০১:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খাবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা যে ৫ খাবার এড়িয়ে চলেন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই, তীব্র গরমের সঙ্গে বন্যা-আগুনের তাণ্ডব হেইডেন প্যানেটিয়ার: পর্দার কান্নার আড়ালে ছিল এক কঠিন জীবনসংগ্রাম যুদ্ধের আগুন এবার রাশিয়ার সাধারণ জীবনেও, ইউক্রেনের হামলার নিশানায় ওয়াইল্ডবেরিজ সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ভরসা মারুফা টাকার বিনিময়ে ট্রাম্পের পোস্ট আগে পাওয়ার সুযোগ, তীব্র বিতর্ক ড্রোন আতঙ্কে জেলেনস্কির নরওয়ে যাত্রা থমকে গেল হরমুজে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় নৌ-সংঘাত নিজের মাটিতে বিশ্বকাপ: মরক্কো কি এবার ফাইনালে উঠতে পারবে? দুই সেট পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে তিয়াফো

দুর্ঘটনায় হারালেন দুই পা ও তিন প্রিয় বন্ধু, তবু জীবনকে নতুন করে বেছে নিলেন রব পাইক

১৯৯৯ সালের ১৭ আগস্ট। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় বালডিভিসে ১৭ বছরের রব পাইকের জীবন এক মুহূর্তে বদলে যায়। সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন তিনি। বৃষ্টিভেজা রাস্তায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনায় তাঁর তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্রিশ্চিয়ান ইয়েজ্জি-কারেলো, অ্যাডাম স্ট্রিবলিং ও ড্যানিয়েল ম্যাককয় মারা যান। রব বেঁচে গেলেও হারান দুই পা।

দুর্ঘটনার পরের কয়েক সপ্তাহের স্মৃতি তাঁর কাছে যেন অন্ধকার। দুই সপ্তাহ জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রের সহায়তায় থাকার পর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে তাঁর। চোখ খুলেই দেখেন শরীরজুড়ে নল, তার ও চিকিৎসার সরঞ্জাম। নড়াচড়ারও উপায় নেই।

শেষবার বন্ধুকে দেখার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত

দুর্ঘটনার পর গাড়িটি এক পাশে কাত হয়ে থেমে যায়। রবের মুখে বৃষ্টির পানি পড়ছিল। হাত দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে বুঝতে পারেন, সেটি পানি নয়—রক্ত।

পাশেই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড্যানিয়েল। রব তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখেন, বন্ধু আর বেঁচে নেই। সেই দৃশ্যই হয়ে ওঠে ড্যানিয়েলকে নিয়ে তাঁর শেষ স্মৃতি।

তিনি চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলেন। দুর্ঘটনার শব্দ শুনে পাশের বাড়ির এক নারী ছুটে আসেন। রব তাঁকে অনুরোধ করছিলেন, ড্যানিয়েলকে বাঁচাতে কিছু করতে। কিন্তু নারীটি গাড়ির ভেতর তাকিয়ে জানান, আর কিছু করার নেই।

এরপর রব বুঝতে পারেন, তিনিও গাড়ির ভেতর আটকা পড়েছেন। বের হওয়ার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করতে থাকেন। হাত কেটে রক্তাক্ত হলেও বের হতে পারেননি। প্রায় ১৫ মিনিট ওই নারী তাঁর পাশে থেকে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে দমকলকর্মী ও অ্যাম্বুলেন্স এসে তাঁকে উদ্ধার করে।

হাসপাতালের বিছানায় শুনলেন তিন বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ

Bunches of flowers heaped around a tree at the side of a road on the grass

প্রায় দুই সপ্তাহ পর জ্ঞান ফেরার পর রবের পাশে ছিলেন তাঁর বাবা। বাবাই তাঁকে জানালেন—ক্রিশ্চিয়ান, অ্যাডাম ও ড্যানিয়েল আর নেই।

রব প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। মনে হয়েছিল তিনি দুঃস্বপ্ন দেখছেন। নিজেকে জাগানোর জন্য নিজের হাত ও বুকে জোরে জোরে চিমটি কাটতে থাকেন। কিন্তু কিছুতেই সেই বাস্তবতা বদলায়নি।

