শহরের রাস্তা, মোড় ও পার্কিংয়ের জায়গা—দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থানকে মূলত গাড়ি চলাচলের সুবিধার জন্যই পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র গরম, আকস্মিক ভারী বৃষ্টি ও নগরজীবনের নানা সংকট বাড়তে থাকায় ইউরোপের বেশ কিছু শহর সেই পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। গাড়ির জন্য তৈরি জায়গাগুলোকে ধীরে ধীরে মানুষের জন্য উন্মুক্ত সবুজ ও জনবান্ধব পরিসরে রূপান্তর করা হচ্ছে।
দুই বছর পরপর দেওয়া ইউরোপীয় নগর জনপরিসর পুরস্কারের এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় এমন পাঁচটি প্রকল্প জায়গা পেয়েছে। এসব প্রকল্পে কোথাও গাড়ির গোলচত্বর পরিণত হয়েছে পানির খেলাঘরে, কোথাও ব্যস্ত সড়কের জায়গায় তৈরি হয়েছে সবুজ পরিসর, আবার কোথাও বিশাল পার্কিং এলাকা বদলে গেছে গাছপালায় ভরা উদ্যানে।
গাড়ির জায়গায় মানুষের জন্য গোসলের স্থান
স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় শহর লগরোনিওর ‘রাউন্ড অ্যাবাউট বাথস’ প্রকল্পটি তালিকার অন্যতম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। স্থপতি লিওপোল্ড বানচিনি শহরের ব্যস্ত একটি সড়কের মাঝখানে থাকা কংক্রিটের একটি অংশকে নতুনভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। জায়গাটিতে আগে একটি ভাঙা ঝরনা ছিল, যা কার্যত মানুষের ব্যবহারের বাইরে পড়ে ছিল।
উনিশ শতকের গণগোসলের স্থান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বানচিনির প্রতিষ্ঠান সেখানে কাঠের প্যানেল দিয়ে একটি সরল কাঠামো তৈরি করে। পুরোনো পানির আধারকে অগভীর পানির পুকুরে পরিণত করা হয়। পাশাপাশি পুরোনো লোহার ফুলের টব ব্যবহার করা হয় আগুন জ্বালানোর পাত্র হিসেবে, যার মাধ্যমে বাষ্পকক্ষ গরম করা হতো।

বানচিনির মতে, শহরের বিপুল পরিমাণ জনপরিসর গাড়ির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে শিশুদের নিয়ে শহরে চলাচল করাও অনেক পরিবারের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। গাড়িকেন্দ্রিক পরিকল্পনা মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতাকেও সংকুচিত করছে।
তবে প্রকল্পটি স্থায়ীভাবে চালু হয়নি। ২০২৫ সালের জুনে একটি স্থাপত্য উৎসব উপলক্ষে মাত্র এক সপ্তাহের জন্য কাঠামোটি স্থাপন করা হয়েছিল। আর এই স্বল্পস্থায়ী উদ্যোগই দেখিয়ে দিয়েছে, গাড়িকেন্দ্রিক অবকাঠামোকে স্থায়ীভাবে বদলে ফেলা কতটা কঠিন।
স্থায়ীভাবে নির্মাণ করতে গেলে নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠত। কারণ গোলচত্বরটিতে প্রবেশের জন্য পথচারীদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাস্তা পার হতে হতো। বানচিনির ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়ি চলাচল সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তন করাও সহজ নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রায়ই পৌর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নিতে হয়। আবার রাজনৈতিক নেতারাও গাড়ি চলাচলের বিষয়ে পরিবর্তন আনতে সতর্ক থাকেন, কারণ ভোট হারানোর আশঙ্কা থাকে।
ব্যস্ত সড়কের নিচে সবুজ নগর
স্পেনের বার্সেলোনার ‘প্লাসা দে লেস গ্লোরিয়েস কাতালানেস’ প্রকল্পটি অবশ্য আরও স্থায়ী সাফল্যের উদাহরণ তৈরি করেছে। একসময় শহরের বিভিন্ন দিক থেকে গাড়ি এই বিশাল সংযোগস্থলে এসে মিলত। পরে এর তিনটি প্রধান সড়কের একটি অংশ মাটির নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে ওপরে তৈরি করার সুযোগ পাওয়া যায় বড় সবুজ জনপরিসরের।
এখন সেই জায়গায় গাছপালা, খোলা মাঠ এবং মানুষের বিনোদনের নানা ব্যবস্থা রয়েছে। শহরের বাসিন্দাদের কাছেও নতুন পরিসরটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি খোলা আকাশের নিচে টেবিল টেনিসের মতো খেলাধুলার ব্যবস্থাও সেখানে দেখা যায়।
এই প্রকল্প দেখিয়েছে, গাড়ির জন্য ব্যবহৃত বড় অবকাঠামো পুরোপুরি বাদ না দিয়েও তার একটি অংশকে মানুষের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

