ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বৈঠকে বসেছেন। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে দুই নেতার এটি দ্বিতীয় বৈঠক। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারত ও রাশিয়ার এই আলোচনায় বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকস নেতাদের বার্ষিক সম্মেলনের এক দিন আগে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। এবারের ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের একটি সূত্র জানিয়েছে, মোদি ও পুতিনের আলোচনায় বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি, সার, প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, উৎপাদন শিল্প, রেলপথ ও ইস্পাত খাতে দুই দেশের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে মোদি ও পুতিনের দেখা হয়েছিল। ওই বৈঠকে মোদি বলেছিলেন, মানবতার স্বার্থে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন। যুদ্ধ বন্ধে যেকোনো শান্তি প্রচেষ্টাকে ভারত সমর্থন করবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ভারত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। চীনের পাশাপাশি ভারত রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল ক্রেতা। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর মস্কোর ওপর পশ্চিমা দেশগুলো ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যেও রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে ভারত।
রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানের পেছনে বড় কারণ দেশটির বিপুল জনসংখ্যা ও দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি। নয়াদিল্লির বক্তব্য, দেশের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি কমানোর বিষয়ে ভারত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান নিয়ে ভারত বরাবরই সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়ে আসছে। নয়াদিল্লির মতে, কিছু দেশ রাশিয়ার জ্বালানি, ধাতু বা সার বাণিজ্য বন্ধ করে দিলেই এই সংঘাতের সমাধান হবে না। বরং আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে।
এদিকে ২০২৬ সালে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাইয়ে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির রেকর্ড ৫১ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে বিভিন্ন ধরনের বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় ভারতীয় শোধনাগারগুলো রাশিয়ার তেলের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
তবে আগস্টে রাশিয়ার তেল আমদানিতে ভারতের অংশ কিছুটা কমে থাকতে পারে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে চীনের রাশিয়ার তেল কেনা বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক শুধু জ্বালানি বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক জ্বালানি, সার, শিল্প উৎপাদন ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দুই দেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। ফলে মোদি-পুতিনের এবারের বৈঠক দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও গভীর করার পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বার্ষিক ভারত-রাশিয়া সম্মেলনে অংশ নিতে ভারত সফর করেছিলেন পুতিন। সে সময় দুই দেশ বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছিল। এবার নয়াদিল্লিতে দুই নেতার বৈঠক সেই ধারাবাহিকতাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক কীভাবে এগোয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