তাঁর তিন বন্ধুই মারা গেছেন।

এরপরও তিনি জানতেন না, দুর্ঘটনা তাঁর নিজের শরীরের কতটা ক্ষতি করেছে।

নিজের দুই পা নেই—জানলেন প্রায় এক মাস পর

চিকিৎসকেরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর শরীরে তিন শতাধিক সেলাই পড়েছে এবং মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লেগেছে। পিঠের বিশেষ বন্ধনী পরে থাকতে হচ্ছিল। কিন্তু পায়ে চুলকানি ও পেশিতে টান অনুভব করতেন তিনি। মনে করতেন, একদিন আবার হাঁটতে পারবেন।

দুর্ঘটনার প্রায় চার সপ্তাহ পর পায়ে প্রচণ্ড চুলকানি শুরু হয়। চুলকানি মেটাতে তিনি কম্বলের নিচে হাত বাড়ান। কিন্তু পায়ের বদলে অনুভব করেন ব্যান্ডেজ।

কম্বল সরিয়ে নিচে তাকিয়ে তিনি দেখেন, দুই পা হাঁটুর সামান্য নিচ থেকেই নেই।

দুর্ঘটনার সময় গাড়ির পেছনের একটি ধাতব অংশ তাঁর দুই পা কেটে দিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, সেই অংশই আবার তাঁর জীবনও বাঁচিয়েছিল। পায়ের ক্ষত এত শক্তভাবে চেপে ছিল যে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু এর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় তাঁর শৈশবের সবচেয়ে বড় স্বপ্নও—অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় ফুটবল দলে খেলার স্বপ্ন।

মনে হয়েছিল, সবকিছুই হারিয়ে ফেলেছেন

Two men sitting on a hospital bed – one older in blue tracksuit and the other a teen in a white T-shirt, surrounded by lights, wires and get well cards

হাসপাতালে সাত সপ্তাহ কাটাতে হয় রবকে। নার্সদের সামনে নগ্ন হয়ে গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করা—সবকিছু তাঁর আত্মসম্মানে গভীর আঘাত করেছিল।

তাঁর মনে হতে থাকে, তিনি সব হারিয়েছেন।

বন্ধুদের হারিয়েছেন, দুই পা হারিয়েছেন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন হারিয়েছেন। তাঁর মনে হয়েছিল, নিজের মর্যাদাটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।

প্রতিদিন রাতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমাতেন। নিজের বেঁচে যাওয়াকে অপরাধ বলে মনে হতে শুরু করে। ভাবতেন, তাঁর জায়গায় যদি কোনো বন্ধু বেঁচে থাকত, হয়তো সবার জন্য ভালো হতো।

বিশেষ করে ড্যানিয়েলকে তিনি নিজের কথায় গাড়িতে উঠিয়েছিলেন—এই বিষয়টি তাঁকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেত।

একসময় নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন।

বন্ধুর বাবা-মায়ের একটি কথায় বদলে গেল সব

এক রাতে হাসপাতালে ড্যানিয়েলের বাবা-মা তাঁকে দেখতে আসেন। ড্যানিয়েলের বাবা রবকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তাঁরা রবের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত আনন্দিত।

কথাটি রবের মনে গভীরভাবে আঘাত করে।

তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর বেঁচে থাকা ড্যানিয়েলের পরিবারের জন্য নতুন কোনো কষ্টের কারণ নয়। বরং তাঁর জীবনই হয়তো ড্যানিয়েলের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি পথ।

সেদিন থেকেই তিনি নিজেকে বলতে শুরু করেন, ‘আমি হাল ছাড়তে পারি না।’

Wearing his Team Australia top, Pike stands with his arms folded against a brick wall, smiling softly

প্রথম কয়েক মাস দিনে অসংখ্যবার নিজেকে কথাটি বলতেন। পরে সেই সংখ্যা কমতে থাকে। একসময় আর নিজেকে বলার প্রয়োজনই হলো না।

তখন তিনি উপলব্ধি করেন, তিনি শুধু মৃত বন্ধুদের জন্য বেঁচে নেই—তিনি নিজের জন্যও বেঁচে আছেন।

কৃত্রিম পা নিয়ে আবার মাঠে ফিরলেন

রব তাঁর দুই পা পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই কৃত্রিম পা ব্যবহার শেখেন। লক্ষ্য ছিল স্কুলের বছরের শেষের অনুষ্ঠানে নিজের পায়ে হেঁটে যাওয়া।

পরে আবার ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন। জীবনে আসে নতুন সম্পর্কও।

