০১:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খাবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা যে ৫ খাবার এড়িয়ে চলেন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই, তীব্র গরমের সঙ্গে বন্যা-আগুনের তাণ্ডব হেইডেন প্যানেটিয়ার: পর্দার কান্নার আড়ালে ছিল এক কঠিন জীবনসংগ্রাম যুদ্ধের আগুন এবার রাশিয়ার সাধারণ জীবনেও, ইউক্রেনের হামলার নিশানায় ওয়াইল্ডবেরিজ সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ভরসা মারুফা টাকার বিনিময়ে ট্রাম্পের পোস্ট আগে পাওয়ার সুযোগ, তীব্র বিতর্ক ড্রোন আতঙ্কে জেলেনস্কির নরওয়ে যাত্রা থমকে গেল হরমুজে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় নৌ-সংঘাত নিজের মাটিতে বিশ্বকাপ: মরক্কো কি এবার ফাইনালে উঠতে পারবে? দুই সেট পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে তিয়াফো

১৬ বছরের অভিমান ভেঙে একই মঞ্চে দুই ভাই, ওয়েসিসের প্রত্যাবর্তনে মিলল হারানো সুর

একসময় তাঁদের সম্পর্কের ফাটল এতটাই গভীর হয়েছিল যে, একটি গিটারের আঘাতের মতোই ভেঙে গিয়েছিল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ওয়েসিস। তারপর কেটে গেছে ১৬ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে দুই ভাই লিয়াম ও নোয়েল গ্যালাঘার যেন দুই ভিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা।

কিন্তু সংগীত কখনো কখনো এমন কিছু করতে পারে, যা কথায় সম্ভব হয় না। সেই অসম্ভবেরই গল্প এবার উঠে এসেছে নতুন প্রামাণ্যচিত্রে—‘ডোন্ট লুক ব্যাক ইন অ্যাঙ্গার’। এটি শুধু একটি ব্যান্ডের ফিরে আসার কাহিনি নয়; বরং দুই ভাইয়ের দীর্ঘ অভিমান, দূরত্ব ও নীরব ক্ষমার গল্প।

কার্ডিফে ফিরে আসার সেই মুহূর্ত

গত বছরের ৪ জুলাই। ওয়েলসের কার্ডিফের বিশাল স্টেডিয়ামে অপেক্ষা করছিলেন প্রায় ৭৪ হাজার ৫০০ দর্শক। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ওয়েসিস আবার মঞ্চে উঠতে যাচ্ছে। দর্শকদের উন্মাদনা তখন তুঙ্গে।

কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর মাত্র ২০ মিনিট আগে লিয়ামের কোনো দেখা নেই।

নোয়েলও তখন উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছেন। এত বছর পর দুই ভাই একসঙ্গে ফিরেছেন—কিন্তু শেষ মুহূর্তে কি আবারও সবকিছু ভেঙে পড়বে?

ঠিক তখনই বদলে যায় দৃশ্যপট।

ক্যামেরার পর্দা কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকার হয়ে যায়। আবার যখন ছবি ফিরে আসে, দেখা যায় লিয়াম ও নোয়েল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তারপর তাঁরা একসঙ্গে মঞ্চে পা রাখেন।

আর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয় ৭৪ হাজারের বেশি কণ্ঠের উল্লাস।

দর্শকদের সেই প্রতিক্রিয়া শুধু একটি ব্যান্ডের প্রত্যাবর্তনের আনন্দ ছিল না। যেন বহু বছর ধরে অপেক্ষা করা একটি সম্পর্কের পুনর্জন্মের সাক্ষী হচ্ছিল পুরো স্টেডিয়াম।

Oasis' first gig in 16 years sends fans supersonic: “thank you for putting  up with us” | South China Morning Post

১৬ বছর পর মুখোমুখি

ওয়েসিস ভেঙে যাওয়ার পেছনে দুই ভাইয়ের তীব্র বিরোধ ছিল অন্যতম কারণ। ২০০৯ সালে প্যারিসে একটি অনুষ্ঠানের আগে তাঁদের সংঘর্ষ চরমে পৌঁছায়। এরপরই শেষ হয় ওয়েসিসের এক অধ্যায়।

কিন্তু নতুন করে একসঙ্গে কাজ করার সময়ও কেউ জানতেন না, কী অপেক্ষা করছে সামনে।

নির্মাতারা দরজার দিকে ক্যামেরা তাক করে রেখেছিলেন। লিয়াম কখন আসবেন, সেটিও নিশ্চিত ছিল না।

তাঁদের মনে প্রশ্ন ছিল—দুই ভাই কি আবার ঝগড়ায় জড়াবেন, নাকি একে অপরকে আলিঙ্গন করবেন?

