যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার নিজেদের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই রাখতে চাইছে রিপাবলিকান পার্টি। ডালাসে দলের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলনে ট্রাম্প নিজেই ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, নভেম্বরের নির্বাচনে যেন তারা এমনভাবে ভোট দেন, যেন ব্যালটে তিনিই প্রার্থী।
দুই দিনের এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে রিপাবলিকানরা এমন একটি প্রচারকৌশল সামনে এনেছে, যার লক্ষ্য ট্রাম্পের প্রতি অনুগত ভোটারদের আবারও বিপুলসংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা। ২০১৬ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে ধরনের জনসমর্থন ও ভোটার উপস্থিতি তৈরি করতে পেরেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনেও সেই শক্তি কাজে লাগাতে চায় দলটি।
তবে ডালাসের সম্মেলনে অংশ নেওয়া রিপাবলিকানদের মধ্যেই এই কৌশল নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি দেখা গেছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের কয়েকজনও প্রশ্ন তুলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের মধ্যে ট্রাম্প কি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে দলটির সবচেয়ে কার্যকর প্রচারক হতে পারবেন?
রয়টার্স সম্মেলনে অংশ নেওয়া ১৫ জন রিপাবলিকান সমর্থক, দাতা ও রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন বলেছেন, স্বাধীন ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের আবেদন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কংগ্রেসে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের স্বাধীন ভোটারদের সমর্থন প্রয়োজন।
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান দাতা লেন হেরিটেজ বলেন, ট্রাম্প দলের মূল সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করতে সক্ষম এবং সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্তও ভালো ছিল। কিন্তু সবার কাছে ট্রাম্পের এই প্রচারকৌশল কার্যকর হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত নন।
হেরিটেজ জানান, বুধবার রাতে ট্রাম্পের ভাষণ শোনার পর প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে তার মূল্যায়ন আরও ইতিবাচক হয়েছে। তবে ট্রাম্পই যে দলের জন্য সবচেয়ে ভালো প্রচারক, তা নিয়ে তিনি এখনো দ্বিধায় রয়েছেন।
সম্মেলনে ট্রাম্পের ভাষণে ভোটারদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়—তেমন গুরুত্ব পায়নি। অথচ পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অর্থনীতি নিয়ে মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে এবং এ কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও চাপের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত কমছে। কিন্তু সরকারি তথ্য সেই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ট্রাম্প আরও ঘোষণা দিয়েছেন, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে ৫ হাজার ডলারের ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ দেওয়া হবে। তবে এই অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে বা এর অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
সম্মেলনে ট্রাম্পের বক্তৃতার সময় ২১ হাজার আসনের আমেরিকান এয়ারলাইনস সেন্টারের নিচের অংশের অনেক আসন পূর্ণ ছিল। কিন্তু ওপরের গ্যালারি এবং পাশের শত শত আসন খালি পড়ে ছিল। এতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টায় কিছুটা অস্বস্তিকর ছবি তৈরি হয়।
তবে জনসমাগম নিয়ে বরাবরই আগ্রহী ট্রাম্প তার বক্তব্যে বারবার সম্মেলনস্থলকে কানায় কানায় পূর্ণ বলে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্পকে ঘিরেই বড় রাজনৈতিক বাজি
রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দলটির বাইরে থাকা ভোটারদের তুলনায় এখনো অনেক বেশি। ২৮ থেকে ৩১ আগস্ট পরিচালিত রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে ট্রাম্পের সামগ্রিক অনুমোদনের হার ছিল ৩৩ শতাংশ, যা তার বর্তমান প্রেসিডেন্সির সর্বনিম্ন পর্যায়।
তবে রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে তার অনুমোদন ছিল ৮২ শতাংশ। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিকে এই হার ছিল ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ দলের ভেতরেও কিছুটা কমেছে তার জনপ্রিয়তা।
স্বাধীন ভোটারদের মধ্যে পরিস্থিতি আরও কঠিন। ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে এই গোষ্ঠীতে তার অনুমোদন ছিল ৩৯ শতাংশ। আগস্টের শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২ শতাংশে।
অন্যদিকে বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক আগ্রহ ও সক্রিয়তা রিপাবলিকানদের তুলনায় বেশি হতে পারে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও সাবেক সিনেট সহকারী ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, ট্রাম্পকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচার চালানো নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে প্রচার চালানোর চেয়ে এটিই ভালো কৌশল হতে পারে।
