যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে লেখকের ধারণা ছিল, ‘মুক্ত বিশ্বের’ মানুষ নিজের চিন্তা ও মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান মতপ্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে—এমন বিশ্বাস থেকেই তিনি মনে করেছিলেন, সেখানে গিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশের কোনো বড় বাধার মুখে পড়তে হবে না। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা তার সেই ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তার পর্যবেক্ষণে, শুধু পাকিস্তান নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সমাজেই এখন ভিন্নমত ও প্রশ্ন করার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
পাকিস্তানের শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে লেখক নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। শ্রেণিকক্ষে একটি প্রশ্ন করার কারণে তাকে শাস্তি পেতে হয়েছিল। তার শিক্ষক নিজে তাকে না মেরে একজন সহপাঠীকে দিয়ে চড় মারিয়েছিলেন। লেখকের মতে, সেই শাস্তির উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক আঘাত নয়, প্রশ্ন করার মানসিকতাকেও দমন করা।
এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার একটি যোগসূত্র দেখেছেন। প্রশ্ন করা, প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা কিংবা কর্তৃত্বের সামনে ভিন্নমত প্রকাশ করা অনেক সময় সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে তার দাবি।
এ প্রসঙ্গে তিনি শিক্ষক ও গবেষক জুনায়েদ হাফিজের কথা উল্লেখ করেছেন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকা হাফিজের ঘটনাকে লেখক এমন একটি পরিবেশের উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন, যেখানে প্রশ্ন ও মতপ্রকাশের পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
একইভাবে তিনি মাশাল খানের হত্যাকাণ্ডের কথাও স্মরণ করেছেন। ২০১৭ সালে পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীদের হামলায় মাশাল খান নিহত হন। লেখকের দৃষ্টিতে, ঘটনাটি দেখিয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজে কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতি এবং অসহিষ্ণুতা কীভাবে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
লেখকের যুক্তি হলো, এমন অভিজ্ঞতাগুলো মানুষের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভয় তৈরি করে। কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না—এই হিসাব করতে করতে একসময় প্রশ্ন করার স্বাভাবিক প্রবণতাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র নিয়েও বদলেছে প্রত্যাশা
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর লেখকের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। তিনি ভেবেছিলেন, ‘মুক্ত বিশ্বের’ সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হবে অবাধ চিন্তা ও মতপ্রকাশের সুযোগ। কিন্তু তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
তিনি রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৫ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকের উল্লেখ করেছেন। ওই সূচকে যুক্তরাষ্ট্র ১৮০ দেশের মধ্যে ৫৭তম অবস্থানে রয়েছে। একই সূচকে বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সামগ্রিক পরিস্থিতিকে প্রথমবারের মতো ‘কঠিন’ বা ‘difficult’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে বলে লেখাটি উল্লেখ করে।
লেখক আরও দাবি করেছেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সময়ে হোয়াইট হাউসের সংবাদমাধ্যম কাভারেজে নতুন ধরনের বিধিনিষেধ দেখা গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউসের কার্যক্রমে প্রবেশের সুযোগ সীমিত বা বন্ধ করা হয়েছে। তিনি এর সঙ্গে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ও ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারির সময়কার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার তুলনা করেছেন।
তবে তার উদ্বেগ শুধু সংবাদমাধ্যমকে ঘিরে নয়। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ‘হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে’—এমন দ্বিমুখী চিন্তার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে মাঝামাঝি অবস্থান, প্রশ্ন তোলা কিংবা ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

‘১৯৮৪’-এর সতর্কবার্তা
লেখাটি যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ১৯৮৪-এর প্রসঙ্গও টেনেছে। অরওয়েলের কল্পিত কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় ক্ষমতাবানরা শুধু মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে না, শব্দ ও সত্যের অর্থও নিজেদের মতো করে নির্ধারণ করে।
লেখকের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যে একই ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা মানুষকে বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত করতে পারে। ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার বিজয়ের ঘোষণা দিলেও সাধারণ মানুষের জীবনে জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের চাপের মতো বিষয়গুলো রয়ে গেছে।
তিনি এই প্রবণতাকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা হিসেবে দেখেননি। তার মতে, বিশ্বজুড়েই রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং প্রশ্ন করার জায়গা সংকুচিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ভারতের প্রসঙ্গও এসেছে
লেখক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করেছেন এবং ভারতে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি আবারও রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৫ সালের সূচকের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ওই তালিকায় ভারত ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫১তম অবস্থানে রয়েছে এবং ‘খুবই গুরুতর’ শ্রেণিতে রয়েছে।
তার লেখায় ভারতের রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আচরণ এবং ভিন্নমতের প্রতি সরকারের অবস্থান নিয়ে একাধিক অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে; লেখক সেগুলোকে নিজের বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
ইউরোপের ক্ষেত্রেও তিনি একই ধরনের উদ্বেগের কথা বলেছেন। তার মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান মানুষের মতপ্রকাশের পরিসরকে কঠিন করে তুলছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে প্রশ্ন তোলা বা প্রচলিত অবস্থানের বিরোধিতা করাকে অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
মুক্তচিন্তার জায়গা কোথায়?
লেখাটির মূল প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়—মানুষ কি সত্যিই নিজের কথা বলার স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারছে?
পাকিস্তানে প্রশ্ন করার জন্য শাস্তির অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে মতপ্রকাশের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে হতাশ হওয়া—লেখক তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর একটি বৈশ্বিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার মতে, সমস্যা কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক মেরুকরণ, কর্তৃত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা বিভিন্ন সমাজে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা যাচ্ছে।
লেখার শেষদিকে তিনি উর্দু কবি মির্জা গালিবের একটি বিখ্যাত শের উদ্ধৃত করেছেন। এর ভাবার্থ—উন্মাদনার মধ্যে কত কিছুই না বলে ফেলছি; আল্লাহ করুন, কেউ যেন এর কোনো অর্থ বুঝতে না পারে।
এই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়েই লেখক যেন তার মূল উদ্বেগটি প্রকাশ করেছেন—যে পৃথিবীতে নিজের কথা বলার আগে মানুষকে বারবার ভাবতে হয়, সেখানে মুক্তচিন্তার প্রকৃত অর্থ নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।












