১০:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মন্টি ডনের উত্তরসূরি হতে হবে বাগানের মানুষ, টেলিভিশনের ‘চরিত্র’ নয় চিপ প্রযুক্তি রক্ষায় গুপ্তচরবৃত্তি আইন কঠোর করল দক্ষিণ কোরিয়া আনোয়ারকে চ্যালেঞ্জ জাহিদের, মালয়েশিয়ায় জোট ভাঙার হুমকি রাষ্ট্রসমর্থিত হ্যাকারদের হাতে এআই, নতুন প্রতিবেদনে উদ্বেগ জার্মানিতে উগ্র ডানের বিরুদ্ধে পথে দেড় লাখ মানুষ ভুয়া কর্মকর্তার ফোনে ১০ লাখ হংকং ডলার খোয়ালেন শিক্ষার্থী অন্ধকার সুড়ঙ্গে ১০ দিন, নেপালি শ্রমিকের ফিরে আসার গল্প জাতিসংঘে পাকিস্তানের দাবি, সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোয় ফাঁক বন্ধ হোক ছয় বছর পর নিজের দেশে ফিরে বুঝলেন, আসলেই কি ‘বাড়ি’ বদলে গেছে? চীনে তৈরি হচ্ছে নতুন ‘অবসর শ্রেণি’, কাজের চেয়ে জীবন উপভোগে আগ্রহী মধ্যবিত্ত

চীনে তৈরি হচ্ছে নতুন ‘অবসর শ্রেণি’, কাজের চেয়ে জীবন উপভোগে আগ্রহী মধ্যবিত্ত

চীনে দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষের কাজ ও অবসর সম্পর্কে ধারণা। একসময় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কঠোর পরিশ্রম এবং পেশাগত সাফল্যকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা হলেও দেশটির মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ এখন কাজের পাশাপাশি নিজের জন্য সময় বের করা, ভ্রমণ, শরীরচর্চা, বই পড়া, শিল্প-সংস্কৃতি উপভোগ এবং মানসিক প্রশান্তিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে দেশটিতে গড়ে উঠছে নতুন ধরনের অবসরভিত্তিক অর্থনীতি।

চীনের বেইদাইহের কাছে সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশকেন্দ্র আরানিয়া এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক। জায়গাটি ‘মধ্যবিত্তের ইউটোপিয়া’ হিসেবে পরিচিত। এখানে মানুষ ঘুড়ি ওড়ায়, সমুদ্রে খেলাধুলা করে, ধ্যান করে এবং সাজানো-গোছানো রাস্তায় হাঁটে। অনেকেরই সেখানে দ্বিতীয় বাড়ি রয়েছে।

গত বছর আরানিয়ায় ৪৬ লাখের বেশি পর্যটক গেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪ লাখ। সেখানে দর্শনার্থীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ কিন্তু নকশাবহুল খাবারের দোকানে খাওয়া-দাওয়া করেন, নাটক, সংগীত ও চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেন এবং আধুনিক স্থাপত্যের লাইব্রেরি দেখতে যান।

চীনে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ গণতন্ত্রের দিকে দেশটিকে নিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা একসময় অনেকের ছিল। বাস্তবে তা ঘটেনি। তবে এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন নতুন একটি অবসর শিল্পের জন্ম দিয়েছে। ব্যস্ত ও তুলনামূলকভাবে সচ্ছল মানুষ এখন কাজের বাইরে নিজের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে অর্থ ব্যয় করছেন।

উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন অর্থনীতিবিদ থর্সটেইন ভেবলেন ‘অবসর শ্রেণি’ ধারণাটি তুলে ধরেছিলেন। এই শ্রেণির মানুষ নিজেদের এমনভাবে প্রদর্শন করে, যেন তাদের কাজ করার প্রয়োজন নেই। চীনে এই ধরনের প্রকৃত ‘অবসর শ্রেণি’ এখনো ছোট। তবে আরও বড় একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবসরকে মূল্য দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসের হিসাবে, ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের শহরাঞ্চলের অর্ধেকের বেশি পরিবার—প্রায় ২০ কোটি পরিবার—উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা তার ওপরে উঠে গেছে। এসব পরিবারের বার্ষিক আয় অন্তত ১ লাখ ৬৫ হাজার ইউয়ান, যা প্রায় ২৩ হাজার মার্কিন ডলারের সমান।

চীনের কর্মসংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাধারণত দুটি চরম অবস্থার কথা সামনে আসে। একটি হলো ‘৯৯৬’—সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করা। অন্যটি ‘লাইং ফ্ল্যাট’ বা প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ানোর প্রবণতা। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত এই দুই চরম অবস্থার মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে। তারা পুরোপুরি কাজ ছেড়ে দিতে চায় না, আবার আগের মতো অতিরিক্ত কাজও করতে চায় না। তারা একটু কম কাজ করে অবসর সময়কে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে চায়।

চীনের দুর্বল খুচরা বাজারের মধ্যে সংস্কৃতি, খেলাধুলা এবং অন্যান্য অবসর খাতে ব্যয় এখন তুলনামূলকভাবে উজ্জ্বল জায়গা হয়ে উঠেছে। আগে যেসব পাহাড়ি ভ্রমণ-গাইড মূলত বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে কাজ করতেন, তারা এখন নতুন সরঞ্জাম কেনা চীনা পর্যটকদেরও সেবা দিচ্ছেন। পাহাড়ে হাঁটা ও প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিও মানুষের অবসর কাটানোকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখছে না। মানুষ যদি ছুটি কাটিয়ে আবার কাজে ফিরে আসে এবং অবসরের মাধ্যমে ভোক্তা ব্যয় বাড়ায়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্যও উপকারী। তবে মানুষ যেন কাজের প্রতি সম্পূর্ণ অনাগ্রহী হয়ে না পড়ে বা হতাশা থেকে সামাজিক অসন্তোষে না জড়ায়, সেটিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আরানিয়ার একটি বইয়ের দোকানে এমন একটি চুম্বকও বিক্রি হয়, যাতে লেখা—‘বিরতি নেওয়া বৈধ’। কথাটি চীনের দীর্ঘদিনের কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তনকে যেন প্রতীকীভাবে তুলে ধরে।

চীনে কঠোর পরিশ্রমের সংস্কৃতি বহু পুরোনো। একটি প্রচলিত প্রবাদে বলা হয়, অতিরিক্ত খেলাধুলা বা আনন্দ মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নষ্ট করে। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে তেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পর মানুষের জীবনধারায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে থাকে।

১৯৯৫ সালে সরকার দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি চালু করে। যদিও এর প্রয়োগ সব জায়গায় কঠোর ছিল না। এরপর ১৯৯৯ সালে তিনটি দীর্ঘ ছুটিকে ‘গোল্ডেন উইক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কর্মঘণ্টাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং অবসর জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়।Can China finally relax?

রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ওয়াং ছিয়ানের দীর্ঘদিনের সময় ব্যবহারের জরিপ অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সময়কালে চীনের মানুষ সবচেয়ে সুখী ছিল বলে মনে হয়। তখন মানুষ পর্যাপ্ত ঘুমাত, বেশি খেলাধুলা ও বিনোদন করত এবং মোটামুটি ভালো আয়ও করত।

তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। একটি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, শহুরে বাসিন্দাদের কর্মদিবসে অবসর কাটানোর সময় ২০২৪ সালের ৫ দশমিক ৯১ ঘণ্টা থেকে ২০২৫ সালে কমে ৩ দশমিক ৬৬ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। তবু দীর্ঘমেয়াদে অবসর সময়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। ওয়াং ছিয়ান এখন চার দিনের কর্মসপ্তাহের পক্ষে মত দিচ্ছেন।