তার মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে অনুগত ভোটারদের অনেককেই তার উপস্থিতি ছাড়া ভোটকেন্দ্রে আনা কঠিন। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পকে সামনে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দলটির সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।
ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য রিপাবলিকানদের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, ট্রাম্প নিজেই যখন ভোটারদের বলছেন তাকে ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবে ধরে নিতে, তখন ডেমোক্র্যাটদের জন্যও নির্বাচনটিকে ট্রাম্পের শাসনের ওপর গণভোটে পরিণত করা সহজ হবে।
বিশেষ করে অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভোটারদের কাছে প্রচার চালাতে চায় ডেমোক্র্যাটরা।
ডেমোক্র্যাটদের ভয় দেখিয়ে ভোট টানার চেষ্টা
ডালাসের সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়া রিপাবলিকান নেতারা ডেমোক্র্যাটদের যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক ও চরমপন্থী হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্যে এমন একটি রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে আমেরিকানদের জীবনযাপন, মূল্যবোধ ও জাতীয় পরিচয় হুমকির মুখে পড়বে।
রিপাবলিকানদের এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করা এবং নির্বাচনের গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলা।
টেক্সাসের অবসরপ্রাপ্ত মেধাস্বত্ব আইনজীবী ক্রিস্টিন গার্ডনার মনে করেন, ট্রাম্পকে সামনে রাখার নেতিবাচক প্রভাবের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের বামঘেঁষা অবস্থান রিপাবলিকানদের জন্য বড় সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
তার মতে, ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থিত প্রার্থীদের উত্থান স্বাধীন ভোটারদের একটি অংশকে ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপারে সতর্ক করে তুলতে পারে।
তবে এই যুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে কতটা কাজ করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ সেখানে শুধু ডেমোক্র্যাটদের নিয়ে ভয় দেখালেই ভোটারদের মন জয় করা যাবে না; ট্রাম্পের শাসন নিয়ে তাদের অসন্তোষও মোকাবিলা করতে হবে।
‘আমাদের একমাত্র প্রচারক তিনিই’
রিপাবলিকানদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু প্রার্থী ডালাসের সম্মেলনেই আসেননি। তাদের মধ্যে রয়েছেন মিশিগানের প্রতিনিধি টম ব্যারেট, আলাস্কার সিনেটর ড্যান সুলিভান এবং মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্স।
ব্যারেটের প্রচারশিবির জানিয়েছে, তিনি ডালাসে না এসে নিজ নির্বাচনী এলাকায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কারণ তার ভোটাররা সেখানেই রয়েছেন।
টেনেসির এক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধি রিক উইলিয়ামসও স্বীকার করেছেন, স্বাধীন ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের নির্বাচনী বার্তা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
তবে তার মতে, সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য স্বাধীন ভোটারদের আকৃষ্ট করা নয়। বরং যারা আগে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন, তাদের আবার ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসাই প্রধান লক্ষ্য।
উইলিয়ামসের ভাষায়, দলের হাতে প্রচারের জন্য কার্যত ট্রাম্পই সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ। তাই দুই বছর আগে যারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের আবার ভোট দিতে ফিরিয়ে আনাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ টেক্সাসের ৫৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান তালাকো কোস্তিনিও মনে করেন, ট্রাম্পকে সামনে রাখার ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু পুরোনো কৌশল বারবার অনুসরণ করে লাভ না হলে নতুন কিছু চেষ্টা করাই ভালো।
তার যুক্তি, পুরোনো পদ্ধতিগুলো যদি কাজ না করে, তাহলে একইভাবে এগিয়ে যাওয়ার কারণ নেই। তাই এবার ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে নতুন কৌশল চেষ্টা করে দেখতেই পারে রিপাবলিকান পার্টি।
সব মিলিয়ে, ডালাসের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে রিপাবলিকানরা একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বাজি ধরেছে—ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও তার অনুগত ভোটারদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলীয় সমর্থকদের আবারও সক্রিয় করা। কিন্তু একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ এবং স্বাধীন ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা এই কৌশলের বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন, ট্রাম্প কি তার শক্তিশালী দলীয় ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীন ভোটারদেরও আকৃষ্ট করতে পারবেন, নাকি তাকে সামনে রাখার সিদ্ধান্তই রিপাবলিকানদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে আরও কঠিন লড়াইয়ের মুখে ফেলবে? নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সেই প্রশ্নেরই উত্তর দেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















