৯/১১ হামলার ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই ঘটনার পর যে রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো বিশ্বজুড়ে গভীরভাবে দৃশ্যমান। হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ’ শুরু করে। এরপর থেকে যুদ্ধ, দখল, সামরিক অভিযান এবং নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিস্তার বিশ্বের বহু সমাজকে বদলে দিয়েছে।
সন্ত্রাস দমনের নামে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায়, সেটিই গত আড়াই দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন। বিশ্বের বহু সরকার সন্ত্রাসীদের শনাক্ত ও দমন করাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। গণমাধ্যম, বিনোদন ও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরও এমন এক ধারণা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে, যেখানে সন্ত্রাসকে সর্বত্র উপস্থিত একটি স্থায়ী হুমকি হিসেবে দেখানো হয়। এর ফলে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হলেও নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রের আরও ক্ষমতা অর্জনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তান এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও দীর্ঘ দখলদারির সময় দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও একের পর এক সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। ২০০১ সালের পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী বহু আইন প্রণীত হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সেসব আইনের আওতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা শুধু সশস্ত্র সহিংসতা মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাজনৈতিক ভিন্নমত ও জনসম্পৃক্ত আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রেও সেগুলোর ব্যবহার হয়েছে। অথচ যে বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক সহিংসতা ঠেকানোর কথা ছিল, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কমার বদলে আরও তীব্র হয়েছে।
এর পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ কেবল নিরাপত্তা নীতির বিষয় হয়ে থাকেনি; এটি একটি বিশাল সামরিক ও শিল্প কাঠামোর জন্ম দিয়েছে, যার সঙ্গে রাষ্ট্র এবং বেসরকারি প্রতিরক্ষা ব্যবসার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ২০০১ সালের পর বিভিন্ন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে এমন বেসরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাতে, যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। পাকিস্তানেও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও বেসরকারি ঠিকাদারদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।
ডিজিটাল যুগে সেই ক্ষমতার কাঠামো আরও বড় হয়েছে
এখন বিশ্ব আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পার্থক্য হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পাশে এবার যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অভূতপূর্ব প্রভাব। বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কেন্দ্রস্থলে উঠে আসার ফলে রাষ্ট্র ও বেসরকারি পুঁজির পুরোনো সম্পর্ক এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে ‘সাইবার সন্ত্রাস’, ‘সাইবার নিরাপত্তা’ এবং ‘পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ’-এর মতো ধারণা রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে। এগুলো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের পুরোনো যুক্তিকে নতুন প্রযুক্তিগত পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তার পরিধিও আরও বিস্তৃত করেছে।
রাষ্ট্র যেভাবে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও বিরোধিতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ডিজিটাল পরিসর ব্যবহার করছে, একই সময়ে বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ, বিনিময় ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা অর্জন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অ্যানথ্রপিকের এক সাবেক কর্মী সম্প্রতি সতর্ক করে পদত্যাগ করেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শুরুতেই অ্যানথ্রপিকের ক্লড প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর এক দশকেরও বেশি আগে এডওয়ার্ড স্নোডেন রাষ্ট্রীয় নজরদারির যে বাস্তবতার কথা সামনে এনেছিলেন, তা আজ আরও বিস্তৃত প্রযুক্তিগত কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
নিজেদের বাজারমুখী ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করা প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের একটি অংশও বাস্তবে রাষ্ট্রের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতাকে শক্তিশালী করছে। পিটার থিয়েল ও ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেররা প্রযুক্তি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ মানবসমাজ নিয়ে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনছেন, যেখানে মানুষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই জড়িয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব শিগগিরই মানবসভ্যতার বিলুপ্তি ঘটাবে—এমন অতিরঞ্জিত আশঙ্কা পাশে রাখলেও একটি বিষয় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই: সীমাহীন মুনাফা ও ক্ষমতার অনুসন্ধান এবং রাষ্ট্রের সীমাহীন সামাজিক নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে চলতে থাকলে মানবমুক্তির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
ঝুঁকিটি শুধু মানুষের জন্য নয়
এই ব্যবস্থার প্রভাব মানবসমাজের বাইরেও বিস্তৃত। জলবায়ু বিপর্যয় যখন ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হয়ে উঠছে, তখন বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্র বিদ্যুৎ ও পানির বিশাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং পরিবেশের ওপর তার মূল্য—এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সমকালীন সামরিকীকৃত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সিলিকন ভ্যালির ধনকুবেররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু এখানেও ‘ভালো রাষ্ট্র’ কিংবা ‘পরিবেশবান্ধব পুঁজিবাদ’-এর ধারণায় অন্ধ আস্থা রাখা বিপজ্জনক। কারণ ব্যবস্থাটির মৌলিক ক্ষমতার কাঠামো বদলানো ছাড়া তার একটি অংশকে অন্য অংশের চেয়ে মানবিক বলে চিহ্নিত করা সমস্যার সমাধান করে না।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের গত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা তাই নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। সেই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একবার বিস্তৃত হলে তা সহজে সংকুচিত হয় না। এখন সেই ক্ষমতার সঙ্গে প্রযুক্তি ও করপোরেট পুঁজির শক্তি যুক্ত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের সমাজে নজরদারি, তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ওপর চাপ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানেও এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জায়গা এখনো রয়েছে। সামরিকীকৃত শাসকগোষ্ঠীর হাতে নাগরিক স্বাধীনতার ক্রমাগত সংকোচন, বিশেষ করে ডিজিটাল পরিসরে নিয়ন্ত্রণ, এবং মানুষের সম্পদ ও জমির ওপর দখলদারির বিরুদ্ধে সমাজের একটি অংশ নিয়মিত প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু প্রতিবার কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটার পর যখন রাষ্ট্র সেটিকে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন সেই প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়ে। ভয় ও ক্রোধের পরিবেশে যুক্তিবোধ দ্রুত দুর্বল হয়, আর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করা সহজ হয়।
এই প্রবণতা ঠেকাতে শুধু কোনো একটি আইন বা প্রযুক্তির বিরোধিতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক চিন্তা, যা পুঁজির সীমাহীন ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় দমন এবং মানুষের ওপর প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ—তিনটিকেই একই বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে পারে। সেই রাজনীতির ভিত্তি হতে হবে শ্রমজীবী মানুষ এবং প্রকৃতি।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আমাদের এমন এক পৃথিবীর দিকে নিয়ে গেছে, যেখানে নিরাপত্তার নামে স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। এখন প্রযুক্তি সেই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করছে। এই নতুন ক্ষমতার জোটকে প্রশ্ন করার সময় তাই পরে নয়—এখনই।
আসিম সাজ্জাদ আখতার 



