বাস্তবে ঘটল অন্য কিছু।

লিয়াম ঘরে ঢুকে ব্যাগ নামিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন, ‘তাহলে প্রস্তুত তো?’

এই একটি সাধারণ বাক্য যেন ১৬ বছরের দূরত্বকে মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য করে দিল।

কথা নয়, গানই কাছে আনল দুই ভাইকে

প্রামাণ্যচিত্রটির সবচেয়ে গভীর দিক সম্ভবত এখানেই। দুই ভাইয়ের সম্পর্কের পরিবর্তন কোনো নাটকীয় ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে ঘটেনি।

তাঁরা একে অপরের সামনে বসে পুরোনো সব অভিযোগের হিসাব মেলাননি। বরং গান গাইতে গাইতেই ধীরে ধীরে ফিরে পেয়েছেন একে অপরকে।

প্রতিদিন মহড়া শেষে লিয়াম ব্যাগ তুলে চলে যেতেন। কিন্তু কনসার্ট শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে।

এক রাত, দুই রাত, তিন রাত—প্রতিটি মঞ্চে তাঁদের দূরত্ব একটু একটু করে কমতে থাকে।

নির্মাতাদের চোখে, পুনর্মিলনটি ঘটেছিল মঞ্চের ওপর। সংগীতই যেন দুই ভাইয়ের মাঝখানে তৈরি হওয়া বিশাল দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরায়।

Noel Gallagher performs during the first of Oasis’ sellout comeback shows in Cardiff on Friday. Photo: Reuters

দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষের সামনে প্রত্যাবর্তন

ওয়েসিসের প্রত্যাবর্তন সফরে ১৪টি দেশে, পাঁচটি মহাদেশে মোট ৪১টি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষ সরাসরি তাঁদের গান শুনেছেন।

তবে এই প্রামাণ্যচিত্র শুধু বিশাল মঞ্চ, আলো কিংবা দর্শকের উল্লাস দেখায়নি। ক্যামেরা ঘুরেছে মানুষের মুখের দিকেও।

কারও চোখে জল, কারও মুখে বিস্ময়, কারও কাছে গান হয়ে উঠেছে জীবনের কঠিন সময় পার হওয়ার অবলম্বন।

এক দক্ষিণ কোরীয় নারী জানিয়েছেন, ওয়েসিসের গান তাঁকে গভীর বিষণ্নতার সময় পার হতে সাহায্য করেছে।

অন্য এক তরুণী কনসার্টে কান্নায় ভেঙে পড়লে অপরিচিত একজন তাঁকে সান্ত্বনা দেন।

আর এক দর্শক মেঝেতে বসে প্রার্থনা করতে করতে গেয়ে চলেন ‘স্লাইড অ্যাওয়ে’।

এসব দৃশ্য দেখায়, ওয়েসিসের গান কেবল গান হয়ে থাকেনি। বহু মানুষের জীবনের স্মৃতি, ক্ষত, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার গল্পের সঙ্গে তা মিশে গেছে।

ম্যানচেস্টারের সেই রাতের স্মৃতিও ফিরে আসে

প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে ২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এক তরুণীর কথাও।

সেই ভয়াবহ ঘটনার পর তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার অপরাধবোধে ভুগেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে একটি উপলব্ধি তাঁকে বদলে দেয়—অতীতের দিকে শুধু ক্ষোভ নিয়ে তাকিয়ে থাকলে জীবন সামনে এগোয় না।

‘রাগ করে পেছনে ফিরে তাকিও না’—ওয়েসিসের এই গানের কথাই যেন তাঁর জীবনের সঙ্গে নতুন অর্থে মিশে যায়।

শৈশবের শহর থেকে এল অদ্ভুত এক বার্তা

দুই ভাইয়ের সম্পর্কের গল্পকে আরও গভীর করতে নির্মাতারা ফিরে যান তাঁদের শৈশবের শহর ম্যানচেস্টারের বার্নেজ এলাকায়।

