চীনের অনলাইন জগতে সেন্সরশিপ কমানোর কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত এখনো নেই। তবে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সমালোচনা বা সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ নির্বিচারে মুছে ফেলার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্কতা দেখানোর বার্তা সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সরকারি ও দলীয় গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। বিষয়টি চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির অনলাইন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় একটি সূক্ষ্ম সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান তাত্ত্বিক সাময়িকী ‘চিউশি’ সেপ্টেম্বর মাসে লিখেছে, ভিন্নমত প্রকাশকারী কণ্ঠগুলোকে ‘বন্যা’ বা ‘ভয়ংকর জন্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে মৌলিক ভুল বোঝাবুঝি। গণতান্ত্রিক কোনো উদারপন্থী সংবাদপত্রে এমন বক্তব্য খুব স্বাভাবিক হলেও চীনের দলীয় তাত্ত্বিক সাময়িকীতে এর উপস্থিতি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
এর আগে জুলাইয়ে কমিউনিস্ট যুবলীগ পরিচালিত ‘চায়না ইয়ুথ ডেইলি’ও একই ধরনের বক্তব্য প্রকাশ করে। পত্রিকাটি বলেছে, কোনো মন্তব্যকারীকে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং মত প্রকাশের পথ বন্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষের আস্থার সংকট আরও বাড়ে। একই মাসে চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া পরিচালিত ‘চায়না কমেন্ট’ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের সমালোচনা করে বলেছে, কিছু কর্মকর্তা সমস্যার সমাধানের বদলে জনপরিসরে শুধু নীরবতা চান এবং অভিযোগের পোস্ট মুছে ফেলাকেই অভ্যাসে পরিণত করেছেন।
তবে এসব বক্তব্যকে চীনে মাও সেতুং-পরবর্তী সময়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ভেতর উদারপন্থীদের নতুন উত্থান হিসেবে দেখার সুযোগ কম। শি জিনপিং ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর চীনের রাজনৈতিক পরিসরে উদারপন্থী কণ্ঠ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সময়ে ইন্টারনেটে সরকারি কর্তৃপক্ষের সমালোচনা ঠেকাতে সেন্সরশিপও অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দেখাচ্ছে, সাধারণ নাগরিকের অভিযোগও কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়তে পারে। জুলাইয়ে একটি পার্কিংয়ের জায়গা নিয়ে সাধারণ এক নাগরিক ও স্থানীয় এক কর্মকর্তার বিরোধের খবর অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এমন মন্তব্যও মুছে দেওয়া হয় যেখানে অভিযোগ করা হয়েছিল, সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে।
পুলিশও অনলাইন বক্তব্যের ক্ষেত্রে সতর্ক নজর রাখছে। নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় গত মাসের আকস্মিক বন্যায় চীনের অংশে সরকারি হিসাবে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে—এমন দাবি অনলাইনে প্রকাশ করার কারণে একজনকে সাত দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাহলে সরকারি গণমাধ্যমে সেন্সরশিপের মাত্রা নিয়ে এমন বক্তব্য কেন আসছে?
এর একটি কারণ হতে পারে, অতিরিক্ত সেন্সরশিপ সরকারের জন্যও সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। নাগরিকদের দৈনন্দিন অভিযোগ, ক্ষোভ ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতার খবর যদি সবসময় মুছে দেওয়া হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য হারাতে পারে। এতে ছোটখাটো অসন্তোষ সময়মতো সমাধান না হয়ে বড় ধরনের জনঅসন্তোষে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চীনে তাই কতটা বক্তব্য সেন্সর করা হবে, আর কতটা অভিযোগ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হবে—এটি প্রশাসনের জন্য দীর্ঘদিনের একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয়। সাম্প্রতিক সরকারি গণমাধ্যমের লেখাগুলোতে মনে হচ্ছে, স্থানীয় পর্যায়ে সেই ভারসাম্য ঠিকভাবে বজায় রাখা হচ্ছে না—এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের সীমা নিয়েও স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। শি জিনপিং এক দশক আগে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘অস্বাস্থ্যকর বক্তব্য’ জনসাধারণের জন্য এক ধরনের মাদক, যা সামাজিক অস্থিরতার অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ রাজনৈতিক বা দলীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনার জন্য অনলাইন পরিসর খুলে দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই।
বরং সাম্প্রতিক আলোচনার মূল লক্ষ্য স্থানীয় কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ মুছে ফেলার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা। ‘চায়না কমেন্ট’ অতিরিক্ত সেন্সরশিপের কয়েকটি উদাহরণও দিয়েছে।
এর একটি ঘটনায় মে মাসে এক ব্যক্তি স্থানীয় পর্যটন বিভাগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় একটি কনসার্টের আসনের অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। সেই অভিযোগের কারণে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আরেক ঘটনায়, গত বছর এক ব্যক্তি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা যায়, সরু একটি রাস্তায় এক নারী নিজের চলাচলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে তার স্বামীর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করছেন। পুলিশ ওই নাগরিককে ভিডিওটি মুছে ফেলতে চাপ দেয়। তিনি ভিডিওটি সরিয়ে নিলেও পরে সম্পাদিত সংস্করণ আবার প্রকাশ করেন। সেটি প্রায় এক কোটি বার দেখা হয়।
স্থানীয় প্রশাসনের অতিরিক্ত সতর্কতার পেছনে রয়েছে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও পদোন্নতির ব্যবস্থাও। শি জিনপিংয়ের শাসনামলে অনেক স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ‘শূন্য জনমত-সংকট’ বা ‘জিরো পাবলিক-অপিনিয়ন ইনসিডেন্ট’ অর্জনকে কর্মকর্তাদের পদোন্নতির উপযুক্ততা যাচাইয়ের একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এর ফলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে অভিযোগের সমাধান করার চেয়ে অভিযোগ প্রকাশই ঠেকানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে। জুলাইয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান মুখপত্র ‘পিপলস ডেইলি’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এই প্রবণতার সমালোচনা করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘শূন্য জনমত’-এর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি জনঅভিযোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ও উল্টো পদ্ধতির জন্ম দিয়েছে, যার ফলে গভীর কিছু প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।
তবে স্থানীয় কর্মকর্তাদের আচরণে দ্রুত পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ চীনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় ওপরের স্তরের কাছে নেতিবাচক খবর পৌঁছানো ঠেকানোর প্রবণতা দীর্ঘদিনের। ফলে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে সেন্সরশিপের মাত্রা কিছুটা সূক্ষ্ম করার বার্তা এলেও স্থানীয় প্রশাসন কতটা তা অনুসরণ করবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই চীনের অনলাইন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শিথিল হওয়ার সরাসরি প্রমাণ নয়। বরং এগুলো থেকে এমন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, সরকার হয়তো স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নাগরিক অভিযোগ পুরোপুরি মুছে ফেলার পরিবর্তে সেগুলো থেকে প্রশাসনিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ রাখতে চাইছে। রাজনৈতিক বিরোধিতা বা দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সমালোচনার ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না।











