২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির সামিট শহরে লরেন্স পরিবারের দুই সন্তানকে দেখাশোনার কাজ করছিলেন ব্রিটিশ তরুণী লুইস রেনার। তখন তাঁর বয়স ২০-এর কোঠায়। তিনি ছিলেন ব্র্যাডফোর্ডের একজন ফটোগ্রাফি শিক্ষার্থী। কিন্তু একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা তাঁর জীবনের গতিপথই বদলে দেয়।
সেদিন বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সাউথ টাওয়ারে হামলায় নিহত হন লরেন্স পরিবারের কর্তা বব লরেন্স। নতুন একটি চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাত্র এক দিন পর ৪১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর লুইস শুধু একজন ন্যানি হিসেবে ওই পরিবারের সঙ্গে থাকেননি; হয়ে ওঠেন পরিবারের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
২৫ বছর পরও লুইস রেনার ও লরেন্স পরিবারের সম্পর্ক অটুট। ৫২ বছর বয়সী লুইস বলেন, ৯/১১ তাঁর জীবনের “পুরো গতিপথ বদলে দিয়েছিল”। একই সঙ্গে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে একটি ‘দ্বিতীয় পরিবার’ উপহার দিয়েছে।
কাকতালীয় কিছু ঘটনা থেকেই পরিচয়
লরেন্স পরিবারের সঙ্গে লুইসের পরিচয়ও ছিল অনেকটা ভাগ্যের খেলা। তিনি মূলত যে ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেন। নতুন ফ্লাইটে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় আরেক তরুণীর, যিনি তাঁকে বব ও সুজান লরেন্স এবং তাঁদের দুই সন্তান ববি ও টোল্যান্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
লুইস তখন ওই পরিবারের ন্যানি হিসেবে কাজ শুরু করেন। বব ও সুজান তাঁকে পড়াশোনার সুযোগও করে দেন।
লুইসের ভাষায়, টোল্যান্ডের বয়স তখন প্রায় আট বছর আর ববির ছয়। দুই শিশুর সঙ্গে খুব দ্রুতই তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। লরেন্স পরিবারের অনেক আত্মীয়ও সামিটে থাকতেন। ফলে সেখানে তাঁর কাজের চেয়ে পারিবারিক সম্পর্কই বেশি মনে হতো।
৯/১১-এর সেই সকাল
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে সুজান কাজের কারণে অন্য একটি অঙ্গরাজ্যে ছিলেন। বব খুব ভোরে নিউইয়র্কে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যান। তিনি একটি বিনিয়োগ ব্যাংকে কাজ করতেন এবং সেদিনই বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সাউথ টাওয়ারে তাঁর নতুন কর্মস্থলে যাওয়ার কথা ছিল।
লুইস সেদিন সকালে দুই শিশুকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাড়িতে ফিরে আবার ঘুমাতে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর ফোন বেজে ওঠে। ফোন করেছিলেন তাঁর এক ন্যানি বন্ধু, যিনি কয়েক শহর দূরে থাকতেন।
বন্ধুটি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি টেলিভিশনে খবর দেখছেন কি না।
লুইস বলেন, সেদিন সকালটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর—আকাশ ছিল পরিষ্কার। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই স্বাভাবিক সকাল পরিণত হয় অবিশ্বাস্য এক দুঃস্বপ্নে।
বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে তিনি টেলিভিশনে দ্বিতীয় বিমানটি সাউথ টাওয়ারে আঘাত করতে দেখেন। এরপর তাঁর নিজের মোবাইল ফোনও একের পর এক বেজে উঠতে থাকে।
সন্তানদের কাছে তখন লুইসই ছিলেন
ববের পরিবারের কিছু সদস্য তখনও জানতেন না যে তিনি বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে নতুন চাকরি নিয়েছেন। আর সুজান অন্য অঙ্গরাজ্যে থাকায় বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দ্রুত নিউ জার্সিতে ফিরতে পারছিলেন না।
ফলে সেদিন স্কুল থেকে শিশুদের নিয়ে আসার দায়িত্ব পড়ে লুইসের ওপর।
এরপর শুরু হয় অপেক্ষা। নিখোঁজ মানুষদের কেউ হয়তো জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হবেন—এমন আশায় পরিবার ও স্বজনেরা অনেক দিন অপেক্ষা করেছিলেন। তবে সাউথ টাওয়ারের ৭৭ তলা বা তার ওপরে থাকা অধিকাংশ মানুষই যে মারা গেছেন, সেটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে যায়।
বিমানটি ভবনটির ৭৮ থেকে ৮৪ তলার মাঝামাঝি অংশে আঘাত করেছিল।
লুইস বলেন, প্রথম দিকে কেউই ভাবতে পারেননি যে টাওয়ার দুটি ধসে পড়বে। নিউইয়র্কের পরিচিত আকাশরেখা মুহূর্তের মধ্যে বদলে যাওয়া ছিল তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য।
তিনি বলেন, শিশু দুটির সামনে তাঁকে স্থির থাকার চেষ্টা করতে হয়েছিল। কিন্তু ববের মৃত্যুর বিষয়টি দীর্ঘ সময় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