২৪ বছর বয়সী ই-কমার্সকর্মী শেন হুইশান মনে করেন, তার প্রজন্ম কাজ করে বেঁচে থাকার জন্য, শুধু কাজ করার জন্য বাঁচে না। সম্প্রতি তিনি তিন দিনের বেতনবিহীন ছুটি নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের পুয়ের শহর ঘুরে দেখেছেন। চা ও কফির জন্য পরিচিত এই শহরের একটি কফি তৈরির কারখানায় তিনি আরও প্রায় ৫০ জন পর্যটকের সঙ্গে কফির বীজ থেকে পানীয় তৈরির পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে শুনেছেন।

তবে তার বাবা-মা বুঝতে পারেননি, ভ্রমণের জন্য কেউ কীভাবে নিজের কয়েক দিনের বেতন ছেড়ে দিতে পারে।

চীনের অনেক মানুষ এখন মনে করছেন, কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির গবেষক শিয়াং বিয়াওয়ের মতে, খুব অল্পসংখ্যক তরুণ পুরোপুরি কর্মদৌড় থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু অধিকাংশ তরুণই চীনের ঐতিহ্যবাহী কর্মসংস্কৃতির ওপর আগের মতো আস্থা রাখে না।

তারা ধীরগতির জীবন চায়। অথচ দুর্বল অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তাদের আরও দ্রুত কাজ করতে বাধ্য করছে। শিয়াংয়ের মতে, অবসর এই দ্বন্দ্বকে কিছুটা প্রশমিত করছে। হতাশ কর্মীরা তাই শরীরচর্চা, ছোট নাটক, খেলাধুলা ও অন্যান্য বিনোদনের দিকে ঝুঁকছেন।

আরানিয়ায় শাখা থাকা ওয়ান-ওয়ে স্পেস বইয়ের দোকানের কর্মকর্তা ছাং ছেনও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। তার মতে, আগে বইয়ের দোকানে ব্যবস্থাপনা ও সাফল্য অর্জনের বইয়ের চাহিদা বেশি ছিল। এখন মানুষ আত্মপর্যালোচনা, সময় ব্যবস্থাপনা, বিশ্রাম এবং নিজেকে বোঝার বিষয়ে বেশি পড়তে চাইছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোকানটি বই পড়ার পাশাপাশি রাত কাটানোর আয়োজন এবং হালকা পানীয়ের সঙ্গে বই পড়ার অনুষ্ঠানও করছে।

চীনা সরকারও ছুটির ব্যবহার বাড়াতে এবং অতিরিক্ত কাজ কমাতে উৎসাহ দিচ্ছে। আগস্টে হেনান প্রাদেশিক সরকার মালিক ও ব্যবস্থাপকদের ছুটির অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার এবং নিজেরাও ছুটি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়। সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যান্য প্রদেশও অতিরিক্ত কাজের এমন সংস্কৃতির সমালোচনা করেছে, যেখানে কর্মীরা ছুটি নিতে ভয় পান। তবে একই সঙ্গে সরকার ‘অতিরিক্ত অবসর’ নিয়েও উদ্বিগ্ন। দেশটির সাইবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অতিরিক্ত হতাশাবাদী আবেগ’ ছড়ানোর অভিযোগে ‘লাইং ফ্ল্যাট’-এর মতো কিছু ধারণার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। চলতি বছর চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ও এই প্রবণতাকে বিদেশি ‘ব্রেইনওয়াশিং’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তবে অবসরকে গুরুত্ব দেওয়া অনেক চীনা নাগরিকের কাছে রাজনীতি এখনো দূরের বিষয়। সাংহাইয়ের প্রকৌশলী জেসন জি আরানিয়া আর্ট সেন্টারে একটি অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি অধিকাংশ কাজ ভালোভাবেই পরিচালনা করে, তাই তারা রাজনৈতিক বিষয়গুলো সরকারের ওপর ছেড়ে দেন।