তবে ভেতরের ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। স্থানীয় সংবাদপত্রে দুর্ঘটনার আগে ছেলেরা মদ্যপ ছিল এবং গাড়িটি চুরি করা হয়েছিল—এমন ভুল খবরও প্রকাশিত হয়। রাস্তায় অপরিচিত মানুষ তাঁকে থামিয়ে প্রশ্ন করত, তাঁরা এমন কী করেছিলেন যে দুর্ঘটনা ঘটল।

মানসিক যন্ত্রণা ভুলতে তিনি অতিরিক্ত মদ্যপান শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ছয় মাস পর তিনি বুঝতে পারেন, পেশাদার মানসিক সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

হুইলচেয়ার বাস্কেটবল খুলে দিল নতুন দরজা

রবের বাবা তাঁকে হুইলচেয়ার বাস্কেটবল খেলার পরামর্শ দেন। শুরুতে রবের ধারণা ছিল, এটি হয়তো কেবল প্রতিবন্ধী মানুষের একটি খেলা।

কিন্তু প্রথম ম্যাচ দেখার পর তাঁর ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়।

দেখলেন, খেলোয়াড়েরা প্রচণ্ড গতি ও শক্তি নিয়ে মাঠে ছুটছেন, একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফুটবলের জায়গায় যেন নতুন এক পৃথিবী খুঁজে পেলেন তিনি।

এরপর নিজেই খেলায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। পার্থ হুইলক্যাটস ও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেন। পরে স্পেনে গিয়ে পেশাদারভাবেও খেলেন।

A man’s hand to left touches his upper arm where a cross and a white dove are tattoo on his skin

বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার নারী তিন-জনের হুইলচেয়ার বাস্কেটবল দলের প্রধান কোচ। কমনওয়েলথ গেমসের এক আসরে তাঁর দল ব্রোঞ্জ পদকও জেতে।

২০ বছর পরও ফিরে এসেছিল সেই দুর্ঘটনার ভয়

দুর্ঘটনার দুই দশকেরও বেশি সময় পর করোনাকালের সময়ে আবার তীব্র আতঙ্কের অভিজ্ঞতা হয় রবের।

একসময় গাড়ি চালানোর সময়ও তাঁর আতঙ্কের সমস্যা ফিরে আসে। গাড়ির ভেতর নিজেকে আটকা মনে হচ্ছিল। দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে আটকে থাকার সেই পুরোনো অনুভূতি যেন আবার ফিরে আসে।

তিনি বুঝতে পারেন, আগের চিকিৎসায় সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। মানুষের মন অনেক সময় নিরাপদ অবস্থায় পৌঁছানোর পর পুরোনো আঘাত সামনে নিয়ে আসে।

আবার মানসিক চিকিৎসা নেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই ভয়ও কাটিয়ে ওঠেন।

জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন

এখন ৪৪ বছর বয়সী রব বিবাহিত এবং দুই সন্তানের বাবা। মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া মানুষদের সহায়তাকারী একটি সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদে কাজ করেন। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন।

নিজের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তরুণদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, ১৬-১৭ বছরের ছেলেমেয়েরা যেন আরও দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালায় এবং একই সঙ্গে আরও সহানুভূতিশীল মানুষ হয়ে ওঠে।

দুর্ঘটনার পর নিজেকে তিনি আগের চেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবে দেখেন।

A traditional groom and bride walking back up the aisle at church

তবে জীবনের কঠিন অধ্যায় এখানেই শেষ হয়নি। সম্প্রতি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ১২ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে তাঁকে। পরে জানতে পারেন, তাঁর বংশগতভাবে উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে।

রবের উপলব্ধি এখন খুব সরল—জীবন কতটা কঠিন, সেটি নিয়ে শুধু ভাবলে চলবে না। বরং যা আছে, সেটির মূল্য বুঝতে হবে।

তাঁর ভাষায়, মানুষের শুধু অস্তিত্ব নিয়ে পড়ে থাকার জন্য জন্ম হয়নি। যতদিন বেঁচে থাকা যায়, ততদিন জীবনকে নিজের মতো করে বাঁচতে হবে, মানুষের প্রতি ভালো হতে হবে এবং নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

