রাজনৈতিক বিতর্কে তীব্র মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে মরক্কো-স্পেন সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বিতর্ক কখনোই শান্ত বা নিরাবেগ থাকার কথা নয়। কিন্তু মতের সংঘাত যখন যুক্তি ও তথ্যের জায়গা ছেড়ে ব্যক্তিগত অপমান, মানহানি এবং প্রমাণহীন অভিযোগের দিকে চলে যায়, তখন সেটি আর সুস্থ জনপরিসরের বিতর্ক থাকে না। বরং প্রশ্ন ওঠে—গণমাধ্যম কি সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব পালন করছে, নাকি আবেগ ও উত্তেজনাকে সংবাদে পরিণত করছে?
সামির বেনিসকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। সেউতা সংকট নিয়ে অ্যান্টেনা ৩-এর এক আলোচনায় মরক্কোর এই শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক অভিবাসনসংক্রান্ত ঘটনায় মরক্কোর সরাসরি সম্পৃক্ততার যাচাইযোগ্য প্রমাণ চেয়েছিলেন। তিনি বিষয়টিকে বৃহত্তর মরক্কো-স্পেন সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও দেখার আহ্বান জানান। বিতর্ক উত্তপ্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যুক্তির মোকাবিলা করতে না পেরে যখন ব্যক্তিকে আক্রমণের লক্ষ্য বানানো হয়, তখন বিতর্কের চরিত্রই বদলে যায়।
অভিযোগের জায়গায় প্রমাণ কোথায়?
অনুষ্ঠানের পর তালেব আলিসালেম নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, স্টুডিও থেকে বের হওয়ার সময় বেনিস তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। বেনিস অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করে একে মিথ্যা ও মানহানিকর বলে অভিহিত করেন।’

এ ধরনের অভিযোগকে সাধারণ উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এমন দাবির সঙ্গে নির্দিষ্ট ঘটনা, সময়, প্রেক্ষাপট এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ জড়িত। কিন্তু প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত বেনিসের বিরুদ্ধে করা ওই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।
এখানেই গণমাধ্যমের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লেই তা সত্য হয়ে যায় না। পুনরাবৃত্তি প্রমাণের বিকল্প নয়, আর ব্যাপক প্রচারও যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা দূর করে না। জনমত উত্তেজিত হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মানদণ্ড উত্তেজনার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
যুক্তির বদলে ব্যক্তিকে আক্রমণ
সেউতা সংকট নিয়ে আলোচনায় আলিসালেম মরক্কোর বিরুদ্ধে অভিবাসনকে রাজনৈতিক চাপ ও ‘ব্ল্যাকমেইল’-এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। এর জবাবে বেনিস সরাসরি ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ দাবি করেন। এই জায়গায় বিতর্কটি নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে এগোতে পারত।
মতবিরোধ যত তীব্রই হোক, সেটি তথ্যের ওপর থাকলে জনসাধারণ বিষয়টি বুঝতে পারে। কিন্তু বিতর্ক যখন ব্যক্তিগত সম্মান, কথিত হুমকি কিংবা চরিত্র নিয়ে অভিযোগে চলে যায়, তখন জনগণকে কোনো জটিল সংকট বোঝানোর পরিবর্তে একজনকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
এটি জনআলোচনার পুরোনো কৌশল। যুক্তির জবাব দেওয়া কঠিন হলে বক্তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ। তথ্য খণ্ডন করার বদলে ব্যক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা আক্রমণ করা সহজ। আর প্রমাণ হাজির করার বদলে ক্ষোভ ও আবেগ উসকে দেওয়া আরও সহজ। কিন্তু এতে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং একটি নির্দিষ্ট আবেগনির্ভর বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়।
বেনিসের বক্তব্য ভুল হতে পারে। তাঁর বিশ্লেষণ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাঁর ব্যবহৃত সূত্র বা তথ্যও পরীক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তারও নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ সাংবাদিকতার অনুসন্ধান নয়; সেটি জনসমক্ষে বিচারের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

