মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের কারাবাসের ধরন বদলে যাচ্ছে। দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম ১৮ সেপ্টেম্বর নাজিবকে বাকি সাজা কারাগারের বদলে নিজ বাড়িতে থেকে ভোগ করার অনুমতি দিয়েছেন। তবে এটি সরাসরি মুক্তি নয়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে পারলেই তিনি কারাগার থেকে বের হয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় সাজা কাটাতে পারবেন।
নাজিব ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ বা ১এমডিবি-সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে আছেন। এই কেলেঙ্কারিতে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে এবং ঘটনাটি মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে।
ছয় বছরের সাজা, এবার গৃহবন্দিত্ব
নাজিবের প্রথম মামলায় ২০২০ সালে ১২ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০২৪ সালে তৎকালীন রাজার নেতৃত্বাধীন ক্ষমা বোর্ড তার সাজা কমিয়ে ছয় বছর করে এবং জরিমানার পরিমাণও কমানো হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই সাজার বাকি অংশ তিনি ২০২৮ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে পারবেন।
তবে এর জন্য ৫ কোটি মালয়েশীয় রিঙ্গিত, অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ডলারের জরিমানা পরিশোধের শর্ত রয়েছে। নাজিবের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তিনি এই শর্ত পূরণের চেষ্টা করছেন।
এর অর্থ হলো, ১৮ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তের পরও নাজিব সঙ্গে সঙ্গে কারাগার থেকে বেরিয়ে যাননি। জরিমানাসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করার পরই গৃহবন্দিত্ব শুরু হওয়ার কথা।
১এমডিবি কেলেঙ্কারির ছায়া
নাজিবের রাজনৈতিক পতনের কেন্দ্রেই ছিল ১এমডিবি কেলেঙ্কারি। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় এই তহবিল থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক তদন্তে উঠে আসে। অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন দেশ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরানো হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা জানান।
নাজিব অবশ্য শুরু থেকেই নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বড় অংশ অস্বীকার করে আসছেন। তার বক্তব্য, তাকে একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক আর্থিক কেলেঙ্কারির জন্য বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। তবে আদালতে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি কারাভোগ করছেন।
এদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১এমডিবি-সংক্রান্ত আরেক মামলায় নাজিবকে আরও ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই মামলায় তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দোষ প্রমাণিত হয়। তিনি ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। ফলে বর্তমান গৃহবন্দিত্বের সিদ্ধান্ত তার সব আইনি দায় বা ভবিষ্যৎ সাজা শেষ করে দিচ্ছে না।
জোট সরকারের ভেতরে অস্বস্তি
নাজিবকে গৃহবন্দিত্বের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। আনোয়ারের সরকারে নাজিবের পুরোনো রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বা ইউএমএনও-ও রয়েছে।
অন্যদিকে জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টি বা ডিএপি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে এসেছে। নাজিবের গৃহবন্দিত্বের সিদ্ধান্তের পর ডিএপির মহাসচিব ও পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লক পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। তবে ডিএপির অন্য মন্ত্রীরা সরকারে থেকে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এই ঘটনাটি জোটের ভেতরে নাজিবকে ঘিরে পুরোনো মতবিরোধকে আবার সামনে এনেছে। আনোয়ার বলেছেন, রাজকীয় ক্ষমার বিষয়ে রাজার সাংবিধানিক ক্ষমতাকে সম্মান করা উচিত এবং একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানও অপরিবর্তিত থাকবে।
সামনে আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন
নাজিবের মুক্তির পথ তৈরি হওয়ায় মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—তার বিরুদ্ধে থাকা অন্য মামলাগুলোর কী হবে এবং ভবিষ্যতে তার রাজনৈতিক প্রভাব কতটা থাকবে।
নাজিব এখনো ইউএমএনওর ভেতরে প্রভাবশালী একটি নাম। তার সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে তার জন্য ক্ষমা বা সাজা কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। নতুন সিদ্ধান্তকে দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সময়ে জোট সরকারের অন্য অংশের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ্যে এসেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাজিব এখনো পুরোপুরি মুক্ত নন। ২০২৮ সাল পর্যন্ত গৃহবন্দিত্বের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে তাকে নির্ধারিত আর্থিক শর্ত পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি ২০২৫ সালে পাওয়া ১৫ বছরের সাজা নিয়ে তার আপিলও চলমান। ফলে নাজিব রাজাকের আইনি অধ্যায় এখনো শেষ হয়নি।











