সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে পণ্য বা সেবার প্রচার এখন বিজ্ঞাপনজগতের বড় একটি অংশ। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে করা সেই প্রচারের বিষয়টি দর্শকদের কাছ থেকে গোপন রাখতে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রভাবশালীদের চাপ দিচ্ছে বলে এক নতুন জরিপে উঠে এসেছে।
পাঁচজনের প্রায় একজনকে গোপন রাখতে বলা হয়েছে
প্রভাবশালী বিপণন প্রতিষ্ঠান শিস্পিকসের করা জরিপে ৩৬৫ জন নির্মাতার মতামত নেওয়া হয়। তাঁদের প্রায় ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, গত এক বছরে কোনো না কোনো ব্র্যান্ড সরাসরি তাঁদের অর্থের বিনিময়ে করা অংশীদারত্ব প্রকাশ না করতে বলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক প্রভাবশালী শ্যারন জনসন জানান, একটি খাদ্য-পরিপূরক প্রতিষ্ঠান তাঁকে তাদের পণ্য পাওয়ার ও খোলার দৃশ্যসংবলিত প্রকাশনায় অর্থের বিনিময়ে প্রচারের পরিচয় না দিতে বলেছিল। তবে দর্শকদের আস্থা এবং সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তিনি সেই পরিচয় প্রকাশ করেন।
আগের তুলনায় স্বচ্ছতাও কমেছে
জরিপে আরও দেখা গেছে, ১৪ শতাংশ নির্মাতা জানিয়েছেন তাঁরা সব সময় অংশীদারত্ব প্রকাশ করেন না। এক দশক আগে একই ধরনের জরিপে এই হার ছিল মাত্র ২ শতাংশ।
অন্যদিকে, ৮৪ শতাংশ নির্মাতা বলেছেন তাঁরা সব সময় বা প্রায় সব সময় ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাঁদের অংশীদারত্ব পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করেন। আগের জরিপে এই হার ছিল ৯৫ শতাংশ।
শিস্পিকসের প্রধান নির্বাহী আলিজা ফ্রয়েড বলেন, এক দশক আগের তুলনায় প্রকাশের হার কমে যাওয়া তাঁদের কাছে অপ্রত্যাশিত। তাঁর মতে, বর্তমানে এই খাত অনেক বেশি অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশের দিকে যাচ্ছে।
দর্শকের আস্থা হারানোর আশঙ্কা
কিছু বিজ্ঞাপন ও প্রতিভা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ছোট ব্র্যান্ডগুলোই এ ধরনের অনুরোধ বেশি করে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য সাধারণত অর্থের বিনিময়ে করা প্রচারকে স্বাভাবিক ব্যক্তিগত সুপারিশের মতো দেখানো।
দ্য ড্রাইভ এজেন্সির প্রধান প্রতিভা কর্মকর্তা লেইলা মার্শ বলেন, কোনো প্রকাশনায় অর্থের বিনিময়ে করা অংশীদারত্বের পরিচয় না দেওয়ার অনুরোধ এলে তাঁরা সাধারণত এর বিরোধিতা করেন। কারণ একজন প্রভাবশালীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাঁর দর্শকদের বিশ্বাস ও স্বতঃস্ফূর্ততা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজ্ঞাপনের পরিচয় প্রকাশ করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিস্তার বা দর্শকের সম্পৃক্ততা কমে যেতে পারে—এমন একটি ধারণাও ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে কাজ করছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাণিজ্য কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে করা প্রচার বা ব্র্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দর্শকদের কাছে সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় জানাতে হয়। বিজ্ঞাপন, স্পনসরকৃত প্রচার বা বিনামূল্যে পণ্য পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার মাধ্যমে সেই সম্পর্ক প্রকাশ করা যেতে পারে।
তবে নির্দিষ্ট কোনো শব্দ ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। মূল বিষয় হলো, দর্শক যেন সহজেই বুঝতে পারেন যে প্রকাশনাটি বাণিজ্যিক সম্পর্কের অংশ।
বড় অঙ্কের চুক্তিও ফিরিয়ে দিচ্ছেন কেউ কেউ
ক্রিয়েটর ম্যাচের প্রতিষ্ঠাতা এজে একস্টেইন বলেন, গত ছয় মাসে দুটি ব্র্যান্ড তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করা নির্মাতাদের অর্থের বিনিময়ে করা অংশীদারত্ব প্রকাশ না করতে বলেছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রতিষ্ঠান ওই দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দেয়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দর্শকদের বিশ্বাসই একজন নির্মাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অর্থের বিনিময়ে করা সম্পর্ক গোপন করলে সেই সম্পদই ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। এমনকি এ কারণে তাঁর প্রতিষ্ঠান কয়েক লাখ ডলারের চুক্তিও ছেড়ে দিয়েছে।
ব্র্যান্ডগুলোর নির্দেশনাতেও ঘাটতি
শুধু গোপন রাখার অনুরোধই নয়, বৈধভাবে বিজ্ঞাপন প্রকাশের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। জরিপে মাত্র ৫৭ শতাংশ নির্মাতা বলেছেন, গত এক বছরে ব্র্যান্ড বা বিপণন প্রতিষ্ঠান তাঁদের পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে কীভাবে অংশীদারত্ব প্রকাশ করতে হবে।
আর মাত্র ৩৬ শতাংশ বলেছেন, প্রকাশের নিয়ম মেনে চলা হয়েছে কি না তা যাচাই করতে ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠান তাঁদের তৈরি করা বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করেছে।
প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন অর্থের বিনিময়ে করা প্রচার গোপন রাখার প্রবণতা ঠেকাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ইউটিউব স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্মাতাদের প্রকাশনায় অঘোষিত ব্র্যান্ড চুক্তি শনাক্ত করে সেগুলো চিহ্নিত করার ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছে। টিকটক ও মেটারও একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ম ভাঙার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মিত কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় কিছু ব্র্যান্ড ও নির্মাতা ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন। কিন্তু ভোক্তার কাছে কোনো পণ্যের প্রশংসা সত্যিকারের ব্যক্তিগত মতামত, নাকি অর্থের বিনিময়ে করা প্রচার—এই তথ্য কেনার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে বিজ্ঞাপনের পরিচয় গোপন রাখা শুধু নিয়ম ভাঙার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে নির্মাতা, ব্র্যান্ড এবং দর্শকের মধ্যকার বিশ্বাসের সম্পর্ককেও দুর্বল করতে পারে।
অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে প্রচার করিয়ে তা দর্শকদের কাছ থেকে গোপন রাখার প্রবণতা বাড়ছে। নতুন জরিপে উঠে এসেছে বিজ্ঞাপন প্রকাশে স্বচ্ছতার ঘাটতি ও দর্শকের আস্থা হারানোর ঝুঁকি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















