নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের যে ধ্বংসযজ্ঞ দেখা গেছে, তা শুধু একটি দেশের দুর্যোগ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত শিক্ষা ধরা পড়বে না। গ্রাম, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভাসিয়ে নেওয়া এই বিপর্যয়ে নেপালে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১ হাজার ৩০০-তে পৌঁছেছে এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। তিব্বতেও প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে, যেখানে ৯০০-র বেশি শ্রমিকের এখনো কোনো সন্ধান নেই।
এই বিপর্যয় দক্ষিণ কোরিয়ার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগের সঙ্গে দুর্যোগ প্রতিরোধ ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে কি যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
দক্ষিণ কোরিয়া নিজেই বর্ষাকালে বন্যা ও ভূমিধসের বহু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, দুর্যোগের পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।

নেপাল কোরিয়ার দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। কোরিয়ার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার মাধ্যমে দেশটিতে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। একই সঙ্গে নেপালের নদী অববাহিকায় জলবিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কোরীয় প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়নেরও উপস্থিতি রয়েছে।
এখানেই কোরিয়ার দায়িত্বের প্রশ্নটি আসে। কোনো নদী এলাকায় বাঁধ, সুড়ঙ্গ বা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে অর্থায়ন করা হলে সেই এলাকার বন্যা, ভূমিধস, ভূমিকম্প ও হিমবাহজনিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণও প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। কেবল অবকাঠামো তৈরি করে তার নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যব্যবস্থা ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উপেক্ষা করা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
ত্রিশুলি উপত্যকার পরিস্থিতি এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিদেশি অর্থায়নে নির্মিত অবকাঠামো যদি এমন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু নেপালের অর্থনীতি বা জনগণের ওপর পড়ে না। বিনিয়োগকারী দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও বড় বিষয় হলো, হিমালয়ের এই ঝুঁকি কোনো একটি দেশের সীমান্তে আটকে নেই। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আকস্মিক বন্যা, বরফধস ও হিমবাহ-সংক্রান্ত বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে। নেপাল, তিব্বত, ভারত ও পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ জনগোষ্ঠী একই পাহাড়ি জলব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু নেপাল ও চীনের মধ্যে যোগাযোগ যথেষ্ট নয়। সীমান্ত পেরিয়ে নদীর পানি, হিমবাহ, বৃষ্টিপাত ও সম্ভাব্য বিপদের তথ্য দ্রুত বিনিময়ের একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। বহুদিন ধরেই এ ধরনের অভিন্ন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে বাঁধ ও সড়কের মতো দৃশ্যমান অবকাঠামোতে যে পরিমাণ অর্থ যায়, ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় সেই তুলনায় অনেক কম বিনিয়োগ হয়।

কোরিয়ার অর্থায়ন নীতিতেও তাই পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি ঋণ ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। ভবিষ্যতে এসব প্রকল্পের ঋণ বা অর্থায়নের শর্তে ভূমিকম্প, বন্যা, নদীর প্রবাহ, ভূমিধস ও হিমবাহের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
এ ধরনের শর্ত প্রকল্পের খরচ বাড়াবে—এমন যুক্তি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একটি বড় দুর্ঘটনার পর উদ্ধার, পুনর্গঠন ও ক্ষতিপূরণে যে ব্যয় হয়, তার তুলনায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ খুবই সামান্য। সবচেয়ে বড় কথা, এর মাধ্যমে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
আর একটি প্রশ্নের উত্তরও কোরিয়ার দেওয়া উচিত। নিখোঁজ ৯০০-এর বেশি শ্রমিকের মধ্যে কতজন কোরীয় অর্থায়নে পরিচালিত বা কোরীয় প্রতিষ্ঠানের নির্মিত প্রকল্পে কাজ করছিলেন? বিদেশে থাকা কোরীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকার যেমন জবাবদিহি করে, তেমনি কোরিয়ার অর্থ ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পে কাজ করা স্থানীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্ব থাকা উচিত।
নেপালের এই দুর্যোগ তাই শুধু ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানের বিষয় নয়। এটি উন্নয়ন পরিকল্পনার ধরন, বিদেশি বিনিয়োগের দায়িত্ব, জলবায়ু ঝুঁকি এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা—সবকিছুকে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
নেপালের পাহাড় ও নদী থেকে যে সতর্কবার্তা এসেছে, কোরিয়ার উচিত সেটি আরেকটি বড় বিপর্যয়ের পর মনে রাখার অপেক্ষা না করে এখনই তার উন্নয়ন ও অর্থায়ন নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা।
লেখকঃ ব্রাবিম কারকি নেপালভিত্তিক ব্যবসায়ী ও লেখক।
ব্রাবিম কারকি 



















