রাশিয়ার একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। খাদ্যগুদাম, পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে হামলার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন সুপারমার্কেটে অনেক পণ্যের তাক ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে দামও।
৬৮ বছর বয়সী ভ্যালেন্তিনা স্বেশনিকোভা কিয়েভের একটি সুপারমার্কেটে গিয়ে খালি তাকের মধ্য থেকে সংরক্ষিত মাংস কিনছিলেন। ছোট পেনশনের ওপর নির্ভরশীল এই বৃদ্ধা বলছেন, ইতোমধ্যেই কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে মাংসের দাম বৃদ্ধিতে তিনি উদ্বিগ্ন।
তার ভাষায়, রাশিয়া ইউক্রেনীয়দের জীবনকে ‘দুর্বিষহ ও অসম্ভব’ করে তুলতে চাইছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা তা করতে সফল হচ্ছে।
খাদ্যগুদামে হামলা, বাড়ছে সরবরাহের চাপ
ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের খাদ্যগুদাম ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থার ওপর সাম্প্রতিক হামলার কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। কিয়েভে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আগস্টের শেষ দিক থেকে রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিনই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক হামলায় খাদ্যগুদামের পাশাপাশি অনলাইন পণ্য সরবরাহের কেন্দ্র এবং চিকিৎসাসামগ্রীর মজুতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে শুধু খাদ্য সরবরাহ নয়, সামগ্রিক নগরজীবনের প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

ইউক্রেনের কৃষিনীতি ও খাদ্যমন্ত্রী তারাস ভিসোৎস্কি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির বড় সুপারমার্কেটগুলোর সরবরাহকেন্দ্রগুলোর অনেকগুলো ধ্বংস অথবা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তার মতে, ২০২২ সালে রাশিয়ার হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানির অবকাঠামো। পরবর্তী সময়ে জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের হামলায় দেশের অভ্যন্তরীণ বেসামরিক জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থাকে সরাসরি লক্ষ্য করা হচ্ছে।
খাদ্যের দাম কতটা বাড়তে পারে
খাদ্যগুদাম ও সরবরাহ অবকাঠামোতে হামলার ফলে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের খাদ্যমন্ত্রী ধারণা করছেন, হামলার কারণে খাদ্যের দাম প্রায় আড়াই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ আরও বড় মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন। কিয়েভভিত্তিক একটি বড় খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা দিমিত্রো ক্রিমস্কির মতে, পরিস্থিতির প্রভাব ১৫ শতাংশ পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।
তবে তার মতে, দাম বাড়ার প্রধান কারণ পণ্যের সরাসরি ঘাটতি নয়। বরং হামলা থেকে সরবরাহব্যবস্থাকে রক্ষা করতে ব্যবসাগুলোকে নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
কিয়েভের কাছে তার একটি গুদামে ১ সেপ্টেম্বর হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ লাখ ইউরো মূল্যের পণ্য ধ্বংস হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে তার আরেকটি গুদামে হামলায় প্রায় দেড় কোটি ইউরোর পণ্য নষ্ট হয়েছিল। চলতি বছরের জুলাইয়েও হামলায় আরও প্রায় ১৫ লাখ ইউরোর পণ্য ধ্বংস হয়।

এক গুদামের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
বারবার হামলার পর ব্যবসায়ীরা এখন সরবরাহব্যবস্থার কাঠামো বদলানোর কথা ভাবছেন। ক্রিমস্কি জানান, গুদাম প্রতিবেশী দেশ পোল্যান্ডে সরিয়ে নেওয়া, মাটির নিচে সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরি এবং বিপুল পরিমাণ পণ্য একটি জায়গায় না রেখে কয়েকটি ছোট কেন্দ্রে ভাগ করে রাখার মতো পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
কারণ একটি বড় গুদামে হাজার হাজার পণ্য জমা রাখলে একবার হামলা হলেই বিপুল ক্ষতি হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক হামলার কারণে গুদামের কর্মীরাও দিনে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা কাজ করতে পারছেন। ফলে পণ্য সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
চিকিৎসাসামগ্রীর গুদামেও হামলা
খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি চিকিৎসাসামগ্রীর মজুতও হামলার শিকার হয়েছে। কিয়েভের উপকণ্ঠে মানবিক সহায়তা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ গুদামেও হামলা হয়েছে।
একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের গুদামে হামলার পর সেখানে পুড়ে যাওয়া জ্বালানির গন্ধ ছড়িয়ে ছিল। দমকলকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকাজ চালান। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রায় তিন মাসের ওষুধের মজুত ধ্বংস হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

আতঙ্কে মজুত করছেন না সাধারণ মানুষ
তবে পরিস্থিতি কঠিন হলেও ২০২২ সালের মতো এবার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে খাদ্য মজুত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।
কিয়েভের কাছের একটি সস্তা দামের সুপারমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা ৫৪ বছর বয়সী ইরিনা মেসিয়ানঝিনোভা বলেন, কিছু বাড়তি পণ্য হিসেবে তিনি ওটসের মতো খাবার রেখেছেন। কিন্তু ফলমূল ও শাকসবজি বেশি করে কিনে রাখার কোনো অর্থ তিনি দেখছেন না, কারণ সেগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তার কাছে ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তার চেয়ে প্রতিদিনের সমস্যা মোকাবিলা করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
চার বছরের যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ইউক্রেনীয়রা হামলার মধ্যেও স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিয়েভের একটি কৃষক বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ৩৬ বছর বয়সী ওলেনা ঝুকের কথায়, এটি যুদ্ধের প্রথম হামলা নয়। তারা টিকে থাকার চেষ্টা করবেন, অনাহারে মারা যাবেন না।
তবে খাদ্যগুদাম, পরিবহনকেন্দ্র ও চিকিৎসাসামগ্রীর মজুতে ধারাবাহিক হামলা ইউক্রেনের জন্য যুদ্ধের একটি নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজন—খাদ্য ও ওষুধ—সরবরাহব্যবস্থাও এখন সরাসরি সংঘাতের অংশ হয়ে উঠছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