শোকের মধ্যে থেকেও পরিবার ছাড়েননি
ববকে লুইস বর্ণনা করেন প্রাণবন্ত, অসাধারণ একজন পারিবারিক মানুষ হিসেবে। তিনি খেলাধুলা ভালোবাসতেন; টেনিস ও হকির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।
ববের মৃত্যুর পর লরেন্স পরিবার যখন গভীর শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, লুইস তখন নিজেকে মনে করতেন যেন অন্য একটি পরিবারের শোকের মধ্যে খুব সতর্কভাবে হাঁটছেন।
তবু তিনি সরে যাননি।
লুইস বলেন, তিনি কোথাও যাচ্ছিলেন না। পরিবারের তাঁকে প্রয়োজন ছিল এবং সেটি তাঁকে আলাদা করে বলারও প্রয়োজন হয়নি।
সুজানকে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার কাজে ফিরতে হয়। ফলে পরবর্তী আড়াই বছর লুইস পরিবারের রান্না, ঘর পরিষ্কার, শিশুদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন নানা দায়িত্ব সামলান। একই সঙ্গে ববের পরিবারের সদস্যদের শিশুদের খবরও জানাতেন।
লুইসের মনে হয়েছিল, এই সময়টুকুতে পরিবার তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল।
২০০৩ সালে বিদায়, সম্পর্ক রয়ে গেল
২০০৩ সালে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় লুইসকে নিউ জার্সি ছাড়তে হয়। তিনি ফিরে যান ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ডের কাছে বেইলডনের নিজ বাড়িতে।
কিন্তু আটলান্টিকের দুই পাশে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব তৈরি হলেও লরেন্স পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি।
বহু বছর পর একদিন সুজান তাঁকে একটি ছোট খোদাই করা ছবির ফ্রেম পাঠান। সেখানে ছিল লুইসের প্রতি কৃতজ্ঞতার বার্তা—প্রয়োজনের সময়ে পাশে থাকার জন্য।
লুইস বলেন, সুজান অত্যন্ত শক্ত মনের মানুষ এবং অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ নন। তাই তাঁর কাছ থেকে এমন উপহার পাওয়া লুইসের কাছে ছিল বিশেষ অর্থবহ।
টোল্যান্ডের কাছে লুইস আজও পরিবারের মানুষ
লরেন্স পরিবারের সন্তান টোল্যান্ডের সঙ্গে লুইসের সম্পর্ক বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ। এখন টোল্যান্ডের বয়স ৩০-এর কোঠায়। তিনি কোচ হিসেবে কাজ করেন এবং মানব নকশা নিয়ে কাজ করেন।
টোল্যান্ড মনে করেন, লুইসের ভালোবাসা, ধৈর্য ও যত্ন তাঁর পরিবারের জীবনের গতিপথ ইতিবাচকভাবে বদলে দিয়েছিল।
লুইসের বিশ্বাস, তাঁদের দেখা হওয়ার পেছনে একের পর এক ছোট ছোট কাকতালীয় ঘটনা কাজ করেছিল। তিনি যদি সেই প্রথম ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রে যেতেন, তাহলে হয়তো সেই তরুণীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হতো না। আর সেই পরিচয় না হলে লরেন্স পরিবারের সঙ্গেও তাঁর দেখা হতো না।
তাই ৯/১১-এর মতো ভয়াবহ ঘটনার মধ্যেও তিনি সেই সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের অর্থ খুঁজে পান।
দুই পরিবারের মিলন
সময়ের সঙ্গে লরেন্স পরিবারও যুক্তরাজ্যে লুইসের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। সুজান, বব ও টোল্যান্ড ব্র্যাডফোর্ডে গেছেন। এমনকি লুইস যখন বিয়ে করেন, টোল্যান্ড তাঁর বিয়েতে বধূর বিশেষ সহচর হিসেবেও ছিলেন।
লুইসের নিজের তিন সন্তান—যাদের বয়স এখন ১৯, ১৭ ও ১৪—তারাও নিউইয়র্কে লরেন্স পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছে।
লুইসের কাছে সেই মুহূর্ত ছিল দুই ভিন্ন জগতের একসঙ্গে হয়ে যাওয়ার মতো।
ভয়াবহতার মধ্যেও যে মানবিকতা
৯/১১-এর অভিজ্ঞতা লুইসের পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিয়েছে। তাঁর মতে, একটি ভয়াবহ বিপর্যয় তাঁকে এমন কিছু বন্ধুত্ব দিয়েছে, যা অন্য কোনো পরিস্থিতিতে হয়তো কখনো তৈরি হতো না।
তিনি বলেন, ৯/১১ তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। সেই ঘটনার সময় তাঁর পাশে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে আজও সেই স্মৃতি ভাগ করে নেন তিনি।
তবে সেই ভয়াবহতার বিপরীতে তিনি দেখেছেন মানুষের অসাধারণ মমতা ও kindness। বিপর্যয়ের ভয়াবহতার সঙ্গে মানুষের সেই সহমর্মিতার তীব্র বৈপরীত্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
লুইসের ভাষায়, ৯/১১ না ঘটলে নিউ জার্সিতে তাঁর যে পরিবারটি তৈরি হয়েছে, সেটি হয়তো কখনোই হতো না।
টোল্যান্ডও মনে করেন, সেই কঠিন বছরগুলোতে লুইস যে ভালোবাসা ও ধৈর্য দেখিয়েছেন, তা আজও তাঁর জীবনের এক মূল্যবান শক্তি। লুইস তাঁর জীবনের অংশ হয়ে আছেন—এ জন্য তিনি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