রব পাইকের জীবনের গল্প তাই শুধু একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি হারানোর পরও বেঁচে থাকার, অপরাধবোধ পেরিয়ে নিজেকে ফিরে পাওয়ার এবং অসম্ভব মনে হওয়া জীবনকে নতুন অর্থ দেওয়ার গল্প।

যা হারিয়েছেন, তার দিকে তাকিয়ে থেমে না থেকে যা আছে, সেটিকে নিয়েই জীবনকে এগিয়ে নেওয়া—রবের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যেন এটাই।

He stands sideways with his arms folded against a red brick wall

 

জনপ্রিয় সংবাদ

খাবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা যে ৫ খাবার এড়িয়ে চলেন

দুর্ঘটনায় হারালেন দুই পা ও তিন প্রিয় বন্ধু, তবু জীবনকে নতুন করে বেছে নিলেন রব পাইক

১০:৫৮:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৯৯৯ সালের ১৭ আগস্ট। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় বালডিভিসে ১৭ বছরের রব পাইকের জীবন এক মুহূর্তে বদলে যায়। সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন তিনি। বৃষ্টিভেজা রাস্তায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনায় তাঁর তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্রিশ্চিয়ান ইয়েজ্জি-কারেলো, অ্যাডাম স্ট্রিবলিং ও ড্যানিয়েল ম্যাককয় মারা যান। রব বেঁচে গেলেও হারান দুই পা।

দুর্ঘটনার পরের কয়েক সপ্তাহের স্মৃতি তাঁর কাছে যেন অন্ধকার। দুই সপ্তাহ জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রের সহায়তায় থাকার পর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে তাঁর। চোখ খুলেই দেখেন শরীরজুড়ে নল, তার ও চিকিৎসার সরঞ্জাম। নড়াচড়ারও উপায় নেই।

শেষবার বন্ধুকে দেখার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত

দুর্ঘটনার পর গাড়িটি এক পাশে কাত হয়ে থেমে যায়। রবের মুখে বৃষ্টির পানি পড়ছিল। হাত দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে বুঝতে পারেন, সেটি পানি নয়—রক্ত।

পাশেই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড্যানিয়েল। রব তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখেন, বন্ধু আর বেঁচে নেই। সেই দৃশ্যই হয়ে ওঠে ড্যানিয়েলকে নিয়ে তাঁর শেষ স্মৃতি।

তিনি চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলেন। দুর্ঘটনার শব্দ শুনে পাশের বাড়ির এক নারী ছুটে আসেন। রব তাঁকে অনুরোধ করছিলেন, ড্যানিয়েলকে বাঁচাতে কিছু করতে। কিন্তু নারীটি গাড়ির ভেতর তাকিয়ে জানান, আর কিছু করার নেই।

এরপর রব বুঝতে পারেন, তিনিও গাড়ির ভেতর আটকা পড়েছেন। বের হওয়ার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করতে থাকেন। হাত কেটে রক্তাক্ত হলেও বের হতে পারেননি। প্রায় ১৫ মিনিট ওই নারী তাঁর পাশে থেকে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে দমকলকর্মী ও অ্যাম্বুলেন্স এসে তাঁকে উদ্ধার করে।

হাসপাতালের বিছানায় শুনলেন তিন বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ

Bunches of flowers heaped around a tree at the side of a road on the grass

প্রায় দুই সপ্তাহ পর জ্ঞান ফেরার পর রবের পাশে ছিলেন তাঁর বাবা। বাবাই তাঁকে জানালেন—ক্রিশ্চিয়ান, অ্যাডাম ও ড্যানিয়েল আর নেই।

রব প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। মনে হয়েছিল তিনি দুঃস্বপ্ন দেখছেন। নিজেকে জাগানোর জন্য নিজের হাত ও বুকে জোরে জোরে চিমটি কাটতে থাকেন। কিন্তু কিছুতেই সেই বাস্তবতা বদলায়নি।

তাঁর তিন বন্ধুই মারা গেছেন।

এরপরও তিনি জানতেন না, দুর্ঘটনা তাঁর নিজের শরীরের কতটা ক্ষতি করেছে।

নিজের দুই পা নেই—জানলেন প্রায় এক মাস পর

চিকিৎসকেরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর শরীরে তিন শতাধিক সেলাই পড়েছে এবং মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লেগেছে। পিঠের বিশেষ বন্ধনী পরে থাকতে হচ্ছিল। কিন্তু পায়ে চুলকানি ও পেশিতে টান অনুভব করতেন তিনি। মনে করতেন, একদিন আবার হাঁটতে পারবেন।

