বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা মূল্যায়ন কার্যক্রম পিসায় শীর্ষ স্থান দখল করেছে সিঙ্গাপুর ও মূল ভূখণ্ড চীনের শিক্ষার্থীরা, এমন সময়ে যখন অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা তথা ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর গড় স্কোর রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কার্যক্রমে একানব্বইটি দেশ ও অর্থনীতি থেকে পনেরো বছর বয়সী সাত লাখ ষাট হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়, যা ২০০০ সালে এই মূল্যায়ন শুরুর পর থেকে সবচেয়ে বড় নমুনা।
বিষয়ভিত্তিক ফলাফল
পঠন দক্ষতায় সিঙ্গাপুর পাঁচশ পঁয়ত্রিশ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকেছে, চীন পেয়েছে পাঁচশ সাতাশ পয়েন্ট। তবে গণিতে চীন পাঁচশত বারো পয়েন্ট নিয়ে আধিপত্য দেখিয়েছে, সিঙ্গাপুর পেয়েছে পাঁচশ তেষট্টি পয়েন্ট। বিজ্ঞানেও চীন পাঁচশ সাতানব্বই পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে, সিঙ্গাপুর পেয়েছে পাঁচশ ষাট পয়েন্ট।
চীনের অংশগ্রহণকারী অঞ্চল
চীনের পক্ষে এই মূল্যায়নে অংশ নেয় বেইজিং, সাংহাই এবং জিয়াংসু ও ঝেজিয়াং প্রদেশের শিক্ষার্থীরা, যা দেশের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব না হলেও দেশের সবচেয়ে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
নতুন মূল্যায়ন মডিউল
এবারের মূল্যায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের উপযোগী একটি নতুন গণনামূলক সমস্যা সমাধান মডিউল যুক্ত করা হয়েছে, যা আধুনিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। ওইসিডি দেশগুলোর গড় স্কোর গণিতে চারশ তেষট্টি এবং বিজ্ঞানে চারশ বিরাশি পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা চীনের তুলনায় যথেষ্ট কম।
বৈশ্বিক শিক্ষার প্রবণতা
ওইসিডি দেশগুলোর গড় স্কোরে রেকর্ড পতন বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থায় মহামারি পরবর্তী প্রভাব এবং শিক্ষাগত বৈষম্যের প্রশ্ন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে বলে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য শিক্ষণীয় দিক
সিঙ্গাপুর ও চীনের এই সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে বলে শিক্ষাবিদরা মনে করেন। বিশেষত প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনে পাঠ্যক্রম সংস্কারের বিষয়টি বাংলাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনাবিদদের জন্যও বিবেচনার দাবি রাখে।
দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ফল
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঙ্গাপুর ও চীনের এই ধারাবাহিক সাফল্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম হালনাগাদ এবং প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ফসল। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই মডেল অনুসরণযোগ্য হলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন বলে শিক্ষা অর্থনীতিবিদরা মন্তব্য করেছেন।
মূল্যায়ন পদ্ধতির গুরুত্ব
পিসা মূল্যায়ন শুধু জ্ঞান যাচাই নয়, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীদের প্রয়োগিক দক্ষতা কতটা তা পরিমাপ করে বলে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এই কারণেই বিশ্বব্যাপী নীতিনির্ধারকরা পিসার ফলাফলকে নিজ নিজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পিসার মতো আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে অংশগ্রহণ নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থার শক্তি ও দুর্বলতা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার একটি সুযোগ হিসেবেও কাজ করতে পারে বলে শিক্ষা পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখনো এই ধরনের আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে ব্যাপক অংশগ্রহণ থেকে দূরে থাকায় নিজেদের শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যাচাই করার সুযোগ সীমিত থেকে যাচ্ছে বলে শিক্ষাবিদরা উল্লেখ করেছেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের মূল্যায়নে অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে শিক্ষা সংস্কারের অগ্রাধিকার নির্ধারণেও তা সহায়ক হতে পারে বলে তারা মনে করেন।
Sarakhon Report 


















