তিগ্রায়ের রাজনৈতিক ইতিহাসকে শুধু যুদ্ধ, নিপীড়ন কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বর্তমান সংকটের প্রকৃত চেহারা ধরা পড়ে না। আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে আসে—একটি জনগোষ্ঠী কীভাবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দেবে, যেখানে ক্ষমতার ভিত্তি হবে প্রতিষ্ঠান, আইন ও নাগরিকের সম্মতি; কোনো দল, নেতা কিংবা যুদ্ধজয়ের উত্তরাধিকার নয়?
তিগ্রায়ের জাতীয়তাবাদের বড় সাফল্য ছিল অস্তিত্ব রক্ষা। কিন্তু তার বড় অসম্পূর্ণতাও এখানেই। বহুবার সামরিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার সক্ষমতা প্রমাণিত হলেও সেই সংগ্রামকে একটি স্থায়ী, বহুত্ববাদী ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা যায়নি। ফলে মুক্তি এসেছে, কিন্তু স্বাধীনতার রাজনৈতিক অর্থ এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
যুদ্ধের ক্ষতই শেষ কথা নয়
তিগ্রায়ের মানুষ যে ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে গেছে, তা কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে আড়াল করার সুযোগ নেই। যুদ্ধের সময় ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, অনাহার, যৌন সহিংসতা এবং নিখোঁজ মানুষের স্মৃতি আজও সমাজটির ওপর গভীর ছাপ রেখে গেছে। পশ্চিম তিগ্রায় নিয়ে বিরোধ, অসম্পূর্ণ শান্তি প্রক্রিয়া, দুর্বল ফেডারেল কাঠামো এবং মেকেলেতে নেতৃত্বের সংকট সেই অনিশ্চয়তাকে আরও দীর্ঘ করেছে।
কিন্তু একটি জনগোষ্ঠী নিপীড়নের শিকার হয়েছে—এই সত্য নিজে থেকেই তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করে না। স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন কিংবা অন্য কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে হলে তার ভিত্তি হতে হবে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। অতীতের দুর্ভোগ ভবিষ্যতের শাসনব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।
তিগ্রায়ের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে তাই রয়েছে একটি পুরোনো ভুল: রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে ভবিষ্যতের বৈধতার সঙ্গে এক করে দেখা। যে সংগঠন যুদ্ধের সময় কার্যকর ছিল, যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ পরিচালনার জন্য একই সাংগঠনিক সংস্কৃতি যথেষ্ট হবে—এমন ধারণা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করেছে।

মুক্তি ও রাষ্ট্র গঠন এক নয়
মুক্তি আন্দোলনের প্রধান কাজ হলো দমনমূলক শক্তিকে পরাজিত করা। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যা কোনো ব্যক্তি বা দলের ওপর নির্ভরশীল নয়; নেতৃত্ব বদলালেও কার্যকর থাকে; এবং নাগরিকের অধিকার রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নির্ভর করে না।
তিগ্রায়ের ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় পর্যায়টি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর শৃঙ্খলা, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য পরবর্তী সময়ে বহুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে সহজে খাপ খায়নি। যে সাংগঠনিক সংস্কৃতি যুদ্ধ জিততে সহায়ক, তা স্বাভাবিকভাবেই নাগরিকভিত্তিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরির নিশ্চয়তা দেয় না।
তিগ্রায়ে জাতীয়তাবাদ এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয় দীর্ঘ সময় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ফলে জাতীয় আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করাও অনেক সময় জাতীয় স্বার্থের বিরোধিতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অথচ কোনো জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদ কোনো একক সংগঠনের রাজনৈতিক সম্পত্তি হতে পারে না।
তিগ্রায়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে স্বাধীন তিগ্রায়, বৃহত্তর ইথিওপীয় রাজনৈতিক প্রকল্প এবং ফেডারেল কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব—বিভিন্ন পথ সামনে এসেছে। কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রাম রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা সংকুচিত করায় এসব বিকল্প একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।
ফেডারেল ব্যবস্থার দুর্বল ভিত্তি
১৯৯৫ সালের ইথিওপীয় সংবিধান বহুজাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেয় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়। কিন্তু সাংবিধানিক নকশা ও বাস্তব ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে ছিল বড় ব্যবধান।
আঞ্চলিক সরকারগুলোর সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার রাজস্ব, আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় উন্নয়ননীতির ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ফলে ফেডারেল ব্যবস্থা একই সঙ্গে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় এবং জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসম্পন্ন একটি কাঠামোতে পরিণত হয়। নাগরিকের বাস্তব অধিকারও অনেক ক্ষেত্রে সে কোন অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