দুর্ঘটনার প্রায় চার সপ্তাহ পর পায়ে প্রচণ্ড চুলকানি শুরু হয়। চুলকানি মেটাতে তিনি কম্বলের নিচে হাত বাড়ান। কিন্তু পায়ের বদলে অনুভব করেন ব্যান্ডেজ।

কম্বল সরিয়ে নিচে তাকিয়ে তিনি দেখেন, দুই পা হাঁটুর সামান্য নিচ থেকেই নেই।

দুর্ঘটনার সময় গাড়ির পেছনের একটি ধাতব অংশ তাঁর দুই পা কেটে দিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, সেই অংশই আবার তাঁর জীবনও বাঁচিয়েছিল। পায়ের ক্ষত এত শক্তভাবে চেপে ছিল যে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু এর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় তাঁর শৈশবের সবচেয়ে বড় স্বপ্নও—অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় ফুটবল দলে খেলার স্বপ্ন।

মনে হয়েছিল, সবকিছুই হারিয়ে ফেলেছেন

Two men sitting on a hospital bed – one older in blue tracksuit and the other a teen in a white T-shirt, surrounded by lights, wires and get well cards

হাসপাতালে সাত সপ্তাহ কাটাতে হয় রবকে। নার্সদের সামনে নগ্ন হয়ে গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করা—সবকিছু তাঁর আত্মসম্মানে গভীর আঘাত করেছিল।

তাঁর মনে হতে থাকে, তিনি সব হারিয়েছেন।

বন্ধুদের হারিয়েছেন, দুই পা হারিয়েছেন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন হারিয়েছেন। তাঁর মনে হয়েছিল, নিজের মর্যাদাটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।

প্রতিদিন রাতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমাতেন। নিজের বেঁচে যাওয়াকে অপরাধ বলে মনে হতে শুরু করে। ভাবতেন, তাঁর জায়গায় যদি কোনো বন্ধু বেঁচে থাকত, হয়তো সবার জন্য ভালো হতো।

বিশেষ করে ড্যানিয়েলকে তিনি নিজের কথায় গাড়িতে উঠিয়েছিলেন—এই বিষয়টি তাঁকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেত।

একসময় নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন।

বন্ধুর বাবা-মায়ের একটি কথায় বদলে গেল সব

এক রাতে হাসপাতালে ড্যানিয়েলের বাবা-মা তাঁকে দেখতে আসেন। ড্যানিয়েলের বাবা রবকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তাঁরা রবের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত আনন্দিত।

কথাটি রবের মনে গভীরভাবে আঘাত করে।

তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর বেঁচে থাকা ড্যানিয়েলের পরিবারের জন্য নতুন কোনো কষ্টের কারণ নয়। বরং তাঁর জীবনই হয়তো ড্যানিয়েলের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি পথ।

সেদিন থেকেই তিনি নিজেকে বলতে শুরু করেন, ‘আমি হাল ছাড়তে পারি না।’

Wearing his Team Australia top, Pike stands with his arms folded against a brick wall, smiling softly

প্রথম কয়েক মাস দিনে অসংখ্যবার নিজেকে কথাটি বলতেন। পরে সেই সংখ্যা কমতে থাকে। একসময় আর নিজেকে বলার প্রয়োজনই হলো না।

তখন তিনি উপলব্ধি করেন, তিনি শুধু মৃত বন্ধুদের জন্য বেঁচে নেই—তিনি নিজের জন্যও বেঁচে আছেন।

কৃত্রিম পা নিয়ে আবার মাঠে ফিরলেন

রব তাঁর দুই পা পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই কৃত্রিম পা ব্যবহার শেখেন। লক্ষ্য ছিল স্কুলের বছরের শেষের অনুষ্ঠানে নিজের পায়ে হেঁটে যাওয়া।

পরে আবার ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন। জীবনে আসে নতুন সম্পর্কও।

তবে ভেতরের ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। স্থানীয় সংবাদপত্রে দুর্ঘটনার আগে ছেলেরা মদ্যপ ছিল এবং গাড়িটি চুরি করা হয়েছিল—এমন ভুল খবরও প্রকাশিত হয়। রাস্তায় অপরিচিত মানুষ তাঁকে থামিয়ে প্রশ্ন করত, তাঁরা এমন কী করেছিলেন যে দুর্ঘটনা ঘটল।