সেখানে একটি গির্জায় চিত্রগ্রহণের অনুমতি নেওয়া হয়। কিন্তু চিত্রগ্রহণের দিন যে ঘটনা ঘটল, সেটি যেন প্রামাণ্যচিত্রের গল্পেরই অংশ হয়ে গেল।

সেদিন ধর্মযাজক বাইবেলের এমন একটি অংশ পাঠ করেন যেখানে ভাইয়ের অপরাধ ক্ষমা করার কথা বলা হয়েছে। তিনি এরপর পুরো ধর্মোপদেশেই ক্ষমা ও ভ্রাতৃত্বের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।

নির্মাতাদের কাছে এটি ছিল এক আশ্চর্য সমাপতন।

যেন ১৬ বছরের পুরোনো এক সম্পর্ককে ঘিরে সময় নিজেই একটি বার্তা রেখে গেল—কিছু অভিমান যত গভীরই হোক, ক্ষমার দরজা পুরোপুরি বন্ধ থাকে না।

Oasis stuns fans with greatest hits at first concert in over a decade

পুরোনো নোয়েল, নতুন নোয়েল

প্রামাণ্যচিত্রে নোয়েলের পুরোনো একটি সাক্ষাৎকারও রয়েছে। সেখানে তিনি নিজের এমন এক স্বভাবের কথা বলেছিলেন, যার কারণে তিনি সহজে কাউকে ক্ষমা করতে পারেন না।

কিন্তু নতুন গল্পে সেই নোয়েলকেই দেখা যায় অন্যরকমভাবে।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছু। যে ছোটখাটো বিষয়গুলো একসময় দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরক্তি তৈরি করত, সেগুলো এখন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অভিমান যেন ধীরে ধীরে তার ধার হারিয়েছে।

আনন্দের মাঝেও নেমে এসেছিল শোক

প্রত্যাবর্তন সফরজুড়ে সব মুহূর্ত অবশ্য আনন্দের ছিল না।

সাও পাওলোতে অনুষ্ঠান চলাকালে ওয়েসিস জানতে পারে, স্টোন রোজেসের বাসিস্ট গ্যারি ‘মানি’ মাউনফিল্ড মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

খবরটি শুনে ব্যান্ডের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে শোক।

লিয়াম ‘লাইভ ফরএভার’ গানটি উৎসর্গ করেন তাঁদের প্রিয় বন্ধু ও নায়ককে।

আর নোয়েল গিটার বাজানোর সময় মঞ্চের ওপর মাউনফিল্ডের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন।

সেই পরিবেশনা হয়তো নিখুঁততার বিচারে সেরা ছিল না। কিন্তু আবেগের বিচারে সেটিই হয়ে ওঠে সফরের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।

শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে দুই ভাই

প্রামাণ্যচিত্রের শেষভাগে আসে সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দৃশ্য—লিয়াম ও নোয়েলের যৌথ সাক্ষাৎকার।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর তাঁদের একসঙ্গে বসে কথা বলতে দেখা যায়।

তাঁরা একে অপরের কাজের প্রশংসা করেন। পুরোনো দিনের কথা মনে করে হাসেন। ওয়েসিসের সেই অগোছালো, উন্মাদ দিনগুলোর স্মৃতিও ফিরে আসে।

নোয়েল জানান, এখন তাঁরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি যোগাযোগ রাখেন।

Oasis Ends a 16-Year Pause With a Familiar Goal: Conquering America - The  New York Times

এমনকি তিনি স্বীকার করেন, লিয়াম কতটা মজার মানুষ—সেটিও তিনি যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।

একসময় যে ছোট ছোট অভ্যাস একে অপরকে বিরক্ত করত, সেগুলোও এখন আর তেমন চোখে পড়ে না।

শেষ কথা

ওয়েসিসের প্রত্যাবর্তনের গল্প তাই কেবল একটি জনপ্রিয় ব্যান্ডের মঞ্চে ফিরে আসার গল্প নয়।

এটি দুই ভাইয়ের গল্প—যাঁরা ১৬ বছর দূরে থেকেও একে অপরের জীবন থেকে পুরোপুরি মুছে যেতে পারেননি।

এটি অভিমানের গল্প, আবার সেই অভিমান ছাড়িয়ে ওঠার গল্পও।

এখানে ক্ষমা চাওয়ার কোনো বড় ঘোষণা নেই, নেই নাটকীয় কোনো আলিঙ্গন। আছে শুধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গান গাওয়া, একে অপরের উপস্থিতি মেনে নেওয়া এবং সময়ের সঙ্গে পুরোনো ক্ষতকে শুকিয়ে যেতে দেওয়া।

