ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। এর আগে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা বিমানবন্দরটি দখলে নেওয়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদাব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও ইয়েমেনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মোখা বিমানবন্দরে সৌদি হামলা
হুতিদের সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিদ্রোহীরা মোখা বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখানে সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা চালায়। তবে হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
ইয়েমেন সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মোখার দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রার সময় সৌদি বিমানবাহিনী তাদের ঠেকাতে আগেই হামলা চালাতে ব্যর্থ হয়। তার ধারণা, বড় ধরনের বিমান অভিযান চালানোর জন্য রিয়াদ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন পায়নি। একই সঙ্গে ইয়েমেনের সেনাবাহিনী ও মিত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিকেও হুতিদের অগ্রযাত্রার বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
কৌশলগত মায়ুন দ্বীপ হুতিদের দখলে
মোখা দখলের পাশাপাশি হুতিরা বাব আল-মানদাব প্রণালিতে অবস্থিত ছোট আগ্নেয় দ্বীপ মায়ুনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে শুক্রবার নিশ্চিত করেছেন ইয়েমেন সরকারের এক সামরিক কর্মকর্তা ও একজন হুতি কর্মকর্তা। তারা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
পেরিম নামেও পরিচিত মায়ুন দ্বীপটি ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথের ওপর এর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোখা থেকেও ট্যাংকার চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ রুট দেখা যায়। ফলে দুটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে যাওয়া সৌদি তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক নৌপথে বাড়ছে উদ্বেগ
হুতি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাজাম আল-আসাদ বলেছেন, এ ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার দাবি, সৌদি আগ্রাসনের জবাব হিসেবেই হুতিরা পদক্ষেপ নিচ্ছে। রিয়াদ হামলা অব্যাহত রাখলে হুতিদের কাছে ‘বড় ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর’ তালিকা রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এর আগে জুলাই থেকে বাব আল-মানদাব ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে আসছে হুতিরা। সৌদি তেল অবকাঠামোকেও তারা লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিদ্রোহীদের দাবি, হুতিদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের এলাকাগুলোতে সৌদি অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ পণ্য সাধারণত বাব আল-মানদাব দিয়ে পরিবহন হয়। তবে ২০২৩ সালের শেষ দিকে হুতিদের জাহাজে হামলা শুরুর পর এই পথে নৌ চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়। জলপথে আরও বিঘ্ন সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।![]()
ইরানের সমর্থন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে শঙ্কা
শুক্রবার ইরান ইয়েমেনে সৌদি অবরোধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে হুতিদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরব ও হুতিদের আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ২০২২ সাল থেকে মোটামুটি কার্যকর থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার নতুন হামলার নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। তাদের দাবি, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় ইয়েমেন এখন গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টলাইনে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার হিসাবে, গত এক সপ্তাহে সংঘাতের কারণে ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। মোখা থেকেও বহু মানুষকে নিজেদের মালপত্র নিয়ে পালাতে দেখা গেছে। এতে ইয়েমেনে পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধ আবার ফিরে আসার আশঙ্কা বাড়ছে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানাসহ উত্তর ও মধ্য ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে হুতিরা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। পরের বছর সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরব সামরিক হস্তক্ষেপ করে। সেই সংঘাতই নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সৌদি বিমান হামলা, হুতি দখল, মোখা, মায়ুন দ্বীপ ও বাব আল-মানদাব নিয়ে নতুন উত্তেজনা ইয়েমেনের সংঘাতকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
সৌদি বিমান হামলার পর মোখা ও বাব আল-মানদাব ঘিরে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হুতিদের কৌশলগত অগ্রযাত্রায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও ইয়েমেনের যুদ্ধবিরতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















