চার ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াই। দুই সেটে পিছিয়ে থাকা। তৃতীয় সেটেও বিদায়ের মাত্র দুই পয়েন্ট দূরে দাঁড়িয়ে থাকা। এরপরও হার মানেননি ফ্রান্সেস তিয়াফো। অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তনে আলেক্স মিকেলসেনকে হারিয়ে ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন এই মার্কিন টেনিস তারকা।
নিউইয়র্কের আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কোয়ার্টার ফাইনালে ৫-৭, ৩-৬, ৭-৫, ৬-৩, ৭-৬ ব্যবধানে মিকেলসেনকে হারান ২৮ বছর বয়সী তিয়াফো। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে জয় নিশ্চিত করার পর উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার বদলে তিনি ছুটে যান প্রতিপক্ষের কাছে। হতাশায় ভেঙে পড়া মিকেলসেনকে জড়িয়ে ধরে প্রায় ২৩ সেকেন্ড ধরে সান্ত্বনা দেন তিনি।
এই জয় তিয়াফোকে গত পাঁচ বছরে তৃতীয়বারের মতো ইউএস ওপেনের শেষ চারে নিয়ে গেল। শুক্রবার সেমিফাইনালে তার প্রতিপক্ষ হবেন কার্লোস আলকারাজ অথবা বেন শেলটন।
দুই সেটে পিছিয়ে থেকেও হার মানেননি তিয়াফো
ম্যাচের শুরুতে তিয়াফোর পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রথম সেটে দুজনের মধ্যে প্রথম পাঁচ গেমেই চারবার সার্ভ ভাঙে। পরে মিকেলসেন নিয়ন্ত্রণ নেন এবং ৫০ মিনিটের লড়াই শেষে ৭-৫ ব্যবধানে সেট জিতে এগিয়ে যান।
দ্বিতীয় সেটেও একই ধারায় এগিয়ে যান ২২ বছর বয়সী মিকেলসেন। তিয়াফোর সার্ভে বারবার চাপ তৈরি করে তিনি সেটটি ৬-৩ ব্যবধানে জিতে নেন। তৃতীয় সেটের শুরুতেও মিকেলসেন এগিয়ে ছিলেন।
তখন মনে হচ্ছিল, ইউএস ওপেনে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন মিকেলসেন। তৃতীয় সেটে ৫-৩ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর ম্যাচ জিততে তার প্রয়োজন ছিল মাত্র একটি সার্ভ ধরে রাখা।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।
মাত্র দুই পয়েন্ট দূর থেকে ফিরে এলেন
তৃতীয় সেটের নবম গেমে মিকেলসেন পরপর দুটি দ্বৈত ভুল করেন। তিয়াফো সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সার্ভ ভেঙে দেন। এরপর নিজের সার্ভ ধরে ৬-৫ এগিয়ে যান তিনি।
মিকেলসেন সেট বাঁচানোর জন্য সার্ভ করতে নামলেও তিয়াফো আবার চাপ তৈরি করেন। একটি সেট পয়েন্ট বাঁচানোর পরও শেষ পর্যন্ত আরেকটি সুযোগ তৈরি করেন তিয়াফো। এবার মিকেলসেনের ফোরহ্যান্ড ভলিতে ভুল হয়।
তৃতীয় সেট ৭-৫ জিতে ম্যাচে ফিরে আসেন তিয়াফো।
এই সময় পর্যন্ত শেষ ২২ পয়েন্টের ১৭টিই জিতে নিয়েছিলেন তিনি। ফলে চতুর্থ সেটে তার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়।
চতুর্থ সেটে পুরোপুরি বদলে যায় ম্যাচ
চতুর্থ সেটের শুরুতেই মিকেলসেনের সার্ভ ভেঙে দেন তিয়াফো। তার গতি, পায়ের নড়াচড়া এবং ফোরহ্যান্ডে আক্রমণের ধার ক্রমেই বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে মিকেলসেনের খেলায় দেখা দেয় অস্থিরতা। চতুর্থ সেটে তিনি ১৬টি অনিচ্ছাকৃত ভুল করেন। এক পর্যায়ে হতাশায় র্যাকেটও মাটির দিকে ছুড়ে দেন।
যদিও ৩-২ ব্যবধানে সার্ভ ভেঙে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন মিকেলসেন, তিয়াফো সঙ্গে সঙ্গেই আবার তার সার্ভ ভেঙে দেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে।
চতুর্থ সেট ৬-৩ জিতে ম্যাচ নিয়ে যান নির্ধারক পঞ্চম সেটে।
পঞ্চম সেটে জমে ওঠে মহারণ
ম্যাচের শেষ সেটে দুই খেলোয়াড়ই নিজেদের সেরা টেনিস উপহার দেন। পঞ্চম সেটে দুজনেরই অনিচ্ছাকৃত ভুলের তুলনায় সফল শটের সংখ্যা ছিল বেশি।
মিকেলসেন শুরুতেই তিয়াফোর সার্ভ ভেঙে ২-০ এগিয়ে যান। এরপর ৩-০ ব্যবধানেও এগিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু আবারও ফিরে আসেন তিয়াফো।
এরপর ম্যাচে কেউ কাউকে ছাড় দেননি।
পঞ্চম সেটে তিয়াফো সাতটি সরাসরি সার্ভিস পয়েন্ট আদায় করেন, যার তিনটি আসে ৫-৫ অবস্থায় নিজের সার্ভ ধরে রাখার সময় শেষ চার পয়েন্টে। মিকেলসেনও দুর্দান্তভাবে চাপ সামলে ৬-৫ এগিয়ে যান।
