিরে আসেন।

দিনা ছিলেন অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের মানুষ। ছোটবেলায় সারনাতস্কা আত্মীয়দের জড়িয়ে ধরলে দাদি তাকে বকতেন। কাঁদলেও বলতেন, জীবন কঠিন—এভাবে আদর পেলে সে জীবন সামলাতে পারবে না।

একবার বাড়ির কাছে দীর্ঘদিন ধরে দাদির খাওয়ানো একটি বিড়াল মারা যায়। শিশুসুলভ কষ্টে সারনাতস্কা কাঁদতে কাঁদতে দাদির কাছে ছুটে গেলে দাদি তাকেও বকা দিয়েছিলেন। সেই সময় ছোট্ট মেয়েটির মনে হয়েছিল, তার দাদি বুঝি মানুষ নন, কোনো যন্ত্র।

যুদ্ধ মানুষকে শক্ত করে, কিন্তু কেড়ে নেয় কোমলতা

বড় হয়ে সারনাতস্কা বুঝেছেন, দাদি কেন এত কঠোর ছিলেন। নিজের অনুভূতির প্রতি তিনি কখনো সহানুভূতিশীল হতে পারেননি। অন্যের প্রতিও মমতা দেখানোর সুযোগ নিজেকে দেননি। কারণ তার কাছে মমতা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

আজকের ইউক্রেনীয় নারীদের জীবনেও সেই কঠোরতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ তাদের মানসিকভাবে এক ধরনের বর্ম পরিয়ে দিয়েছে। তারা হামলার মধ্যে বাঁচেন, কাজ করেন, সন্তান লালন-পালন করেন এবং প্রয়োজন হলে যুদ্ধে অংশ নেন।

2023 Version

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফল্য, নিজের যত্ন কিংবা নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার নানা বার্তা হয়তো স্বাভাবিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতায়, যখন ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা মাত্র কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং পাশে অসুস্থ সন্তান, তখন এসব কথার কোনো অর্থ থাকে না।

তবু ভালোবাসাকে হারাতে চান না তারা

যুদ্ধ ইউক্রেনের নারীদের বদলে দিয়েছে। প্রতিদিন মৃত্যু দেখা, হামলার শব্দ শোনা এবং সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাদের আরও কঠিন করে তুলেছে।

কিন্তু সারনাতস্কা মনে করেন, বেঁচে থাকার জন্য এই কঠোরতা যেন মানুষের কোমলতাকে পুরোপুরি কেড়ে না নেয়।

তিনি চান নিজের ভেতরের কোমলতাটুকু ধরে রাখতে। মানুষকে জড়িয়ে ধরতে, প্রিয়জনকে কাছে টেনে নিতে এবং অন্যের হাতের উষ্ণতা অনুভব করতে চান। কারণ তার কাছে ভালোবাসা এমন এক ঝুঁকি, যা নেওয়া মূল্যবান।

ইউক্রেনের মায়েরা সন্তানদের সামনে শান্ত থাকার চেষ্টা করেন। কারণ সন্তানরা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সকালে তাদের বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে হয়। কাজ করতে হয়। জীবন চালিয়ে যেতে হয়।

কিন্তু সবসময় শক্ত থাকার বাধ্যবাধকতা যেন কাঁপতে থাকা হাতকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতায় পরিণত না করে—এটাই সারনাতস্কার বার্তা।

যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকা জরুরি। কিন্তু শুধু বেঁচে থাকাই সব নয়। মানুষের প্রতি মমতা, ভালোবাসা এবং নিজের প্রতি সহানুভূতিও বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। কারণ যুদ্ধ যদি মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তবে ভালোবাসাই হতে পারে সেই মানবিকতার শেষ আশ্রয়।