গণমাধ্যমের বয়ান ও নাটকীয়তার ঝুঁকি
এই প্রবণতা কেবল একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। স্পেনের কিছু গণমাধ্যমে মরক্কোকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংবাদ পরিবেশনে নাটকীয়তা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং উত্তেজক উপস্থাপনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এল এস্পানিওল-এর সেউতা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে মরক্কোর কিছু সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ব্যাপক অভিবাসনপ্রবাহ সংগঠিত বা সহজতর করার সঙ্গে যুক্ত করার তথ্য প্রকাশ করা হয়। কিন্তু স্পেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মরক্কোর রাষ্ট্রীয়ভাবে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিবেদনে যে তথ্যের কথা বলা হয়, স্পেনের জাতীয় পুলিশের পরিচালক ফ্রান্সিসকো পার্দো পিকেরাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কার কাছে জানান—উল্লিখিত প্রতিবেদন মরক্কোকে ঘটনাগুলো পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নের জন্য দায়ী করার মতো প্রমাণ দেয় না।
একটি সংবাদমাধ্যমের অবশ্যই অভিবাসন সংকটের দায় নিয়ে অনুসন্ধান করার অধিকার আছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সহযোগিতা কিংবা রাবাত ও মাদ্রিদের সিদ্ধান্ত নিয়েও কঠিন প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অনুমানকে যাচাই ছাড়া নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সাংবাদিকতা আর অনুসন্ধানী থাকে না; তা একটি পূর্বনির্ধারিত বয়ান নির্মাণে পরিণত হয়।
রাজনীতির সমালোচনা বনাম অপমান
একই সমস্যা দেখা যায় মরক্কোর রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠকে ঘিরে কিছু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের স্বাস্থ্য নিয়ে জনস্বার্থে সংবাদ করা সাংবাদিকতার বৈধ অংশ হতে পারে। তবে সেখানে যাচাই করা তথ্য, অনুমান ও সত্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা জরুরি। চিকিৎসাবিষয়ক অনুমানকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কোনো নেতাকে দুর্বল বা হাস্যকর হিসেবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে তাঁর এমন ছবি বেছে নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সেখানে তথ্য জানানোর পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট আবেগ ও ধারণা তৈরি করার চেষ্টা থাকে। রাজনৈতিক সমালোচনা তখন ব্যক্তিকে হেয় করার উপকরণে পরিণত হয়।
মরক্কোর সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কূটনৈতিক নীতি কিংবা স্পেনের সঙ্গে সম্পর্কের অবস্থান—সবকিছুই কঠোরভাবে সমালোচনা করা যায়। কিন্তু কোনো দেশের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা এবং সেই দেশের নেতা বা জনগণকে অপমান করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

মরক্কো-স্পেন সম্পর্কের বড় পরীক্ষাটি এখানেই
মরক্কো ও স্পেনের সম্পর্ক বহু সংবেদনশীল প্রশ্নে পরিপূর্ণ—সেউতা ও মেলিয়া, পশ্চিম সাহারা, অভিবাসন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি নিয়ে মতবিরোধ দীর্ঘদিনের। এসব বিষয়ে দুই দেশের গণমাধ্যমের কঠোর বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক।
তবে কঠোরতা আর অসম্মান এক বিষয় নয়।
মরক্কোর সংবাদমাধ্যমও স্পেনের সরকার, রাজনৈতিক দল ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু সমালোচনার লক্ষ্য যদি নীতি ও সিদ্ধান্তের বদলে ব্যক্তিকে অপমান করা হয়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক বিতর্ককে সমৃদ্ধ করে না।
এই জায়গায় সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিগুলোই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মতকে চ্যালেঞ্জ করতে হলে তার যুক্তির জবাব দিতে হবে। কোনো অভিযোগ তুললে প্রমাণ দিতে হবে। কোনো রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে নথি, তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সামনে আনতে হবে।
তীব্রতা সাহসের প্রমাণ নয়
অনেক সময় উচ্চস্বরে কথা বলা, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা অপমানজনক ভাষাকে সাহসী সাংবাদিকতা বা শক্ত অবস্থানের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। বাস্তবে তীব্রতা নিজে কোনো যুক্তির শক্তি প্রমাণ করে না। বরং কখনো কখনো এটি যুক্তির ঘাটতিকে আড়াল করার পদ্ধতিতে পরিণত হয়।

বেনিসের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তাঁর বক্তব্যের তথ্যসূত্র পরীক্ষা করা যেতে পারে, বিকল্প নথি উপস্থাপন করা যেতে পারে এবং মরক্কোর দায় প্রমাণের মতো তথ্য সামনে আনা যেতে পারে। একইভাবে কারও বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ থাকলে সেটিও যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা উচিত। অভিযোগকে প্রমাণ ছাড়াই রায়ে পরিণত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকতার মানদণ্ড হতে পারে না।
কারণ যুক্তির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে—তার জবাবও যুক্তি দিয়েই দিতে হয়। ব্যক্তিগত আক্রমণ সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। আর যাচাইহীন অভিযোগ বিতর্কের মূল বিষয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে প্রতিপক্ষকে কৃত্রিমভাবে অভিযুক্তের আসনে বসিয়ে দেয়।
মাদ্রিদ ও রাবাতের মতপার্থক্য অদূর ভবিষ্যতে শেষ হবে না। দুই দেশের স্বার্থ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বিতর্ক চলবে। কিন্তু প্রতিবেশী দুটি দেশের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে একটি সাধারণ নীতি জরুরি: দৃঢ় অবস্থান সৌজন্যকে বাতিল করে না, আর মতবিরোধ কাউকে অসম্মান করার অনুমতি দেয় না।
সাংবাদিকতার শক্তি কণ্ঠের উচ্চতায় নয়, প্রমাণের মানে। গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে সে কতটা জোরে অভিযোগ তুলেছে তার ওপর নয়, বরং কতটা সতর্কতার সঙ্গে সত্য যাচাই করেছে তার ওপর। মতের লড়াই যত কঠিনই হোক, যুক্তির জায়গা যদি অপমান দখল করে নেয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পক্ষ নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জনপরিসরের মান।