এর ফলে ব্যক্তিগত আগ্রহের জন্য তাদের হাতে সময় থাকে। শরীরচর্চার প্রতিযোগিতা হাইরক্স, যা জার্মানিতে শুরু হয়েছিল, চীনেও জনপ্রিয় হচ্ছে। আবার পরিবার নিয়ে স্থাপত্যনির্ভর হোটেলে কয়েক দিন কাটিয়ে আসার প্রবণতাও বাড়ছে।

পুয়ের শহরও এখন শখের পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। অনেকে সেখানে গিয়ে ধীরগতির জীবন উপভোগ করেন এবং কাজে ফেরার আগে নিজেদের মানসিকভাবে নতুন করে প্রস্তুত করেন।

সৌরশিল্পে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়া ২৭ বছর বয়সী ওয়াং ইয়ান শহরে হাতে তৈরি পণ্যের একটি কর্মশালা খুলেছেন। তার মতে, তীব্র প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় হওয়া প্রাপ্তবয়স্করা সেখানে গিয়ে শৈশবের হারানো আনন্দ যেন ফিরে পান। কেউ ব্যাগে ফুলের নকশা তৈরি করছেন, কেউ কাপড়ে রং করছেন। অন্যদিকে স্থানীয় গাইডরা শহর থেকে আসা পর্যটকদের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাশরুম ও বুনো উদ্ভিদ চেনাচ্ছেন।

২৬ বছর বয়সী ওয়াং কেয়ি জঙ্গলের মাটিতে মাশরুম খুঁজতে খুঁজতে বলেন, প্রকৃতির মধ্যে থাকার সময় তার মনে হয় তিনি এখনো বেঁচে আছেন।

অর্থাৎ চীনের নতুন মধ্যবিত্তের কাছে অবসর এখন শুধু কাজের ফাঁকে পাওয়া সময় নয়। এটি হয়ে উঠছে জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনৈতিক চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের মধ্যেও মানুষ কাজের পাশাপাশি জীবনের আনন্দ, মানসিক প্রশান্তি ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের জন্য জায়গা খুঁজছে।

চীনের এই পরিবর্তন এখনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অগ্রাধিকার বদলে দিচ্ছে। একসময় যেখানে প্রশ্ন ছিল—কীভাবে আরও বেশি সফল হওয়া যায়, এখন অনেকের প্রশ্ন—কীভাবে একটু ধীরে, একটু ভালোভাবে এবং নিজের জন্যও বাঁচা যায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্টি ডনের উত্তরসূরি হতে হবে বাগানের মানুষ, টেলিভিশনের ‘চরিত্র’ নয়

চীনে তৈরি হচ্ছে নতুন ‘অবসর শ্রেণি’, কাজের চেয়ে জীবন উপভোগে আগ্রহী মধ্যবিত্ত

০৮:২৯:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীনে দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষের কাজ ও অবসর সম্পর্কে ধারণা। একসময় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কঠোর পরিশ্রম এবং পেশাগত সাফল্যকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা হলেও দেশটির মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ এখন কাজের পাশাপাশি নিজের জন্য সময় বের করা, ভ্রমণ, শরীরচর্চা, বই পড়া, শিল্প-সংস্কৃতি উপভোগ এবং মানসিক প্রশান্তিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে দেশটিতে গড়ে উঠছে নতুন ধরনের অবসরভিত্তিক অর্থনীতি।

চীনের বেইদাইহের কাছে সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশকেন্দ্র আরানিয়া এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক। জায়গাটি ‘মধ্যবিত্তের ইউটোপিয়া’ হিসেবে পরিচিত। এখানে মানুষ ঘুড়ি ওড়ায়, সমুদ্রে খেলাধুলা করে, ধ্যান করে এবং সাজানো-গোছানো রাস্তায় হাঁটে। অনেকেরই সেখানে দ্বিতীয় বাড়ি রয়েছে।