পার্কিংয়ের জায়গায় ৫০০ গাছ
বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প শহরের ‘জুইডপার্ক’ও গাড়িকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা বদলের আরেকটি উদাহরণ। শহরের দক্ষিণাঞ্চলের জুইড এলাকায় প্রায় ৮০০ মিটার দীর্ঘ এই সবুজ পরিসরটি একসময় বড় একটি উন্মুক্ত পার্কিং এলাকা ছিল।
২০১৫ সালে পৌর কর্তৃপক্ষ জায়গাটিকে জনপরিসরে রূপান্তরের জন্য নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় নগর স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ট্র্যাক্টেবল।
প্রতিষ্ঠানটি পার্কের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা খনন করে সেখানে প্রায় দেড় মিটার গভীর মাটির স্তর তৈরি করে। এর ফলে গাছ ও ঝোপঝাড় দ্রুত বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়।
২০২৪ সালে পার্কটি চালু হওয়ার দুই বছর পর সেখানে প্রায় ৫০০টি নতুন গাছ দুই সারিতে বেড়ে উঠেছে। তীব্র গরমের সময় এসব গাছের ছায়া স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য স্বস্তি তৈরি করছে।
গরমের পাশাপাশি বৃষ্টির কথাও মাথায়
জুইডপার্ক শুধু তাপমাত্রা কমানোর জন্য পরিকল্পিত হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে। সেই বিষয়টিও মাথায় রেখে পার্কের কিছু অংশ নিচু করে তৈরি করা হয়েছে।

এসব নিচু স্থান বৃষ্টির পানি ধরে রাখে এবং এক ধরনের বৃষ্টিবাগানের ভূমিকা পালন করে। নির্মাণকাজের সময় মাটির নিচ থেকে পাওয়া পুরোনো পাথরের টুকরা ও জলসহিষ্ণু উদ্ভিদ দিয়ে এসব জায়গা সাজানো হয়েছে। পরে এগুলো শিশুদের খেলাধুলার জনপ্রিয় স্থানেও পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের অন্যান্য এলাকার তুলনায় পার্কটির ভেতরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত স্থপতি বার্ট ভান গাসেন বলেন, সেখানে গাছপালার বৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত হয়েছে।
গাড়ি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি
তবে গাড়িকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা থেকে সরে আসার এই উদ্যোগেও বাস্তবতার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। জুইডপার্কের নিচে চার তলা জুড়ে নতুন পার্কিং ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে প্রায় দুই হাজার গাড়ি রাখার সুযোগ রয়েছে। আগের মতো এটি বিনামূল্যে নয় এবং পার্কে সরাসরি গাড়ি ঢোকার সুযোগও রাখা হয়নি।
প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত স্থপতিরাও স্বীকার করছেন, এত বড় পার্কিং ব্যবস্থা পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে তাদের যুক্তি, শহরের বাইরে পার্কিং ব্যবস্থা তৈরি করলে হয়তো এত বড় একটি নগর উদ্যান নির্মাণের রাজনৈতিক ও বাস্তবসম্মত সুযোগ তৈরি হতো না।
অর্থাৎ গাড়িকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং তার জন্য নির্ধারিত জায়গার ব্যবহার কমিয়ে মানুষের জন্য বেশি উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করাই আপাতত বাস্তবসম্মত পথ হয়ে উঠছে।

ইউরোপের শহর পরিকল্পনায় নতুন বার্তা
এবারের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্পেন ও বেলজিয়ামের প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিম পর্তুগালের ‘লেসা গ্রিন করিডর’ এবং ইতালির ভিচেঞ্জার ‘পিস পার্ক’ও রয়েছে।
বার্সেলোনার সমসাময়িক সংস্কৃতি কেন্দ্র এবং ইউরোপের আরও ছয়টি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই পুরস্কারের আয়োজন করছে। আগামী ১৫ অক্টোবর বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।
তবে পুরস্কারের ফলাফল যা-ই হোক, তালিকাভুক্ত প্রকল্পগুলোর বড় বার্তা ইতোমধ্যে স্পষ্ট—শহরের রাস্তা ও অবকাঠামো শুধু গাড়ির চলাচলের জন্য নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ছায়া, পানি, গাছপালা, হাঁটার জায়গা, খেলাধুলা এবং মানুষের মিলনস্থলও নগর পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছে। ইউরোপের বিভিন্ন শহরের এই পরিবর্তন ভবিষ্যতের নগরজীবনে গাড়ির আধিপত্য কমিয়ে মানুষ ও প্রকৃতিকে আরও বেশি জায়গা দেওয়ার একটি নতুন পথ দেখাচ্ছে।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