তিগ্রায়ের নিরাপত্তা দীর্ঘদিন এই দুর্বল কাঠামোর ভেতরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করেছে। শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তিগ্রায়ের প্রভাবই অনেকটা নিরাপত্তার বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ২০১৮ সালে সেই প্রভাব কমে যাওয়ার পর স্পষ্ট হয়ে যায়—রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা এক নয়।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সম্পদ বণ্টনের ওপর নির্ভরশীল যে ব্যবস্থা এতদিন স্থিতিশীলতার অনুভূতি তৈরি করেছিল, তার ভিত্তি ছিল দুর্বল। রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে গেলে সেই নিরাপত্তার আবরণও দ্রুত সরে যায়।
যুদ্ধের আগে কৌশলগত সংকট
২০১৮ সালের পর তিগ্রায়ের নেতৃত্ব এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, যার জন্য তাদের পুরোনো সাংগঠনিক সংস্কৃতি যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। একই সময়ে আবিয় আহমেদের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের প্রবণতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ন্ত্রণের দিকে এগিয়েছে—মূল লেখায় বিভিন্ন রাজনৈতিক গবেষণার আলোকে যার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আবিয় সরকারের তিগ্রায় নীতিতেও শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিরোধের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি সন্দেহ ও বৈরিতার উপাদান যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধের সময় বেসামরিক জনগণ জাতিগত পরিচয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন অভিযোগ এবং তার পক্ষে নথিভুক্ত তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। খাদ্য, চলাচল ও বাস্তুচ্যুতিকে চাপ প্রয়োগের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ দিক।

ইরিত্রিয়ার সঙ্গে আবিয় সরকারের সামরিক সমন্বয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। তিগ্রায়ের বিরুদ্ধে অভিযানে ইরিত্রীয় বাহিনীর অংশগ্রহণ এবং তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যুদ্ধের রাজনৈতিক ও মানবিক মাত্রাকে আরও গভীর করেছে।
তবে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা তিগ্রায়ের নেতৃত্বের নিজস্ব রাজনৈতিক ভুলগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক করে না। ২০২০ সালের যুদ্ধের আগে সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি সম্পর্কে নেতৃত্ব সচেতন ছিল। কিন্তু সেই ঝুঁকি কমাতে তিগ্রায়ের বাইরে রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন, বৃহত্তর সমর্থন তৈরি এবং বিচ্ছিন্নতা কাটানোর মতো কার্যকর কৌশল গড়ে ওঠেনি। ফলে সংঘাতের আগে থেকেই তিগ্রায় ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়েছিল।
স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা
তিগ্রায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ককে কেবল স্বাধীনতা বনাম ইথিওপিয়ার অংশ হয়ে থাকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করলে মূল রাজনৈতিক সমস্যা অনালোচিত থেকে যায়। যে পথই বেছে নেওয়া হোক, মৌলিক প্রশ্নটি হলো—সেই ব্যবস্থায় জনগণের ক্ষমতা কোথায় থাকবে?
এর জন্য প্রয়োজন দলীয় কর্তৃত্ব থেকে জাতীয়তাবাদকে আলাদা করা, রাজনৈতিক বিরোধিতাকে বৈধতা দেওয়া এবং এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যা কোনো ব্যক্তির ঐতিহাসিক ভূমিকার ওপর নির্ভর করবে না। একই সঙ্গে তিগ্রায়ের নিরাপত্তাকে কোনো নির্দিষ্ট দলের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর প্রভাবের সঙ্গে না মিলিয়ে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তার ওপর দাঁড় করাতে হবে।
তিগ্রায়ের সংগ্রামের ইতিহাস তাই শুধু বিজয় ও পরাজয়ের হিসাব নয়। এটি একটি অসমাপ্ত রাজনৈতিক রূপান্তরের ইতিহাস। অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম একটি জনগোষ্ঠীকে টিকে থাকার শক্তি দিতে পারে; কিন্তু একটি স্বাধীন রাজনৈতিক সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন, বহুত্ববাদ, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের সক্ষমতা।
শেষ পর্যন্ত তিগ্রায়ের সামনে প্রশ্নটি শুধু তারা কার কাছ থেকে মুক্ত থাকবে তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তারা নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতর ক্ষমতাকে কীভাবে সীমাবদ্ধ করবে। কারণ মুক্তির পূর্ণ অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ নেয় যেখানে রাষ্ট্র কোনো দল বা যুদ্ধজয়ের উত্তরাধিকারীর নয়, জনগণের।