গত বছর আরানিয়ায় ৪৬ লাখের বেশি পর্যটক গেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪ লাখ। সেখানে দর্শনার্থীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ কিন্তু নকশাবহুল খাবারের দোকানে খাওয়া-দাওয়া করেন, নাটক, সংগীত ও চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেন এবং আধুনিক স্থাপত্যের লাইব্রেরি দেখতে যান।

চীনে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ গণতন্ত্রের দিকে দেশটিকে নিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা একসময় অনেকের ছিল। বাস্তবে তা ঘটেনি। তবে এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন নতুন একটি অবসর শিল্পের জন্ম দিয়েছে। ব্যস্ত ও তুলনামূলকভাবে সচ্ছল মানুষ এখন কাজের বাইরে নিজের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে অর্থ ব্যয় করছেন।

উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন অর্থনীতিবিদ থর্সটেইন ভেবলেন ‘অবসর শ্রেণি’ ধারণাটি তুলে ধরেছিলেন। এই শ্রেণির মানুষ নিজেদের এমনভাবে প্রদর্শন করে, যেন তাদের কাজ করার প্রয়োজন নেই। চীনে এই ধরনের প্রকৃত ‘অবসর শ্রেণি’ এখনো ছোট। তবে আরও বড় একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবসরকে মূল্য দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসের হিসাবে, ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের শহরাঞ্চলের অর্ধেকের বেশি পরিবার—প্রায় ২০ কোটি পরিবার—উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা তার ওপরে উঠে গেছে। এসব পরিবারের বার্ষিক আয় অন্তত ১ লাখ ৬৫ হাজার ইউয়ান, যা প্রায় ২৩ হাজার মার্কিন ডলারের সমান।

চীনের কর্মসংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাধারণত দুটি চরম অবস্থার কথা সামনে আসে। একটি হলো ‘৯৯৬’—সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করা। অন্যটি ‘লাইং ফ্ল্যাট’ বা প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ানোর প্রবণতা। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত এই দুই চরম অবস্থার মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে। তারা পুরোপুরি কাজ ছেড়ে দিতে চায় না, আবার আগের মতো অতিরিক্ত কাজও করতে চায় না। তারা একটু কম কাজ করে অবসর সময়কে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে চায়।

চীনের দুর্বল খুচরা বাজারের মধ্যে সংস্কৃতি, খেলাধুলা এবং অন্যান্য অবসর খাতে ব্যয় এখন তুলনামূলকভাবে উজ্জ্বল জায়গা হয়ে উঠেছে। আগে যেসব পাহাড়ি ভ্রমণ-গাইড মূলত বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে কাজ করতেন, তারা এখন নতুন সরঞ্জাম কেনা চীনা পর্যটকদেরও সেবা দিচ্ছেন। পাহাড়ে হাঁটা ও প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিও মানুষের অবসর কাটানোকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখছে না। মানুষ যদি ছুটি কাটিয়ে আবার কাজে ফিরে আসে এবং অবসরের মাধ্যমে ভোক্তা ব্যয় বাড়ায়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্যও উপকারী। তবে মানুষ যেন কাজের প্রতি সম্পূর্ণ অনাগ্রহী হয়ে না পড়ে বা হতাশা থেকে সামাজিক অসন্তোষে না জড়ায়, সেটিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আরানিয়ার একটি বইয়ের দোকানে এমন একটি চুম্বকও বিক্রি হয়, যাতে লেখা—‘বিরতি নেওয়া বৈধ’। কথাটি চীনের দীর্ঘদিনের কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তনকে যেন প্রতীকীভাবে তুলে ধরে।

চীনে কঠোর পরিশ্রমের সংস্কৃতি বহু পুরোনো। একটি প্রচলিত প্রবাদে বলা হয়, অতিরিক্ত খেলাধুলা বা আনন্দ মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নষ্ট করে। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে তেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পর মানুষের জীবনধারায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে থাকে।

১৯৯৫ সালে সরকার দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি চালু করে। যদিও এর প্রয়োগ সব জায়গায় কঠোর ছিল না। এরপর ১৯৯৯ সালে তিনটি দীর্ঘ ছুটিকে ‘গোল্ডেন উইক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কর্মঘণ্টাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং অবসর জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়।Can China finally relax?

রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ওয়াং ছিয়ানের দীর্ঘদিনের সময় ব্যবহারের জরিপ অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সময়কালে চীনের মানুষ সবচেয়ে সুখী ছিল বলে মনে হয়। তখন মানুষ পর্যাপ্ত ঘুমাত, বেশি খেলাধুলা ও বিনোদন করত এবং মোটামুটি ভালো আয়ও করত।

তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। একটি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, শহুরে বাসিন্দাদের কর্মদিবসে অবসর কাটানোর সময় ২০২৪ সালের ৫ দশমিক ৯১ ঘণ্টা থেকে ২০২৫ সালে কমে ৩ দশমিক ৬৬ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। তবু দীর্ঘমেয়াদে অবসর সময়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। ওয়াং ছিয়ান এখন চার দিনের কর্মসপ্তাহের পক্ষে মত দিচ্ছেন।

২৪ বছর বয়সী ই-কমার্সকর্মী শেন হুইশান মনে করেন, তার প্রজন্ম কাজ করে বেঁচে থাকার জন্য, শুধু কাজ করার জন্য বাঁচে না। সম্প্রতি তিনি তিন দিনের বেতনবিহীন ছুটি নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের পুয়ের শহর ঘুরে দেখেছেন। চা ও কফির জন্য পরিচিত এই শহরের একটি কফি তৈরির কারখানায় তিনি আরও প্রায় ৫০ জন পর্যটকের সঙ্গে কফির বীজ থেকে পানীয় তৈরির পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে শুনেছেন।

তবে তার বাবা-মা বুঝতে পারেননি, ভ্রমণের জন্য কেউ কীভাবে নিজের কয়েক দিনের বেতন ছেড়ে দিতে পারে।

চীনের অনেক মানুষ এখন মনে করছেন, কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির গবেষক শিয়াং বিয়াওয়ের মতে, খুব অল্পসংখ্যক তরুণ পুরোপুরি কর্মদৌড় থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু অধিকাংশ তরুণই চীনের ঐতিহ্যবাহী কর্মসংস্কৃতির ওপর আগের মতো আস্থা রাখে না।

তারা ধীরগতির জীবন চায়। অথচ দুর্বল অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তাদের আরও দ্রুত কাজ করতে বাধ্য করছে। শিয়াংয়ের মতে, অবসর এই দ্বন্দ্বকে কিছুটা প্রশমিত করছে। হতাশ কর্মীরা তাই শরীরচর্চা, ছোট নাটক, খেলাধুলা ও অন্যান্য বিনোদনের দিকে ঝুঁকছেন।

আরানিয়ায় শাখা থাকা ওয়ান-ওয়ে স্পেস বইয়ের দোকানের কর্মকর্তা ছাং ছেনও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। তার মতে, আগে বইয়ের দোকানে ব্যবস্থাপনা ও সাফল্য অর্জনের বইয়ের চাহিদা বেশি ছিল। এখন মানুষ আত্মপর্যালোচনা, সময় ব্যবস্থাপনা, বিশ্রাম এবং নিজেকে বোঝার বিষয়ে বেশি পড়তে চাইছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোকানটি বই পড়ার পাশাপাশি রাত কাটানোর আয়োজন এবং হালকা পানীয়ের সঙ্গে বই পড়ার অনুষ্ঠানও করছে।