তিয়াফো আবার সার্ভ ধরে ম্যাচ নিয়ে যান নির্ধারক টাইব্রেকে।

শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতাই পার্থক্য গড়ে দিল
টাইব্রেকে তিয়াফো ৬-৪ ব্যবধানে এগিয়ে গেলেও মিকেলসেন আবার লড়াইয়ে ফিরে আসেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিয়াফোর অভিজ্ঞতা কাজে দেয়।
একটি ১৩৫ মাইল গতির সরাসরি সার্ভে ৮-৬ ব্যবধানে এগিয়ে যান তিয়াফো। এরপর মিকেলসেনের ব্যাকহ্যান্ড ভুলে তৈরি হয় তিনটি ম্যাচ পয়েন্ট।
প্রথমটি বাঁচিয়ে দেন মিকেলসেন। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচ পয়েন্টে তিয়াফোর নিখুঁত ফোরহ্যান্ড পাসিং শটে শেষ হয় লড়াই।
চার ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের মহারণ শেষে জয় পান তিয়াফো।
প্রতিপক্ষকে জড়িয়ে ধরে আবেগঘন মুহূর্ত
জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিয়াফো প্রথমে দর্শকদের দিকে হাত নাড়েন। এরপর দ্রুত মিকেলসেনের কাছে চলে যান।
হারের কষ্টে তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মিকেলসেন। তিয়াফোর কাঁধে মাথা রেখে তিনি কাঁদতে থাকেন। তিয়াফোও তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন।
মিকেলসেন পরে জানান, ম্যাচটি মানসিকভাবে তাকে প্রচণ্ডভাবে ক্লান্ত করে দিয়েছিল। তিয়াফোর প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধার কারণেই মুহূর্তটি আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে তিয়াফো বলেন, মিকেলসেনকে তিনি সত্যিই পছন্দ করেন। তাই ম্যাচ শেষ হওয়ার পর তার কাছে গিয়ে আলিঙ্গন করাটাই স্বাভাবিক মনে হয়েছিল।
স্বপ্নের ইউএস ওপেন যাত্রা থামল মিকেলসেনের

মিকেলসেনের জন্য হারটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ইউএস ওপেনে এবার চার রাউন্ড পর্যন্ত একটি সেটও হারেননি তিনি। এর মধ্যে ১৬তম বাছাই ব্র্যান্ডন নাকাশিমা এবং ২৭তম বাছাই তোমাস মার্টিন এচেভেরিকে হারিয়েছিলেন।
২০০৪ সালে জন্ম নেওয়া কোনো পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে প্রথমবারের মতো কোনো গ্র্যান্ড স্লামের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানোর কৃতিত্বও অর্জন করেছিলেন তিনি।
কিন্তু তিয়াফোর বিপক্ষে জয় থেকে মাত্র দুই পয়েন্ট দূরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে পারেননি।
ইউএস ওপেনে তিয়াফোর নতুন অধ্যায়
এই জয় তিয়াফোর জন্যও বিশেষ তাৎপর্যের। এর আগে ২০২২ ও ২০২৪ সালে ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে উঠেছিলেন তিনি। এবার তৃতীয়বারের মতো শেষ চারে জায়গা করে নিলেন।
চলতি আসরেও শুরু থেকেই তাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। প্রথম রাউন্ডে মার্টিন ডামের বিপক্ষে দুই সেটের পর পিছিয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচও ঘুরিয়ে দেন তিনি।
এরপর রেই সাকামোতো, ভ্যালেন্তিন ভাশেরো এবং সপ্তম বাছাই দানিল মেদভেদেভকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছান।
মিকেলসেনের বিপক্ষে ম্যাচে আবারও দুই সেট পিছিয়ে পড়ার পর যে প্রত্যাবর্তন দেখালেন, সেটিই এখন তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় জয় হয়ে উঠেছে।
তিয়াফো নিজেও মনে করছেন, এটি তার গ্র্যান্ড স্লাম ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা জয়।
তিনি বলেছেন, ২০২২ বা ২০২৪ সালের সেই তিয়াফো আর তিনি নন। সময়ের সঙ্গে তিনি বদলেছেন, অভিজ্ঞ হয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, শুক্রবার সেমিফাইনালে সেই নতুন তিয়াফো কতদূর যেতে পারেন।
মহারণের পর একটাই প্রশ্ন সামনে—তিয়াফোর এই দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প কি এবার ইউএস ওপেনের ফাইনাল পর্যন্ত গড়াবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