মানসিক যন্ত্রণা ভুলতে তিনি অতিরিক্ত মদ্যপান শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ছয় মাস পর তিনি বুঝতে পারেন, পেশাদার মানসিক সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

হুইলচেয়ার বাস্কেটবল খুলে দিল নতুন দরজা

রবের বাবা তাঁকে হুইলচেয়ার বাস্কেটবল খেলার পরামর্শ দেন। শুরুতে রবের ধারণা ছিল, এটি হয়তো কেবল প্রতিবন্ধী মানুষের একটি খেলা।

কিন্তু প্রথম ম্যাচ দেখার পর তাঁর ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়।

দেখলেন, খেলোয়াড়েরা প্রচণ্ড গতি ও শক্তি নিয়ে মাঠে ছুটছেন, একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফুটবলের জায়গায় যেন নতুন এক পৃথিবী খুঁজে পেলেন তিনি।

এরপর নিজেই খেলায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। পার্থ হুইলক্যাটস ও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেন। পরে স্পেনে গিয়ে পেশাদারভাবেও খেলেন।

A man’s hand to left touches his upper arm where a cross and a white dove are tattoo on his skin

বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার নারী তিন-জনের হুইলচেয়ার বাস্কেটবল দলের প্রধান কোচ। কমনওয়েলথ গেমসের এক আসরে তাঁর দল ব্রোঞ্জ পদকও জেতে।

২০ বছর পরও ফিরে এসেছিল সেই দুর্ঘটনার ভয়

দুর্ঘটনার দুই দশকেরও বেশি সময় পর করোনাকালের সময়ে আবার তীব্র আতঙ্কের অভিজ্ঞতা হয় রবের।

একসময় গাড়ি চালানোর সময়ও তাঁর আতঙ্কের সমস্যা ফিরে আসে। গাড়ির ভেতর নিজেকে আটকা মনে হচ্ছিল। দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে আটকে থাকার সেই পুরোনো অনুভূতি যেন আবার ফিরে আসে।

তিনি বুঝতে পারেন, আগের চিকিৎসায় সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। মানুষের মন অনেক সময় নিরাপদ অবস্থায় পৌঁছানোর পর পুরোনো আঘাত সামনে নিয়ে আসে।

আবার মানসিক চিকিৎসা নেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই ভয়ও কাটিয়ে ওঠেন।

জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন

এখন ৪৪ বছর বয়সী রব বিবাহিত এবং দুই সন্তানের বাবা। মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া মানুষদের সহায়তাকারী একটি সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদে কাজ করেন। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন।

নিজের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তরুণদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, ১৬-১৭ বছরের ছেলেমেয়েরা যেন আরও দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালায় এবং একই সঙ্গে আরও সহানুভূতিশীল মানুষ হয়ে ওঠে।

দুর্ঘটনার পর নিজেকে তিনি আগের চেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবে দেখেন।

A traditional groom and bride walking back up the aisle at church

তবে জীবনের কঠিন অধ্যায় এখানেই শেষ হয়নি। সম্প্রতি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ১২ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে তাঁকে। পরে জানতে পারেন, তাঁর বংশগতভাবে উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে।

রবের উপলব্ধি এখন খুব সরল—জীবন কতটা কঠিন, সেটি নিয়ে শুধু ভাবলে চলবে না। বরং যা আছে, সেটির মূল্য বুঝতে হবে।

তাঁর ভাষায়, মানুষের শুধু অস্তিত্ব নিয়ে পড়ে থাকার জন্য জন্ম হয়নি। যতদিন বেঁচে থাকা যায়, ততদিন জীবনকে নিজের মতো করে বাঁচতে হবে, মানুষের প্রতি ভালো হতে হবে এবং নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

রব পাইকের জীবনের গল্প তাই শুধু একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি হারানোর পরও বেঁচে থাকার, অপরাধবোধ পেরিয়ে নিজেকে ফিরে পাওয়ার এবং অসম্ভব মনে হওয়া জীবনকে নতুন অর্থ দেওয়ার গল্প।

যা হারিয়েছেন, তার দিকে তাকিয়ে থেমে না থেকে যা আছে, সেটিকে নিয়েই জীবনকে এগিয়ে নেওয়া—রবের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যেন এটাই।

He stands sideways with his arms folded against a red brick wall