হয়তো এটাই এই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে সুন্দর দিক।

কখনো কখনো মানুষ কথা দিয়ে নয়, নীরবতার মধ্য দিয়েই ক্ষমা করে। আর কখনো কখনো একটি গানই দুই মানুষের মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া সেতুটি আবার তৈরি করে দেয়।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

খাবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা যে ৫ খাবার এড়িয়ে চলেন

১৬ বছরের অভিমান ভেঙে একই মঞ্চে দুই ভাই, ওয়েসিসের প্রত্যাবর্তনে মিলল হারানো সুর

১১:১২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় তাঁদের সম্পর্কের ফাটল এতটাই গভীর হয়েছিল যে, একটি গিটারের আঘাতের মতোই ভেঙে গিয়েছিল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ওয়েসিস। তারপর কেটে গেছে ১৬ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে দুই ভাই লিয়াম ও নোয়েল গ্যালাঘার যেন দুই ভিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা।

কিন্তু সংগীত কখনো কখনো এমন কিছু করতে পারে, যা কথায় সম্ভব হয় না। সেই অসম্ভবেরই গল্প এবার উঠে এসেছে নতুন প্রামাণ্যচিত্রে—‘ডোন্ট লুক ব্যাক ইন অ্যাঙ্গার’। এটি শুধু একটি ব্যান্ডের ফিরে আসার কাহিনি নয়; বরং দুই ভাইয়ের দীর্ঘ অভিমান, দূরত্ব ও নীরব ক্ষমার গল্প।

কার্ডিফে ফিরে আসার সেই মুহূর্ত

গত বছরের ৪ জুলাই। ওয়েলসের কার্ডিফের বিশাল স্টেডিয়ামে অপেক্ষা করছিলেন প্রায় ৭৪ হাজার ৫০০ দর্শক। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ওয়েসিস আবার মঞ্চে উঠতে যাচ্ছে। দর্শকদের উন্মাদনা তখন তুঙ্গে।

কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর মাত্র ২০ মিনিট আগে লিয়ামের কোনো দেখা নেই।

নোয়েলও তখন উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছেন। এত বছর পর দুই ভাই একসঙ্গে ফিরেছেন—কিন্তু শেষ মুহূর্তে কি আবারও সবকিছু ভেঙে পড়বে?

ঠিক তখনই বদলে যায় দৃশ্যপট।

ক্যামেরার পর্দা কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকার হয়ে যায়। আবার যখন ছবি ফিরে আসে, দেখা যায় লিয়াম ও নোয়েল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তারপর তাঁরা একসঙ্গে মঞ্চে পা রাখেন।

আর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয় ৭৪ হাজারের বেশি কণ্ঠের উল্লাস।

দর্শকদের সেই প্রতিক্রিয়া শুধু একটি ব্যান্ডের প্রত্যাবর্তনের আনন্দ ছিল না। যেন বহু বছর ধরে অপেক্ষা করা একটি সম্পর্কের পুনর্জন্মের সাক্ষী হচ্ছিল পুরো স্টেডিয়াম।

Oasis' first gig in 16 years sends fans supersonic: “thank you for putting  up with us” | South China Morning Post

১৬ বছর পর মুখোমুখি

ওয়েসিস ভেঙে যাওয়ার পেছনে দুই ভাইয়ের তীব্র বিরোধ ছিল অন্যতম কারণ। ২০০৯ সালে প্যারিসে একটি অনুষ্ঠানের আগে তাঁদের সংঘর্ষ চরমে পৌঁছায়। এরপরই শেষ হয় ওয়েসিসের এক অধ্যায়।

কিন্তু নতুন করে একসঙ্গে কাজ করার সময়ও কেউ জানতেন না, কী অপেক্ষা করছে সামনে।

নির্মাতারা দরজার দিকে ক্যামেরা তাক করে রেখেছিলেন। লিয়াম কখন আসবেন, সেটিও নিশ্চিত ছিল না।

তাঁদের মনে প্রশ্ন ছিল—দুই ভাই কি আবার ঝগড়ায় জড়াবেন, নাকি একে অপরকে আলিঙ্গন করবেন?

বাস্তবে ঘটল অন্য কিছু।

লিয়াম ঘরে ঢুকে ব্যাগ নামিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন, ‘তাহলে প্রস্তুত তো?’

