ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় টাইগ্রে অঞ্চলে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। মাত্র কয়েক বছর আগে শেষ হওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর আবারও দেশটি বড় ধরনের সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চলা আগের যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
সেই যুদ্ধে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট বা টিপিএলএফ—টাইগ্রে অঞ্চলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন। সংঘাতের সময় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠার পর ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইথিওপিয়ার ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সময়ে ইরিত্রিয়ার সেনাবাহিনী, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
তবে সম্প্রতি ওয়াশিংটন মনে করেছিল, সেই সংকটের অবসান হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইথিওপিয়ার ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং ইরিত্রিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও নবায়ন করেনি। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, ইথিওপিয়া নিয়ে ঘোষিত ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ শেষ হয়েছে।
কিন্তু এর মাত্র কয়েক দিন পরই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
২৩ সেপ্টেম্বর টিপিএলএফ-সমর্থিত বাহিনী টাইগ্রের তিনটি বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে খবর পাওয়া যায়। এর পর ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার অঞ্চলটির সঙ্গে বিমান চলাচল স্থগিত করে। টিপিএলএফের অভিযোগ, ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী দক্ষিণ টাইগ্রেতে হামলা চালিয়েছে এবং তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ‘প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে।
অন্যদিকে ইথিওপিয়ার এক সরকারি কর্মকর্তা দাবি করেন, টিপিএলএফই প্রতিবেশী আমহারা ও আফার অঞ্চলে সেনাবাহিনীর অবস্থানে ‘সর্বাত্মক আক্রমণ’ শুরু করেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে দক্ষিণ টাইগ্রে, আমহারা ও আফারের বিভিন্ন এলাকায় লড়াই ছড়িয়ে পড়ায়।
এক বছরের বেশি সময় ধরে বাড়ছে উত্তেজনা
টিপিএলএফ এবং ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারের মধ্যে উত্তেজনা এক দিনের নয়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই পক্ষের সম্পর্ক ক্রমেই খারাপ হয়েছে।
টিপিএলএফের অভিযোগ, আবি সরকার টাইগ্রের ওপর শাস্তিমূলক অবরোধ তৈরি করেছে এবং তাদের জনগণের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যামূলক’ অভিযান চালাচ্ছে। তবে ইথিওপিয়া সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে টিপিএলএফকে এমন একটি ‘ঘোড়ার ট্রয়’ হিসেবে তুলে ধরছে, যার পেছনে ইথিওপিয়াকে দুর্বল বা ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে থাকা শক্তিগুলো রয়েছে।
এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে ইরিত্রিয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবি আহমেদ ও ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কির সম্পর্কও এখন তীব্র বিরোধে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী টিপিএলএফের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘোষণা না করা ড্রোন অভিযান চালিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সেই অভিযান আরও তীব্র হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আগের যুদ্ধের সমীকরণ এবার বদলে গেছে
নতুন সংঘাত শুরু হলে তা ২০২০-২২ সালের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি হবে না। কারণ তখন ইরিত্রিয়ার সেনাবাহিনী এবং আমহারা অঞ্চলের ফানো নামের বিভিন্ন মিলিশিয়া ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে মিলে টিপিএলএফের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল।
কিন্তু ২০২২ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে টিপিএলএফের সঙ্গে আবি আহমেদের সরকার সমঝোতায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ফানো গোষ্ঠী মনে করে, আবি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ২০২৩ সালেই ফানো কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।
ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াসও আবি সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। আবির পক্ষ থেকে ইরিত্রিয়ার উপকূলের কোনো অংশ পুনর্দখল বা সংযুক্ত করার বিষয়ে বারবার হুমকি দেওয়ার বিষয়টি ইসাইয়াসের উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
২০ সেপ্টেম্বর টিপিএলএফ ও ফানোসহ মোট সাতটি ইথিওপীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে আবি আহমেদের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। ইরিত্রিয়ার কর্মকর্তারা এই জোটে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে ইসাইয়াসের সঙ্গে ফানোর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি টিপিএলএফ ও অন্য গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছেন বলে ধারণা করা হয়।
রাজধানীর দিকে যাওয়ার পথ নিয়েও উদ্বেগ
সংঘাত আরও বাড়লে এর প্রভাব টাইগ্রের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো উত্তর আমহারার ওয়েলদিয়া শহর ঘিরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শহরটি টাইগ্রে থেকে রাজধানী আদ্দিস আবাবার দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর অবস্থিত।
ওয়েলদিয়া বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে গেলে তা রাজধানীর দিকে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পূর্বাভাস হতে পারে। একই সঙ্গে আফার অঞ্চলে বিদ্রোহীদের অগ্রগতি ইথিওপিয়ার জন্য আরও বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আফারের মধ্য দিয়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক রয়েছে, যা ইথিওপিয়াকে জিবুতির বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় পুরোটা এবং জ্বালানি আমদানির বড় অংশের জন্য ইথিওপিয়া এই বন্দরনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওই পরিবহনপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আবি সরকারের হাতে বড় সামরিক সুবিধা
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় আবি আহমেদের সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আলাদাভাবে তুলনামূলক দুর্বল। তাদের মধ্যে জাতিগত বিভাজন, পুরোনো বিরোধ ও ঐতিহাসিক ক্ষোভ রয়েছে। ফলে একটি সমন্বিত সামরিক কৌশল তৈরি করা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শক্তিশালী বিমান ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। ২০২১ সালে টিপিএলএফ যখন আদ্দিস আবাবার দিকে অগ্রসর হয়েছিল, তখন ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী ড্রোন ব্যবহার করে তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে সরকারের হাতে আরও বড় ও উন্নত ড্রোন ও বিমানভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা রয়েছে।
এ বছরের মে মাসে আবি আহমেদের একজন উপদেষ্টা টিপিএলএফ নেতাদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার মাধ্যমে হত্যার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সংঘাত আরও বাড়লে টিপিএলএফের নেতৃত্বও সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ইরিত্রিয়া ও সুদানের সম্পৃক্ততার ঝুঁকি
তবে শুধু টিপিএলএফ ও কেন্দ্রীয় সরকারের লড়াইয়ের মধ্যে পরিস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কি নিজের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রতিবেশী সুদানের যুদ্ধ। সুদানের সেনাবাহিনী বা এসএএফের সঙ্গে ইরিত্রিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একই সময়ে সুদানের সেনাবাহিনী ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ, কারণ ইথিওপিয়া তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফকে সমর্থন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাত যদি ইরিত্রিয়া ও সুদানের সামরিক সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। টাইগ্রে অঞ্চলে শুরু হওয়া লড়াই তখন ইথিওপিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে পূর্ব আফ্রিকার আরও বিস্তৃত এলাকায় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২২ সালের শান্তিচুক্তির পর যে সংঘাত শেষ হয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল, তা নতুন রূপে ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন লড়াই কতটা বিস্তৃত হয় এবং আবি আহমেদের সরকার, টিপিএলএফ, ফানো ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে সামরিক সমীকরণ কোন দিকে যায়—তার ওপর ইথিওপিয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।