চীনা সরকারও ছুটির ব্যবহার বাড়াতে এবং অতিরিক্ত কাজ কমাতে উৎসাহ দিচ্ছে। আগস্টে হেনান প্রাদেশিক সরকার মালিক ও ব্যবস্থাপকদের ছুটির অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার এবং নিজেরাও ছুটি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়। সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যান্য প্রদেশও অতিরিক্ত কাজের এমন সংস্কৃতির সমালোচনা করেছে, যেখানে কর্মীরা ছুটি নিতে ভয় পান। তবে একই সঙ্গে সরকার ‘অতিরিক্ত অবসর’ নিয়েও উদ্বিগ্ন। দেশটির সাইবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অতিরিক্ত হতাশাবাদী আবেগ’ ছড়ানোর অভিযোগে ‘লাইং ফ্ল্যাট’-এর মতো কিছু ধারণার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। চলতি বছর চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ও এই প্রবণতাকে বিদেশি ‘ব্রেইনওয়াশিং’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তবে অবসরকে গুরুত্ব দেওয়া অনেক চীনা নাগরিকের কাছে রাজনীতি এখনো দূরের বিষয়। সাংহাইয়ের প্রকৌশলী জেসন জি আরানিয়া আর্ট সেন্টারে একটি অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি অধিকাংশ কাজ ভালোভাবেই পরিচালনা করে, তাই তারা রাজনৈতিক বিষয়গুলো সরকারের ওপর ছেড়ে দেন।

এর ফলে ব্যক্তিগত আগ্রহের জন্য তাদের হাতে সময় থাকে। শরীরচর্চার প্রতিযোগিতা হাইরক্স, যা জার্মানিতে শুরু হয়েছিল, চীনেও জনপ্রিয় হচ্ছে। আবার পরিবার নিয়ে স্থাপত্যনির্ভর হোটেলে কয়েক দিন কাটিয়ে আসার প্রবণতাও বাড়ছে।

পুয়ের শহরও এখন শখের পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। অনেকে সেখানে গিয়ে ধীরগতির জীবন উপভোগ করেন এবং কাজে ফেরার আগে নিজেদের মানসিকভাবে নতুন করে প্রস্তুত করেন।

সৌরশিল্পে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়া ২৭ বছর বয়সী ওয়াং ইয়ান শহরে হাতে তৈরি পণ্যের একটি কর্মশালা খুলেছেন। তার মতে, তীব্র প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় হওয়া প্রাপ্তবয়স্করা সেখানে গিয়ে শৈশবের হারানো আনন্দ যেন ফিরে পান। কেউ ব্যাগে ফুলের নকশা তৈরি করছেন, কেউ কাপড়ে রং করছেন। অন্যদিকে স্থানীয় গাইডরা শহর থেকে আসা পর্যটকদের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাশরুম ও বুনো উদ্ভিদ চেনাচ্ছেন।

২৬ বছর বয়সী ওয়াং কেয়ি জঙ্গলের মাটিতে মাশরুম খুঁজতে খুঁজতে বলেন, প্রকৃতির মধ্যে থাকার সময় তার মনে হয় তিনি এখনো বেঁচে আছেন।

অর্থাৎ চীনের নতুন মধ্যবিত্তের কাছে অবসর এখন শুধু কাজের ফাঁকে পাওয়া সময় নয়। এটি হয়ে উঠছে জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনৈতিক চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের মধ্যেও মানুষ কাজের পাশাপাশি জীবনের আনন্দ, মানসিক প্রশান্তি ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের জন্য জায়গা খুঁজছে।

চীনের এই পরিবর্তন এখনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অগ্রাধিকার বদলে দিচ্ছে। একসময় যেখানে প্রশ্ন ছিল—কীভাবে আরও বেশি সফল হওয়া যায়, এখন অনেকের প্রশ্ন—কীভাবে একটু ধীরে, একটু ভালোভাবে এবং নিজের জন্যও বাঁচা যায়।