এই একটি সাধারণ বাক্য যেন ১৬ বছরের দূরত্বকে মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য করে দিল।

কথা নয়, গানই কাছে আনল দুই ভাইকে

প্রামাণ্যচিত্রটির সবচেয়ে গভীর দিক সম্ভবত এখানেই। দুই ভাইয়ের সম্পর্কের পরিবর্তন কোনো নাটকীয় ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে ঘটেনি।

তাঁরা একে অপরের সামনে বসে পুরোনো সব অভিযোগের হিসাব মেলাননি। বরং গান গাইতে গাইতেই ধীরে ধীরে ফিরে পেয়েছেন একে অপরকে।

প্রতিদিন মহড়া শেষে লিয়াম ব্যাগ তুলে চলে যেতেন। কিন্তু কনসার্ট শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে।

এক রাত, দুই রাত, তিন রাত—প্রতিটি মঞ্চে তাঁদের দূরত্ব একটু একটু করে কমতে থাকে।

নির্মাতাদের চোখে, পুনর্মিলনটি ঘটেছিল মঞ্চের ওপর। সংগীতই যেন দুই ভাইয়ের মাঝখানে তৈরি হওয়া বিশাল দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরায়।

Noel Gallagher performs during the first of Oasis’ sellout comeback shows in Cardiff on Friday. Photo: Reuters

দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষের সামনে প্রত্যাবর্তন

ওয়েসিসের প্রত্যাবর্তন সফরে ১৪টি দেশে, পাঁচটি মহাদেশে মোট ৪১টি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষ সরাসরি তাঁদের গান শুনেছেন।

তবে এই প্রামাণ্যচিত্র শুধু বিশাল মঞ্চ, আলো কিংবা দর্শকের উল্লাস দেখায়নি। ক্যামেরা ঘুরেছে মানুষের মুখের দিকেও।

কারও চোখে জল, কারও মুখে বিস্ময়, কারও কাছে গান হয়ে উঠেছে জীবনের কঠিন সময় পার হওয়ার অবলম্বন।

এক দক্ষিণ কোরীয় নারী জানিয়েছেন, ওয়েসিসের গান তাঁকে গভীর বিষণ্নতার সময় পার হতে সাহায্য করেছে।

অন্য এক তরুণী কনসার্টে কান্নায় ভেঙে পড়লে অপরিচিত একজন তাঁকে সান্ত্বনা দেন।

আর এক দর্শক মেঝেতে বসে প্রার্থনা করতে করতে গেয়ে চলেন ‘স্লাইড অ্যাওয়ে’।

এসব দৃশ্য দেখায়, ওয়েসিসের গান কেবল গান হয়ে থাকেনি। বহু মানুষের জীবনের স্মৃতি, ক্ষত, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার গল্পের সঙ্গে তা মিশে গেছে।

ম্যানচেস্টারের সেই রাতের স্মৃতিও ফিরে আসে

প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে ২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এক তরুণীর কথাও।

সেই ভয়াবহ ঘটনার পর তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার অপরাধবোধে ভুগেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে একটি উপলব্ধি তাঁকে বদলে দেয়—অতীতের দিকে শুধু ক্ষোভ নিয়ে তাকিয়ে থাকলে জীবন সামনে এগোয় না।

‘রাগ করে পেছনে ফিরে তাকিও না’—ওয়েসিসের এই গানের কথাই যেন তাঁর জীবনের সঙ্গে নতুন অর্থে মিশে যায়।

শৈশবের শহর থেকে এল অদ্ভুত এক বার্তা

দুই ভাইয়ের সম্পর্কের গল্পকে আরও গভীর করতে নির্মাতারা ফিরে যান তাঁদের শৈশবের শহর ম্যানচেস্টারের বার্নেজ এলাকায়।

সেখানে একটি গির্জায় চিত্রগ্রহণের অনুমতি নেওয়া হয়। কিন্তু চিত্রগ্রহণের দিন যে ঘটনা ঘটল, সেটি যেন প্রামাণ্যচিত্রের গল্পেরই অংশ হয়ে গেল।

সেদিন ধর্মযাজক বাইবেলের এমন একটি অংশ পাঠ করেন যেখানে ভাইয়ের অপরাধ ক্ষমা করার কথা বলা হয়েছে। তিনি এরপর পুরো ধর্মোপদেশেই ক্ষমা ও ভ্রাতৃত্বের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।

নির্মাতাদের কাছে এটি ছিল এক আশ্চর্য সমাপতন।

যেন ১৬ বছরের পুরোনো এক সম্পর্ককে ঘিরে সময় নিজেই একটি বার্তা রেখে গেল—কিছু অভিমান যত গভীরই হোক, ক্ষমার দরজা পুরোপুরি বন্ধ থাকে না।

Oasis stuns fans with greatest hits at first concert in over a decade

পুরোনো নোয়েল, নতুন নোয়েল

প্রামাণ্যচিত্রে নোয়েলের পুরোনো একটি সাক্ষাৎকারও রয়েছে। সেখানে তিনি নিজের এমন এক স্বভাবের কথা বলেছিলেন, যার কারণে তিনি সহজে কাউকে ক্ষমা করতে পারেন না।

কিন্তু নতুন গল্পে সেই নোয়েলকেই দেখা যায় অন্যরকমভাবে।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছু। যে ছোটখাটো বিষয়গুলো একসময় দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরক্তি তৈরি করত, সেগুলো এখন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অভিমান যেন ধীরে ধীরে তার ধার হারিয়েছে।

আনন্দের মাঝেও নেমে এসেছিল শোক

প্রত্যাবর্তন সফরজুড়ে সব মুহূর্ত অবশ্য আনন্দের ছিল না।

সাও পাওলোতে অনুষ্ঠান চলাকালে ওয়েসিস জানতে পারে, স্টোন রোজেসের বাসিস্ট গ্যারি ‘মানি’ মাউনফিল্ড মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

খবরটি শুনে ব্যান্ডের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে শোক।

লিয়াম ‘লাইভ ফরএভার’ গানটি উৎসর্গ করেন তাঁদের প্রিয় বন্ধু ও নায়ককে।

আর নোয়েল গিটার বাজানোর সময় মঞ্চের ওপর মাউনফিল্ডের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন।

সেই পরিবেশনা হয়তো নিখুঁততার বিচারে সেরা ছিল না। কিন্তু আবেগের বিচারে সেটিই হয়ে ওঠে সফরের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।

শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে দুই ভাই

প্রামাণ্যচিত্রের শেষভাগে আসে সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দৃশ্য—লিয়াম ও নোয়েলের যৌথ সাক্ষাৎকার।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর তাঁদের একসঙ্গে বসে কথা বলতে দেখা যায়।

তাঁরা একে অপরের কাজের প্রশংসা করেন। পুরোনো দিনের কথা মনে করে হাসেন। ওয়েসিসের সেই অগোছালো, উন্মাদ দিনগুলোর স্মৃতিও ফিরে আসে।

নোয়েল জানান, এখন তাঁরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি যোগাযোগ রাখেন।

Oasis Ends a 16-Year Pause With a Familiar Goal: Conquering America - The  New York Times

এমনকি তিনি স্বীকার করেন, লিয়াম কতটা মজার মানুষ—সেটিও তিনি যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।

একসময় যে ছোট ছোট অভ্যাস একে অপরকে বিরক্ত করত, সেগুলোও এখন আর তেমন চোখে পড়ে না।

শেষ কথা

ওয়েসিসের প্রত্যাবর্তনের গল্প তাই কেবল একটি জনপ্রিয় ব্যান্ডের মঞ্চে ফিরে আসার গল্প নয়।

এটি দুই ভাইয়ের গল্প—যাঁরা ১৬ বছর দূরে থেকেও একে অপরের জীবন থেকে পুরোপুরি মুছে যেতে পারেননি।

এটি অভিমানের গল্প, আবার সেই অভিমান ছাড়িয়ে ওঠার গল্পও।

এখানে ক্ষমা চাওয়ার কোনো বড় ঘোষণা নেই, নেই নাটকীয় কোনো আলিঙ্গন। আছে শুধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গান গাওয়া, একে অপরের উপস্থিতি মেনে নেওয়া এবং সময়ের সঙ্গে পুরোনো ক্ষতকে শুকিয়ে যেতে দেওয়া।

হয়তো এটাই এই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে সুন্দর দিক।

কখনো কখনো মানুষ কথা দিয়ে নয়, নীরবতার মধ্য দিয়েই ক্ষমা করে। আর কখনো কখনো একটি গানই দুই মানুষের মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া সেতুটি আবার তৈরি করে দেয়।